জনপ্রশাসনে অস্থিরতা-আতঙ্ক


২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০৯

সাবেক দুই সচিবের স্নায়ুযুদ্ধে আসছে ভুল সিদ্ধান্ত

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
জনপ্রশাসনে নিয়মিত কাজ অনেকটা স্থবির। কারণ যিনি কোনো কাজ শুরু করবেন সেটি তার শেষ করার সময় পাবেন কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যখন-তখনই বদলি, ওএসডি ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। অনেকে অপ্রীতিকর কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে স্বেচ্ছায়ও সরে যাচ্ছেন। আর নিয়োগ পাওয়ার পর চেয়ারে বসার সঙ্গে সঙ্গে ওঠে দাঁড়াতে হচ্ছে, ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ফলে অনেকটা ওলট-পালট বা টালমাটাল পরিস্থিতি চলছে জনপ্রশাসনে। এছাড়া পুলিশসহ অন্যান্য বিভাগ, অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকারে দলীয় লোক অথবা অনুগত লোক বসাতে ব্যস্ত সরকার। বিশেষ করে জনপ্রশাসনে সাবেক দুই সচিব নিজের পছন্দ বা কোরামের লোক নিয়োগ দিতে নীরব তৎপরতা চালাচ্ছেন। এই সাবেক দুই সচিব এখন নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি ও চাকরিচ্যুতিতে তাদের পরামর্শ বা সুপারিশ বেশ কার্যকর।
বিব্রত সরকার
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদ (চলতি দায়িত্ব) থেকে অবসরে যান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়া। সংশ্লিষ্ট পদে থাকাকালে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছিলো দুদক। এ কর্মকর্তাকেই হঠাৎ এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে নতুন বিএনপি সরকার। গত ২৪ মার্চ তাকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যেখানে সরকারের অন্যতম প্রধান কমিটমেন্ট হলো ‘দুর্নীতির টুঁটি চেপে’ ধরা অর্থাৎ দুর্নীতি দমন করা। এই নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় সরকার খাত ছাড়াও প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কীভাবে এমন দুর্নীতিবাজকে নতুন করে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তা নিয়ে সর্বত্র প্রশ্নে সৃষ্টি হয়। অথচ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর তার কাছেই বিভিন্ন মহল থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এতে অত্যন্ত বিব্রত হন তিনি। সরকারের ওপরের মহলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেও জানা যায়। ফলে গোটা সরকারেই এ ঘটনায় ঝাঁকুনি হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিব্রত হন। সব শেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে নিয়োগের এই প্রজ্ঞাপন বাতিল হবে। রোববারই প্রজ্ঞাপনটি বাতিল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে তখনই জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত ২৭ মার্চ রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ২৮ মার্চই তার নিয়োগ বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়া, অবসরে যাওয়ার আগে এ পদে নিয়োগ নেওয়া নিয়ে তখন অভিযোগ ওঠে ওই পদের জন্য তাকে খবচ করতে হয়েছে ২০ কোটি টাকা, কেউ কেউ সেই টাকার পরিমাণ ১৫ কোটি বলে জানিয়েছেন, এত বিতর্কের পর এবার নিয়োগ নিতে আরও বেশি টাকা দিতে হয়েছে এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কে বা কারা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাকে আবারও নিয়োগ দিয়েছেন। এ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।
কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা-টেনশন
প্রশাসন ঢেলে সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের মুখ্য সচিব পদে ৮২ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তাদের বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি সমতুল্য) সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। বদলীকৃত কর্মকর্তারা হলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উল্লিখিত কর্মকর্তাদের তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো দফতর বা কর্মক্ষেত্র নেই। এর আগে চুক্তির মেয়াদ অবশিষ্ট থাকতেই নিজ থেকে পদত্যাগের আবেদন করে চাকরি ছেড়ে গেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজউদ্দিন মিয়া। নতুন সরকার প্রশাসন সাজানোর অংশ হিসেবে এসব করা হচ্ছে। এই সুযোগে অনেক আমলা নিজেকে সরকারের আদর্শে বিশ্বাসী প্রমাণ করতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। প্রশাসনের ভেতরে থাকা ‘বর্ণচোরা’ কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অনেকে ছাত্রজীবনে ‘ছাত্রদল’ করার প্রমাণ খুঁজতে ব্যস্ত কিংবা প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠতার কথা সহকর্মীদের কাছে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে নতুন সরকার আসার পর বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কে ভালো ছিল না এমন সচিবরা এখন কোণঠাসা। তারা নানা চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দফতর সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন বদলি ও তদন্ত আতঙ্ক কাজ করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সচিবালয়ে ব্যাপক রদবদল ও ওএসডি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সচিবদের চুক্তি বাতিল ও বদলি, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া এবং নতুন সরকারের সঙ্গে মতাদর্শিক দূরত্বের কারণে প্রশাসনের শীর্ষপর্যায় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সর্বক্ষণ বিরাজ করছে বদলি ও ওএসডি আতঙ্ক
নিয়োগ হচ্ছে আর দায়িত্ব নিতে না নিতেই সেই নিয়োগ আর থাকছে না এমন একাধিক ঘটনার কারণে শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাজে খুব একটা মনোযোগ নেই। তারা সবসময় থাকছেন বদলি বা ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি’ বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) আতঙ্কে। সম্প্রতি এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে। গত ২৫ মার্চ রাতে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ৯ জন সচিব নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তন্মধ্যে ৮ জন নিয়মিত বিভিন্ন ব্যাচের সদস্য ও বাকি ১ জন হলেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ৭ম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ৮ জনের মধ্যে ২ জন হলেন ইকোনমিক ক্যাডার থেকে আগত ও অন্য ৬ জন প্রশাসন ক্যাডারের নিয়মিত সদস্য। এছাড়া ৩ জন সচিবের দপ্তর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। নবগঠিত বিএনপি সরকারের আমলে এটি প্রথম বড় নিয়োগ ও পদোন্নতি। কিন্তু এই নিয়োগ ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে ব্যাপক অসন্তোষ ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। এত বেশি সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে যে, পরবর্তী কার্যদিবসেই ২৯ মার্চ (মাঝে ৩দিন বন্ধ ছিল) তিনজন সচিবের বদলির আদেশ স্থগিত করতে হয়েছে এবং দুজন সচিবের দপ্তর পুনর্বণ্টন করতে হয়েছে। একজন কর্মকর্তার নিয়োগ স্থগিত বা তাকে সরিয়ে দিতে হলে কেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। জানা গেছে, বিগত সময়ে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন এরকমের অন্তত ৫২ জনের পদোন্নতির প্রস্তাব উঠেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ঝঁঢ়বৎরড়ৎ ঝবষবপঃরড়হ ইড়ধৎফ (ঝঝই)-তে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি সংক্রান্ত সুপারিশ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত এ কমিটি এই কর্মকর্তাদের আমলে নেয়নি। যাদের আমলে নিয়েছে তাদের বিষয়েও পরবর্তীতে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এতে প্রশাসনে অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশসনের শীর্ষ পদে বসানো হচ্ছে অনুগতদের
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী জনপ্রশান থাকবে নিরপেক্ষ। তারা রাষ্ট্রের সব নাগরিককে সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা। কিন্তু সরকার পাল্টালেই পাল্টে যান অনেক কর্মকর্তা। তারা নতুন সরকারকে বোঝাতে চান তারা নতুন সরকারেরই অনুগত। এবং অনুগত হলে তারা কাজ করতে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে পদোন্নতি বা লোভনীয় পদে বসতে তদবির চালান। ফলে সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা বঞ্চিত হন। নতুন সরকার গঠিত হলে দেড় মাসও হয়নি। এরই মধ্যে জনপ্রশাসনে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। প্রায় সব শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে দলীয় অনুগতদের। সরকারের এ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক যোগ্য লোক বঞ্চিত হয়েছেন।
সৎ অফিসাররা অনেক ক্ষেত্রে কোণঠাসা, কুষ্টিয়ার ডিসিকে নিয়ে বিএনপির প্রার্থীর বক্তব্যে তোলপাড়
জনপ্রশাসনে যারা সৎ ও যোগ্য এমন অনেক কর্মকর্তাকেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের দেড় মাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে যেসব জেলা প্রশাসক সৎ এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের কোনো অভিযোগ নেই, তাদেরও সরিয়ে দিয়েছে বিএনপি সরকার। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসককে নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তার বদলির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনতা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। তাকে জেলা থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা বাধা সৃষ্টি করেন। সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় তিনি সেখানে সিক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু সরকার তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এরপর কুষ্টিয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেনকে বিএনপির লোকজন বদলি করিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী। তিনি বলেছেন, ‘আগের জেলা প্রশাসককে আমরা ইচ্ছা করে বদলি করে দিয়েছি। কারণ গভর্নমেন্ট (সরকার) আমাদের। উনি (জেলা প্রশাসক) এরকম কাজ করবেন বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলে আমরা আগেই ব্যবস্থা নিতাম।’ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
সচিবালয়ে বিশেষ নজর রাখছেন তারেক রহমান, দেখছেন জনপ্রশাসনও
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এখনো কোনো মন্ত্রী দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই মন্ত্রণালয়ে ইসমাইল জবিউল্লাহকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী মর্যাদায় নিয়োগ পাওয়া এই উপদেষ্টাও একসময় সচিব ছিলেন। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ছিলেন। উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় তিনি নজরে রাখছেন। কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়া কী আসে, সেদিকেও নজর রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সাবেক দুই সচিবের ভেতরে স্নায়ু দ্বন্দ্বে আসছে ভুল সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রীর দফতরের মুখ্য সচিব পদে ৮২ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি তারেক রহমানের একান্ত সচিব ছিলেন। এর আগে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। সাবেক এই সচিব এখন প্রধানমন্ত্রীর দফতর সামলাচ্ছেন। অন্যদিকে সাবেক সচিব বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। এই দুই সাবেক সচিবই প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। তারা নিজ নিজ বলবৃদ্ধির জন্য পছন্দের লোকদের বিভিন্ন দফতরে বসানোর চেষ্টা করছেন এমন কথা আলোচনা হচ্ছে সচিবালয়ে। সম্প্রতি এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী পদে অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও তিন দিনের ব্যবধানে তা আবার বাতিলে ওই দুই সাবেক সচিবের ইশারা থাকতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। একজন তাকে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে আরেকজন নিয়োগ বাতিলের পক্ষে ছিলেন বলে আলোচনা হচ্ছে। এমন আরও অনেক ঘটনায় তাদের মধ্যে বলয় বাড়ানো চেষ্টা রয়েছে বলে সচিবালয় আলোচনা রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রশাসনে দলীয়করণের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর মতে, গত ১৫ বছরে প্রশাসনে যে দলীয়করণের ধারা শুরু হয়েছিল, তা এখনো বিদ্যমান। তিনি মনে করেন, এই ব্যবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, দলীয়করণের কারণে প্রশাসনের কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয়, নাগরিকরা কাক্সিক্ষত সেবা বঞ্চিত হন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পরও দলীয়করণ রয়ে গেছে, শুধু রূপ বদলেছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিকরণ ও প্রতিষ্ঠান দুর্বলকরণের মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি দলীয় প্রভাবকে আরেকটি দলীয় প্রভাব দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে প্রশাসনে এখনো কিছু কর্মকর্তা আছেন যারা নিরপেক্ষ থেকে পেশাগতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছেন।