বাংলাদেশ প্রথম বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হওয়ার শঙ্কা
২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০৭
আপাতত দেশে জ্বালানির মূল্য বাড়ছে না
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে ৩ দিন অনলাইনে ক্লাস
স্টাফ রিপোর্টার : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকেই জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট সৃষ্টি হতে পারে, এমন আশঙ্কা ছিল বিশ্বজুড়ে। সেই শঙ্কা এখন অনেকটাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোপূর্বেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশেই এ সংকট দৃশ্যমান। গ্যাস, পেট্রোল ও অকটেন কিনতে পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইন দিতে হচ্ছে চালকদের। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ শতসহস্র। ঠিকমতো সরবরাহ করতে না পেরে অনেক পাম্প এখন বন্ধ। টানিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জ্বালানি নেই’ নোটিশ। তবে সরকার বলছে ভিন্ন কথা, তারা বলছে সংকট নেই, সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। সংকট তৈরি হতে পারে এ আশঙ্কা থেকে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে অবৈধ মজুদ করার প্রবণতার কারণে সংকট বড় করে দেখা হচ্ছে। সরকারের জ¦ালানি বিভাগ থেকে গত ৩০ মার্চ সোমবার বলা হয়েছিল জ্বালানি মূল্য বাড়ানো হতে পারে কিন্তু গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জ¦ালানির মূল্য এপ্রিল মাসে বাড়ছে না। এদিকে সংকট মাথায় রেখে সরকার সপ্তাহে তিনদিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অপরদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদকের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ প্রথম বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী; বিশেষত এশিয়ার অনেক দেশেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের এ সংকটের লক্ষণগুলো দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্পট মার্কেট থেকে বেশি দাম দিয়ে এলএনজি কিনছে সরকার। এপ্রিলের জন্য প্রয়োজনীয় এলএনজির সব কার্গো সরবরাহের নিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। এজন্য মোট ৯ কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে। গত ২৫ মার্চ বুধবার এসব কার্গো সরবরাহ পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা এপ্রিলের চাহিদা অনুযায়ী ৯টি কার্গো সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। বিষয়টি গত ২৫ মার্চ নিশ্চিত হওয়া গেছে। আটটি কার্গো কেনা হবে স্পট মার্কেট থেকে এবং বাকি একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়।’ যদিও এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, জ্বালানির জন্য আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ দেখালেও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং দুর্বল বৈদেশিক অবস্থানের কারণে ‘অধিক ঝুঁকিতে’ রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নে এসব দেশ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গত সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
বর্তমানে এলএনজি কিনতে বেশি দাম দিতে হলেও সরকার সরবরাহ সংকট সামাল দেয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গ্যাস খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে কার্গোপ্রতি এলএনজি প্রতি এমএমবিটিইউ গড়ে প্রায় ২২ ডলারে কেনা হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে সাড়ে ৯ থেকে ১০ ডলারে কেনা হতো। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখতে এখন দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কেনা হচ্ছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখন এলএনজি কার্গো কেনা হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি দামে। সেই হিসেবে ভর্তুকিও আগের অর্থবছরে চেয়ে বেড়ে যাবে।’ কী পরিমাণ ভর্তুকি বাড়াতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ অর্থবছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগবে।’
জ্বালানি নিয়ে সরকারের খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি সম্প্রতি কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে। আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের সঙ্গে গত ২৪ মার্চ বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘জ্বালানি আমদানির জন্য যে বাড়তি অর্থের দরকার পড়বে, সে বিষয়েও আইএমএফের সঙ্গে কথা হয়েছে।’
দেশের ৭০-৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয় মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আর পরিশোধিত তেল কেনা হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীন থেকে। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। ২০২৬ সালজুড়ে তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, আগে জ্বালানি তেল সাধারণত ১৫ দিনের মজুদ রাখা হতো। এখন তা এক মাসের মতো আছে। এ মজুদ আরো বড় করার চেষ্টা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের জন্য সরকারের ভর্তুকির বিষয়ে ২৮ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) জানান, প্রতিদিন সরকার জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।
পাম্পে ‘তেল নেই’ নোটিশে ক্ষোভ
জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণার আগাম খবরে রাজধানীজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত ৩০ মার্চ সোমবার রাত থেকেই পেট্রোলপাম্পগুলোয় ভিড় বাড়তে থাকে, তবে অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন চালকরা। কোথাও কোথাও লাইনে অপেক্ষা করেও জ্বালানি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার ভোর থেকে রাজধানীর তেজগাঁও, বাড্ডা, গুলশান ও রমনা এলাকার খবর নিয়ে জানা গেছে, এসব এলাকার বেশিরভাগ তেলের পাম্প বন্ধ। দু-একটি পাম্প খোলা থাকলেও ‘অকটেন ও পেট্রোল শেষ’ বলে চালকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন পাম্প অপারেটররা। এতে পরিবহন চালকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এপ্রিলে বাড়ছে না তেলের মূল্য
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকছে। তাই এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না। আগের দামেই বিক্রি হবে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক অফিস আদেশে সরকারের এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এপ্রিলে প্রতি লিটার ১০০ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা, পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ আর অকটেনের দাম ১২০ টাকা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এ দামেই বিক্রি হয়েছে জ্বালানি তেল। এর আগে জানুয়ারিতে প্রতি লিটারে ২ টাকা ও ফেব্রুয়ারিতে আরও ২ টাকা করে কমানো হয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে ৩ দিন অনলাইনে ক্লাস
সারা দেশে জ্বালানি সংকটের মধ্যে ঢাকাসহ সব মহানগরের স্কুল ও কলেজ সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, বোর্ড কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এক সমন্বয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় উপস্থিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, আপাতত সপ্তাহে ছয় দিনই ক্লাস হবে। তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন হবে অফলাইনে। শিক্ষকরা স্কুলে এসে ক্লাস নেবেন। জোড়-বিজোড় দিন ভাগ করে হবে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস।
বাড়তে পারে সাপ্তাহিক ছুটি, হোম অফিসের সিদ্ধান্তও আসতে পারে
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে তৈরি হওয়া চাপ সামাল দিতে একগুচ্ছ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বা কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, কর্মকর্তাদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ এবং অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা। এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্তও এসে গেছে।
২৭ দিনে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৩ থেকে ২৯ মার্চ দেশের ৬৪ জেলায় এসব অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ৩০ মার্চ সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ বন্ধে ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযানে ১ হাজার ৫৩টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টিতে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।’ জ্বালানি বিভাগ থেকে জানানো হয়, উদ্ধার করা জ্বালানি তেলের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার ডিজেল, ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন, ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ মজুদকারীদের কাছ থেকে ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে পারে বাংলাদেশ, টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে সংঘাত এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের প্রভাবে ছড়িয়ে পড়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ প্রথম বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে পারে। এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। সংবাদ মাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেল ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। ঢাকায় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি রেশনিং চললেও সরকার এখনো কার্যকর পরিকল্পনা দাঁড় করাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে এবং জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।