ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার যাত্রীরা

এবারের ঈদযাত্রায় প্রাণহানি প্রায় চারশ’


২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৭

স্টাফ রিপোর্টার : গভীর রাতে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে ফ্লাইওভারের নিচে লেভেলক্রসিং পার হচ্ছিল চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল নামের যাত্রীবাহী বাস। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইল নামের ট্রেনটির সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাসটিকে প্রায় আধাকিলোমিটার পর্যন্ত সামনে নিয়ে যায় ট্রেনটি। ঘটনা গত ২১ মার্চ দিবাগত রাতের। ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ১২ জন। একই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী হয় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের মানুষ। সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বাসে বসে ছিলেন যাত্রীরা, অপেক্ষা করছিলেন ফেরি এলেও ওপারে যে যার গন্তব্যে পৌঁছাবেন। কিন্তু না, চালকের বেপরোয়া ও অসাবধানতায় বাসটিকে চালিয়ে নিয়ে যান নদীতে, সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। নারী-শিশু, তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের মানুষ ছিলেন ওই বাসটিতে, ছিলেন নব দম্পতিও। ওই ঘটনায় ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করার পর উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। ঢাকার সরদঘাটে লঞ্চে উঠতে গিয়ে দুই লঞ্চের চাপা পড়ে দুজন নিহত হন, নিখোঁজ হন আরও দুজন। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের ৩ জনসহ নিহত ৫ জন প্রাণ হারান। এসবই ঘটেছে ঈদযাত্রায়, বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী এবারের ঈদ যাত্রায় ৩৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদের কয়েকদিন আগে রামপালে একটি পরিবারের একজন ছাড়া সবাই প্রাণ হারান সরকারি একটি বাহিনীর গাড়িচাপায়। ওই দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।
দৌলতদিয়ায় বাসডুবিতে ২৬ জনের লাশ উদ্ধার
গত ২৫ মার্চ বুধবার বিকালে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ডুবুরি দল। গত ২৯ মার্চ রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উদ্ধার অভিযান বন্ধ ঘোষণা করা হয় বলে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস জানান। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধান চালিয়েও আর কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে পরিচালিত এই উদ্ধার অভিযান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বন্ধ করা হয়েছে। তবে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হবে বলেও জানান ইউএনও।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা পদুয়ার বাজার ১২ জনের প্রাণহানি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা পদুয়ার বাজার রেলওয়ে ওভারপাসের নিচে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে বাসের ১২ জন যাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। গত রোববার (২৯ মার্চ) বিকালে জেলা প্রশাসকের নিকট প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ের ৪ গেটম্যান, বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দুই গেটম্যান, লালমাই রেলস্টেশনের মাস্টার ও লোকোমাস্টারসহ আরও দুজন, সড়ক বিভাগের নির্মাণ কাজ এবং বাস চালকের দায়িত্বে অবহেলা প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী জানান, তদন্তে অন্তত ছয়টি বিষয়ে ব্যত্যয় দেখা গেছে এবং সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও বিভাগ দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কমিটি মোট ৮টি সুপারিশ করেছে। এ দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে প্রধান ছিলেন মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী। এছাড়া সদস্য হিসেবে ছিলেন বিআরটিএ-এর সহকারী পরিচালক ফারুক আলম, ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল মমিন, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন এবং রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী। গত ২১ মার্চ শনিবার ঈদুল ফিতরের দিন দিবাগত ভোররাতে পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে চলন্ত ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন যাত্রী নিহত হন এবং অন্তত ২৪ জন আহত হন। ঘটনার পর এক বাসযাত্রীর করা মামলার ভিত্তিতে এ পর্যন্ত তিনজন গেটম্যানকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ।
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারান ৫ জন
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের তিনজনসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের নিজপাড়া গ্রামে। এ দুর্ঘটনায় শোকস্তব্ধ হয়ে পরে পুরো এলাকা। নিহত ৫ জনের মধ্যে তিনজন হলেন- সাদুল্লাপুর উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের হামিদুজ্জামানের স্ত্রী নার্গিস আক্তার (৪২), তার ছেলে নীরব (১২) ও তার বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা বেগম (৪৫) এবং একই গ্রামের রিপা (২২) ও সুলতান (৩২)। স্বজনেরা জানান, দুর্ঘটনার তিন দিন আগে বড় ছেলে নাঈমের বিয়ে দেন পোশাক শ্রমিক নার্গিস আক্তার। গত ২৭ মার্চ শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ছোট ছেলে নীরব ও বড় ছেলে নাঈমের শাশুড়িসহ পোশাক কারখানার কাজে যোগ দিতে ঢাকায় রওনা হন নার্গিস। তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রতিবেশী একই গ্রামের বাসিন্দা পোশাক শ্রমিক সুলতান ও রিপা। পথে টাঙ্গাইলের কালিহাতী এলাকায় বাসের তেল ফুরিয়ে গেলে চালক ও তার সহকারী তেল আনতে যায়। এ সময় বাস থেকে নেমে রেললাইনে বসেন ওই ৫ জন। হঠাৎ দ্রুতগতির ট্রেন এলে কাটা পড়ে ঘটনাস্থালেই ওই পাঁচজন প্রাণ হারান।
সদরঘাটে দুই লঞ্চের চাপায় নিহত ২, বাবা-ছেলে নিখোঁজ
রাজধানীর সদরঘাটে দুই লঞ্চের চাপায় দুজন নিহত হয়েছেন। গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। জানা যায় ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে ট্রলার দিয়ে যাত্রী তোলার সময় পেছন দিক থেকে ‘জাকির সম্রাট-৩’ লঞ্চটি হঠাৎ ধাক্কা দেয়। এতে লঞ্চের চাপায় ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন এবং বাবা-ছেলেসহ আরও দুজন নিখোঁজ হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ‘আসা যাওয়া-৫’ (ঢাকা-ইলিশা) লঞ্চে ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী ওঠানামার সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে এসে ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ (ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট) লঞ্চটি ধাক্কা দেয়।
বাগেরহাটের রামপালে একই পরিবারের ১১ জনসহ ১৪ জনের প্রাণহানি
বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জন হয়েছে। তাদের মধ্যে একই পরিবারের ১১ জন। গত ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার বিকেলে রামপাল উপজেলায় মোংলা-খুলনা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের মধ্যে ছিলেন নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রী এবং বর-কনের পরিবারের সদস্যরা। দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটি বরযাত্রীদের বহন করছিল। মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক তার ছোট ছেলে সাব্বিরকে বিয়ে করানোর পর ছেলে-পুত্রবধূসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে, পুত্রবধূ, মেয়ে-নাতিসহ ১১ জন, মাইক্রোবাসের চালক ও কনেপক্ষের লোকসহ মোট ১৪ জন মারা গেছেন।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের প্রাণহানি
ঈদযাত্রার ১৫ দিনে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৬ জন। গত ৩০ মার্চ সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ঈদুল ফিতরে সারা দেশে সংঘটিত দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসব তথ্য জানায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলটির নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, এবারের ঈদ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস ডুবে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আরও অনেক ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলছেন, স্বস্তির ঈদ যাত্রা হয়েছে, তিনি প্রশ্ন রাখেন আর কত মানুষের প্রাণ গেলে তিনি অস্বস্তিবোধ করবেন। অন্য দেশে এমন হলে মন্ত্রী পদত্যাগ করতেন, তিনি এমন কোনো চিন্তা করছেন কিনা, তাও জানতে চান সাইফুল আলম খান মিলন।