দ্রুত ছড়াচ্ছে হাম উপসর্গ নিয়ে বাড়ছে প্রাণহানিও


২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৫

রামেকে মৃত ৩০, আইডিএইচে ২২
স্টাফ রিপোর্টার : দেশজুড়ে শিশুদের হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে এই হামে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) গত তিন মাসে ২২ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। রাজধানীতে মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের। অবশ্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের একজন চিকিৎসক বলছেন, মৃত্যু হওয়া ওই ত্রিশ শিশুর ২৯ জনেরই হাম শনাক্ত হয়নি। অন্যদিকে ঢাকার আইডিএইচে মৃত্যু হওয়া ২২ শিশু শুধু ‘হাম’ নয়, ‘সহ-রোগ’ বা কো-মরবিডিটিও ছিল তাদের। এছাড়া চট্টগ্রাম, বরিশালসহ সারা দেশেই হাম আক্রান্ত বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে শিশুদের অভিভাবকদের আতঙ্ক।
চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য বলছে, যেসব শিশু হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে, তাদের জন্য এই সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে টিকা না পাওয়া ৩ থেকে ১০ মাস বয়সী শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। একদিকে রোগীর চাপে হাসপাতালের শয্যা ছাড়িয়ে বারান্দা-মেঝেতে ঠাঁই হচ্ছে অসুস্থ শিশুদের; অন্যদিকে একই ওয়ার্ডে বিভিন্ন সংক্রামক রোগীর একত্রে অবস্থান তৈরি করছে এক চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি।
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গত তিন মাসে ২২ শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ শুধু হাম নয়। চিকিৎসকদের মতে, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও জন্মগত হৃদরোগের মতো ‘সহ-রোগ’ যুক্ত হওয়ায় তারা প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে ৩ থেকে ১০ মাস বয়সী শিশুরা, যারা এখনো টিকার আওতায় আসেনি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
আইডিএইচে খবর নিয়ে জানা গেছে, হামের রোগীর প্রচণ্ড চাপে চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়ার জন্য বরাদ্দ দেওয়া ওয়ার্ডেও হামের রোগীদের রাখা হয়েছে। এতে একে অন্যের মাধ্যমে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হামের রোগীদের জন্য মাত্র আটটি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
গত ৩০ মার্চ পাওয়া তথ্য বলছে, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৮৬ জন হামের রোগী ভর্তি আছে, যার মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে। গত জানুয়ারি মাসে ২৫ রোগী ভর্তি হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে এসে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ জনে। চলতি মার্চের ৩০ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছে ৪৫৫ জন। জানুয়ারি মাসে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে একজন এবং মার্চ মাসে ২২ জন মারা গেছে।
এদিকে গত ২৯ মার্চের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৩৭ জন আক্রান্ত শিশু ভর্তি ছিল। তার আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে এক শিশু। হাসপাতাল সূত্রগুলো জানা যায়, ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের কম। অনেক রোগীরই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) প্রয়োজন হলেও আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় কাউকেই আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইসিইউ ও পিআইসিইউর জন্য সিরিয়াল দেওয়া হলেও কবে নাগাদ সুযোগ মিলবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকরা। মার্চে রাজশাহীজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১২ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত ২৬ মার্চ রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন চার শিশুর মধ্যে তিনজন মারা গেছে।
এদিকে শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল পর্যন্ত পাবনায় হাম আক্রান্ত ২৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে পাবনায় এখন পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানান, শনিবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ৭০ শিশু ভর্তি থাকলেও বিকেলে ২০ জনকে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ৩০ মার্চ সোমবার দুপুর ২টা থেকে ৩১ মার্চ মঙ্গলবার দুপুর ২টার মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ৩৫ জন পজিটিভ। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৬ জন। একই সময় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৪ জন শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে দুজন হাম সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত মোট তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে আক্রান্ত হয়ে। গত সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শাহীদা ইয়াসমিন জানিয়েছিলেন, মার্চ মাসে হামের সংক্রমণ নিয়ে একজন এবং উপসর্গ নিয়ে ২৯ জন মারা যায়।
সিলেটে সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও এই জনপদে আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। যার ফলে রোগ নির্ণয়ে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ওপর। সম্প্রতি সিলেট বিভাগে হামের প্রকোপ বাড়ায় জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। গত ২৯ মার্চ এক দিনেই বিভাগের তিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন রোগী। যার মধ্যে শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালে ১৬ জন, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ২ জন এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন ভর্তি হন। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, সিলেটে হামের নমুনা পরীক্ষা আগে কখনো হয়নি এবং বর্তমানেও ব্যবস্থা নেই, তাই নমুনাগুলো সুরক্ষিতভাবে আইসোলেশনে রেখে ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়।
খুলনায় হঠাৎ হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনই গায়ে ব্যথা, তীব্র জ্বর, সর্দি ও লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে রোগীরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসছেন। এদিকে পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে জানান চিকিৎসকরা। হাসপাতালগুলোর তথ্য বলছে, বিভাগের ১০ জেলায় অন্তত ৭৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত ২৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। এছাড়া খুলনা বিভাগের সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল মিলিয়ে ৬৩শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে, যাদের বড় অংশই হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি। এছাড়া যশোরে ৬, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ এবং ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও মাগুরায় ২ করে শিশু চিকিৎসাধীন। অন্যান্য জেলায়ও হাম ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের চিকিৎসায় পাঁচ সদস্যের মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত পাঁচ শিশুর ভর্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ভর্তি শিশুদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পরিচালক আরও বলেন, রোগীর চাপ বেশি হলে তাদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ওই পাঁচ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তারা হামে আক্রান্ত কি-না, তা রিপোর্ট এলেই জানা যাবে। রংপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফিরোজ জানান, আজ পর্যন্ত ১৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে তাদের কারো হাম শনাক্ত হয়নি।