মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসের আলোচনা সভায় বিরোধীদলীয় নেতা

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে সমাধান হবে


২৬ মার্চ ২০২৬ ২০:৩৯

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার কখনো বলছে, জনগণের রায় অক্ষরে-অক্ষরে পালন করবে আবার কখনো বলে, জনগণ না বুঝে গণভোটে রায় দিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ হ্যাঁ ভোট দিলেও সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করছে। জুলাই সনদে যেভাবে স্বাক্ষর করা হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে সমাধান হবে।
মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন এলডিপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসাইন ও মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, নায়েবে আমীর ড. হেলাল উদ্দিন, ল’ইয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এডভোকেট জসীম উদ্দিন সরকার, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, কামাল হোসাইন এমপি প্রমুখ।
এ সময় আমীরে জামায়াত বলেন, সর্বপ্রথম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম, তার পরবর্তীতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, স্বাধীনতা একটি জাতির কত বড় সম্পদ, এটি স্বাধীন জাতি বুঝে না, পরাধীন জাতি বুঝে। তিনি আরও বলেন, তৎকালীন নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতায় আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীনতার আগে একটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। ঐ নির্বাচনও সংবিধান মেনে হয়নি। কারণ সামরিক ল জারি হলে সংবিধান স্থগিত থাকে। ঐ সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি। যার ফলে তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুক্তির সংগ্রামে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি মানচিত্র ও লাল-সবুজের পতাকা পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন, যারা ৭২-এর সংবিধানের জন্য মায়াকান্না করে তাদের জানার কথা শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান সংশোধন করেছে, জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধন করেছে, বেগম খালেদা জিয়াও সংবিধান সংশোধন করেছেন এবং বেগম জিয়া বলেছিলেন, যেদিন জনগণের সরকার কায়েম হবে, সেদিন নতুন করে সংবিধান লেখা হবে। উদারতা দেখিয়ে আমাদের ডেপুটি স্পিকার দেওয়ার দরকার নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদারতা দেখিয়ে জাতীয় সমস্যা সমাধনে এক জায়গায় বসুন। এটা সংসদের ভেতরে হবে না। কারণ সংসদের ভেতরে সব দল প্রবেশ করেনি। এদেশে যারা অন্যান্য দল আছে তাদেরও অবদান আছে দেশের জন্য। মুক্তিযুদ্ধে এবং চব্বিশের বিপ্লবেও তাদের অবদান আছে। তাদের সবাইকে নিয়ে বসে কথা শুনুন, পরামর্শগুলো শুনুন। ডিসিশন তো আপনারাই নেবেন। তাই কে কী বলতে চায়, কথাগুলো শুনলে জাতি উপকৃত হবে, আপনারাও উপকৃত হবেন।
সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা মনে করি, জ্বালানি সংকট সরকারের একক নয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সরকারকে জ্বালানি সংকট সৃষ্টির আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। যদি সংকটই না থাকে, তবে তেলের পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে কেন- প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই বলেই জ্বালানি সংকটের পরও আমরা রাজপথে নেমে আসিনি। তাই সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় সমস্যা সমাধানে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার আগেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
সভায় প্রধান বক্তা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, সুশাসন নিশ্চিত না হওয়ায় এবং রাষ্ট্র কর্তৃক সর্বস্তরের বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী আজও বাংলাদেশে সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়নি। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে-স্তরে বৈষম্যের বেড়াজাল বিদ্যমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আপনার পিতা পুরো পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতা ঘোষণা করে, আপনার মা প্রসিদ্ধ হয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমে প্রসিদ্ধ হয়ে যান। এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি যখন দেশ স্বাধীন করার জন্য বিদ্রোহ করেছি, তখন সংবিধান মেনে বিদ্রোহ করিনি। কারণ সংবিধান মেনে কখনো বিদ্রোহ হয় না।
সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যখন শাসকগোষ্ঠী জনগণকে শোষণ করে, জনগণের মতের বিপক্ষে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করার চেষ্টা করে, তখনই জাতি বিপ্লবের পথ বেছে নেয়, নিতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতা মানে কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, একটি পতাকা নয়, একটি মানচিত্র নয়। স্বাধীনতা মানে কোনো জাতির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সমস্ত মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়াকেই স্বাধীনতা বলা হয়। যেই স্বাধীনতা বাংলাদেশের জনগণ আজও পায়নি। জাতিকে রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে না দিয়ে গণভোটরে রায় মেনে জুলাই সনদ আদেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, হাজারো রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ। কিন্তু যেই লক্ষ্যে মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। আজও মানুষ জীবন দিচ্ছে, রক্ত দিচ্ছে এবং আজও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। যতদিন মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জিত না হবে জামায়াতে ইসলামী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে জনগণ আবারো রাজপথে নেমে আসবে। যেই তরুণরা জীবন দিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতেই হবে। তিনি সরকার প্রধান ও সরকারি দলকে সাবধান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেই চাটুকাররা হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে ভূমিকা রেখেছে, সেই চাটুকাররা লেবাস পরিবর্তন করে বর্তমান সরকারের চাটুকারিতা শুরু করেছে। সরকারকে ব্যর্থ করতে তারা নানা রকম প্রচেষ্টা চালাতে পারে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতা পাইনি। মানুষ স্বাধীনতার জন্য আজও লড়াই করছে। তিনি আরও বলেন, আমরা যুদ্ধ করেছি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়। যাদের বয়স ৫০ বছর তারা কিভাবে যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী হয় প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধী নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অপপ্রচার চালানো হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাদের যুদ্ধাপরাধী মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। বিচারের নামে অবিচার করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকে বিচারিক হত্যা করা হয়েছে। যারা কেউ যুদ্ধাপরাধী ছিল না।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের। কিন্তু তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পালিয়ে গেছেন। শুধু শেখ মুজিবুর রহমানই পালিয়ে যায়নি, তখন তাজউদ্দীন আহমদসহ শীর্ষ নেতারা পালিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগের কোনো স্তরের কোনো নেতাকর্মী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তারা ভারতে পালিয়ে ছিল। স্বাধীনতার পরে তারা ভারতের সাথে গোপন চুক্তি করে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে শাসনক্ষমতা দখল করে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। তিনি আরও বলেন, যারা আজ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায় না তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। জনগণ যখন বিপ্লবের সাধ আর স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, তখন কোনো সরকারই জনগণের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে টিকে থাকতে পারে না। আরেকবার যদি বিপ্লব হয়, তবে জনগণ এই সংবিধান বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন সংবিধান লিখবে।
আব্দুস সবুর ফকির মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, পাকিস্তানির শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এদেশের দামাল ছেলেরা জাতিকে পাকিস্তানের শোষণের হাত থেকে মুক্ত করলেও বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও স্বাধীনতার প্রকৃত সাধ ভোগ করতে পারেনি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ ১৫ বছর শাসন ব্যবস্থায় জনগণের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযদ্ধের চেতনায় ২০২৪ সালে এদেশের ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতিকে ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত করে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে এনেছে। চব্বিশের চেতনা আর একাত্তরের চেতনা একই সূত্রে গাঁথা। জুলাই চেতনায় পুরনো ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক সমঝোতায় জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছে। জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জুলাই সনদ আদেশ জারি হয়। সেই আদেশের বৈধতার লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার জনগণের রায় মেনে এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।