আলোকে তিমিরে

ব্যথাভরা আনন্দ কথকতা


২৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:২১

মাহবুবুল হক

॥ মাহবুবুল হক ॥
বিএনপির প্রথম রমাদান ও প্রথম ঈদ (২০২৬-এর ক্ষমতা গ্রহণের পর)। ভেবেছিলাম, মানবিক দিক থেকে উন্নততর কিছু প্রোগ্রাম থাকবে।
তারেক জিয়ার বহুল আলোচিত ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লানে’ রমাদান ও ঈদে ভালোর দিকে চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় কিছু একটা থাকবে। যেমন ছিল গত রমাদান ও ঈদে। অর্থাৎ ২০২৫ সালের রমাদান ও ঈদে। আমাদের মতো বয়স্ক মানুষ মহান আল্লাহর রহমতে যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন মনে রাখবে, ততদিন আনন্দচিত্তে স্মরণ করবে।
গত ৭০ বছরে আমরা যা দেখিনি, যা উপলব্ধি করিনি, যা বিশ্বাস করিনি, যা আশা করিনি, আল্লাহর ইচ্ছায় তাই আমরা দেখেছি, উপলব্ধি করেছি এবং নতুন এক জীবন্ত আশায় উদ্বেলিত হয়েছি। এ বিষয়ে কারো কাছ থেকে কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের সঞ্চয় করতে হয়নি। আমরা নিজেরা নিজেদের এলাকায় বরাবরের মতো বসবাস করে এই অনুভব, অনুধাবন ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় অবগাহন করে চাক্ষুষভাবে অবাক হয়েছি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-এর রজব মাসে যখন কিঞ্চিত উঁচা গলায় বলল, ‘এবার আমরা রমাদান মাসে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে দেব না।’ দেশের মানুষ এ কথায় একদম কান দেয়নি। কারণ এ ধরনের কথা চিরকাল তারা শুনে এসেছে। মতবাদ-আদর্শ নির্বিশেষে সব সরকারই এ ধরনের কথা বলে এসেছে। কিন্তু কোনোদিন এ ধরনের কথা বাস্তবায়িত হয়নি। কেউ প্রোগ্রাম করে বাস্তবায়ন করেনি। কেউ কেউ চেষ্টা করে উপলব্ধি করেছে, এ এক বিশাল ‘ব্লাকহোল।’ একটা অত্যাশ্বর্য খনি, সেখানে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য। মান যাবে, সম্মান যাবে, ইজ্জত যাবে, চাকরি যাবে, এমপিগিরি যাবে, এমনকি পৈত্রিক, জানটাও চলে যেতে পারে। এই খনি বা ব্ল্যাকহোলের নাম ‘সিন্ডিকেট’। এর সাথে শুধু এদেশের টেন্ডারবাজরাই শুধু যুক্ত নয়, এদেশের আমদানিকারকরাই শুধু যুক্ত নয়, যুক্ত নয় শুধু ব্যাংক, বীমা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, এনজিও, দালাল, কমিশন হান্টার, হোর্ডার, মধ্যস্বত্বভোগী, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী, রাজস্ব বোর্ড, প্রতিবেশী দেশসমূহ, বিরোধীদলসমূহ, নানাজাতের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি সমিতিসমূহ, বার্গেনিং এজেন্ট, গুদামজাতকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থাসমূহ, ক্লিয়ারিং এজেন্ট, সমুদ্রবন্দর থেকে ক্লিয়ারিং না মধ্যসমুদ্র থেকে ক্লিয়ারিং, নদীমাতৃক দেশে নৌযানে ক্লিয়ারিং, না সড়কপথে ক্লিয়ারিং, এর সাথে ভূ-বাণিজ্য, আঞ্চলিক বাণিজ্য, গডফাদারদের ট্যাক্স, কমিশন; এমনকি ডিপস্টেট পর্যন্ত।
২০২৫ সালের শাবান মাস পর্যন্ত জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকলো। সরকার সিন্ডিকেটের গায়ে টোকাও মারতে পারলো না। সবকিছু একসূত্রে গাঁথা। উচ্চমধ্যবিত্তরাই কোনো না কোনোভাবে এই গাঁটছড়ার সাথে সংযুক্ত ও সম্পৃক্ত। ফ্যাসিবাদী সরকার থাকতে সকল কিছুর মালিক-মুখতার তারা ও তাদের দলভুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীরাই শুধু ছিলেন এমন নয়, তাদের বিরোধী বহু বটগাছ ও গডফাদার এদের সাথে সংযুক্ত ছিলেন। চলমানতা ও ভবিষ্যতের লিং ঠিক রাখার জন্য এ সকল ব্যবসা বরাবরেই ছিল। বলতে গেলে প্রথম থেকেই ছিল। সালমান এফ রহমান ও বিএনপির কিছু লোকের শেয়ার ব্যবসা সর্বজনবিদিত। সরকারি দলের এমপি ও বিরোধীদলের এমপির ব্যবসার কথা ৮০-এর দশক থেকে চাউর হয়ে আছে। জাতীয় পার্টির লোকজনের সাথে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ব্যবসার কথা কে না জানে। এসব বর্তমান যুগের চরম বাস্তবতা। রাজনৈতিক টালবাহানা, হাডুডু, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, খুন, গুম চলে একদিকে; অন্যদিকে চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের গুণটানা, বৈঠা ও ছইটানা। মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। একই সময় জনগণকে পণবন্দি রেখে এদেশের সরকারি দল ও বিরোধীদল ব্যবসা করেছে। সেজন্যই এদেশের ব্যবসায়ীরা হয়েছেন এমপি, আবার এমপিরা হয়েছেন ব্যবসায়ী। এদেশে শক্তিশালী একটা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি জোট আছে। এরাই দেশের সর্বেসর্বা, এরাই দেশের প্রকৃত স্টেকহোল্ডার।
অন্তর্বর্তী সরকার দেখল, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে দিব্যি বসে আছে এদেশের বিএনপির সঙ্গে জড়িত নানা গোষ্ঠী ও পতিত আওয়ামী লীগের গডফাদার গোষ্ঠী। সুতরাং সর্বোচ্চ জায়গায় তারা হিট করতে পারল না। সেখান থেকে সরে এসে তারা দ্বিতীয় পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে কিছু কাজ করতে পারল। এখানে মহিলা ম্যাজিস্ট্রেট ও সেনাবাহিনীকে প্রদত্ত ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতা বেশ কাজে লাগলো। সরকার দেশময় কাজটা চালু রাখলো। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটদের ক্ষোভ বা বিক্ষোভ খুব একটা দেখা যায়নি। ফলে গুদাম খালি হলো। পণ্য খোলাবাজারে চলে এলো। প্রচুর আমদানি হলো। টিসিবির মাধ্যমে সরকার আমদানি ও বাজারজাত করায় রমাদান মাসে সত্যি সত্যি দ্রব্যমূল্য কমে গেল।
সে সময় একজন ঝানু ব্যবসায়ী ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি তার কথা রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি কথা বলেছেন কম, কাজ করেছেন বেশি। তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে প্রথম জেনারেশন ছিলেন না। ছিলেন বলতে গেলে তৃতীয় জেনারেশন। তার পারিবারিক অভিজ্ঞতা ছিল অতল। সেই অভিজ্ঞতা দেশের কাজে তিনি অবিচল ও অটলভাবে নিযুক্ত করেছেন। ফল হয়েছে। বহুকাল পরে রমাদানে অলৌকিক বাস্তবতা দেখেছে দেশবাসী। খুশি হয়েছে তারা। জীবনে যা তারা কখনো দেখেনি, তাই তারা দেখেছে। সেজন্য তারা ড. ইউনূসকে সরকারে রাখার জন্য ২০২৫ সালে স্লোগান দিয়েছে এবং মিছিল করেছে।
২০২৫ সালে ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া-আসার জন্যও দেশবাসীর পরিবহন খরচ বাড়েনি। সরকার সেক্যুলার হলেও রমাদান ও ঈদকে যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছে। সাথে সাথে এ বিষয়টি তারা উপলব্ধি করেছেÑ ঈদ ও রমাদানের সাথে শুধু মুসলিমদের আত্মিক সম্পর্ক নয়, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, উপজাতি নির্বিশেষে দেশ ও জাতির সবার সম্পর্ক ওতপ্রোত। আর যদি রাজনীতির কথা টেনে আনি, তাহলে দেখা যাবে, ধর্মের সাথে সম্পর্কিত মানুষের তুলনায় ঈদের বাহ্যিক আনন্দ-উৎসব সেক্যুলার মানুষের অনেক বেশি। ঈদের উৎসব মজবুত করার জন্য তাদের করপোরেট পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকে অনেক বেশি। ঈদ তাই বাংলাদেশে সর্বজনীন এক মহোৎসব।
ধর্মের নিগূঢ় অবস্থানের দিকে চোখ ফেরালে আমরা অনুধাবন করতে পারি, রমাদান ও ঈদের সাথে শুধু মানুষের একক সম্পর্ক ও সম্বন্ধ বিরাজমান নয়, এসবের সাথে সৃষ্টির সকল কিছুর অনিবার্য সম্পর্ক রয়েছে। গাছপালা, গৃহপালিত পশুপাখি, নদী-নালা, হাওর-বিল, পাহাড়-পর্বত, বন-বাদাড়, আকাশ-মেঘ সবকিছুর অনিঃশেষ লিঙ্ক রয়েছে। এ সময়গুলোয় প্রকৃতির সমস্ত ইউনিট কীভাবে মানুষকে সহযোগিতা করে অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রই তা বিস্ময়ের সাথে অনুভব করতে পারেন।
শুধু রমাদান ও ঈদে সৃষ্টির সকল ইউনিট মানুষকে সহযোগিতা করে তা নয়, প্রকৃতি মহান আল্লাহর নিকট সম্পর্কিত জীবসত্তা। যখন মানুষ আল্লাহর নিকট প্রকৃতির মতো সম্পর্কিত হয়, তখন গোটা জাহানের সকল জীবসত্তা মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। মানুষের জন্য তারা দোয়া করে। মহান আল্লাহর নিকট মানুষের কল্যাণের জন্য আহাজারি করে।
রমাদানে মহান আল্লাহর সর্বশেষ সংবিধান বা ‘জগৎ ও জীবনবিধান’ (কুরআন) নাজিল হয়। এ মাসেই এমন একটা রাত মানুষের সামনে সমুপস্থিত হয়, যার তুলনা হাজার রাতের (আরবি ভাষায় হাজারের অর্থ অগণিত, সীমাহীন, সংখ্যাহীন, অসীম ইত্যাদি) চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এ রাতে যারা তাওবা করে মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাদের তিনি ক্ষমা করেন। তাদের জগৎ ও জীবনকে তিনি মহিমাময় করে দেন এবং পরকালের জীবনকে ঐশ্বর্যময় করে তুলবেন বলে তাঁর জীবনবিধানে বারবার উল্লেখ করেছেন।
এসব কারণে রমাদান ও ঈদ মানুষ ও প্রকৃতির কাছে এত তাৎপর্যময়। এত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত। প্রকৃতির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সাহায্য যখন নাজিল হয়, তখন তা ইন-জেনারেল সবার ওপর নাজিল হয়। বৃষ্টি হলে প্রকৃতি ও মানুষ সবার কল্যাণ ও মঙ্গল হয়। আস্তিকদের, মুমিনদের, মুসলিমদের উপকার হয়, কিন্তু নাস্তিকদের বা অসমর্পিতদের অপকার হয়Ñ এমন তো নয়। আল্লাহ সবার। যারা মহান আল্লাহর বিরোধিতা করে তারাও আল্লাহর, সুতরাং রমাদান ও ঈদ উৎসবকে যারা সহজ ও সরল করার চেষ্টা করেন, আমরা বিশ্বাস করি তাদের মহান আল্লাহ ভালোবাসেন। এ ভালোবাসা ২০২৫-এর সরকার পেয়েছে ও পাবে।
এবার আসি ২০২৬ সালের রমাদান ও ঈদুল ফিতর প্রসঙ্গে। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই রমাদান শুরু হয়ে যায়। নতুন সরকারও গঠিত হয়ে যায়। সুতরাং এবারের রমাদান ও ঈদের ভালো-মন্দ সম্পর্কে আমরা যার যার প্লাটফর্ম থেকে কথা বলতে পারবো। আলোচনা-সমালোচনা করতে পারবো। কিন্তু সকল ভালো ও মন্দের জন্য একতরফাভাবে বিএনপি সরকারকে সম্পৃক্ত ও সংশ্লিষ্ট করতে পারবো না। বিএনপি উত্তম কাজ করার উদ্যোগ নিতে পারেনি। সেজন্য সরকারি দলকে আমরা যেমন প্রশংসা করতে পারবো না, তেমনি সময় তাদের হাতে খুব একটা ছিল না। তারপরও সরকার ও সরকারি দল উত্তম কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে- এ প্রশংসা কেন আমরা করবো না? অবশ্যই করবো।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে রাখা ভালো। দেশবাসীর সাধারণ ধারণা ছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন করার পূর্ব পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার সচল ও সক্রিয় থাকবে। কিন্তু দেখা গেল অন্তর্বর্তী সরকার কোনোরকমে ডিসেম্বর-২০২৫ পার করেই হঠাৎ এলোমেলোভাবে পিআরএলে চলে গেল। জানুয়ারি থেকেই সরকার নেই, এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল। প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তার সাথে ৩-৪ জন উপদেষ্টা ছিলেন। বাদবাকিরা থাকলেও শব্দ ছিল না, নড়াচড়া ছিল না। জাতীয় নির্বাচনে প্রকাশ্যে তাদের কোনো ভূমিকা পরিদৃষ্ট ছিল না। নীরবে বা গোপনে কার কী ভূমিকা ছিল, তাও আমরা জানি না। যদিও সরকার গঠনের পর একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীকে তার সরকার ক্ষমতায় যেতে দেননি। এমনকি জামায়াতে ইসলামী বিরোধীদলে আসুক- এটাও তারা চাননি। তারা চেয়েছিলেন, অন্য কেউ আসুক। সেটা হয়নি। বিরোধীদলে জামায়াত- সুতরাং দেশবাসীকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। ধর্মীয় চরমগোষ্ঠীকে সবসময় ঠেকাতে হবে।
তার কথা হুবহু লিখতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ঈদের ছুটিতে ঢাকার বাইরে চলে আসায় সেটা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে মান্যবরের কথা এমনই সুস্পষ্ট ছিল। তিনি সাহস করে সত্য কথা বলেছেন। সেজন্য তাকে খোশ আমদেদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই এবং ভবিষ্যতে তার এ বক্তব্য দেশ ও দশের জন্য অনেক কাজে লাগবে বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি। এমনও তো হতে পারে, এমন একদিন আসতে পারেÑ তিনি হয়তো প্রকাশ্যে বলবেন, দেখুন, আমি সৈয়দ বংশের লোক। রাসূল (সা.)-এর ঐতিহ্যিক বংশের লোক। আমি কী ইসলামের বাইরে গিয়ে কাফের বা মুশরিক হতে পারি? অবশ্যই পারি না। আজকাল অনেক বরেণ্য মানুষ সৈয়দ বংশের লোক হয়েও নামের পূর্বে সৈয়দ লিখতে কুণ্ঠাবোধ করেন। লেখেন না। লজ্জাবোধ করেন। অথচ দেখুন, আমি মৌলবাদীদের মতো সারা জীবন সৈয়দ শব্দটি নামের পূর্বে ধারণ করে আছি। বলতে কুণ্ঠাবোধ করছি, মুসলিম মানসের শ্রেষ্ঠতম কবি ফররুখ আহমদও নামের আদ্যাংশে সৈয়দ লিখতেন না। আবার কবি আব্দুল মান্নান নামের শেষে সৈয়দ লিখতেন। সামনে লিখতে শরম পেতেন। তার মতো আরও অনেকেই আছেন ‘সৈয়দ’ শব্দটি নিয়ে বিস্তর টালবাহানা করেছেন। আমি করিনি, আমি সৈয়দা লিখতে গর্ব অনুভব করি। নির্বাচনের পর আমি যা বলেছি, সত্য বলেছি এবং জেনে-বুঝে জামায়াত তথা ইসলামের পক্ষে কথা বলেছি।
এবারের রমাদানের পূর্বে আমরা যা দেখেছি, তা হলো ব্যবসায়ীরা ম্যাজিস্ট্রেটদের বেধড়ক পিটিয়েছে, মারধর করেছে, এমনকি মহিলা ম্যাজিস্ট্রেটদেরও লাঞ্ছিত করতে ছাড়েনি। যা ছিল ২৫ সালে অনুপস্থিত। ২৫ সালে বাজারে অন্তত সরকার ছিল। ২০২৬ সালে বাজারে ছিল আওয়ামী ও বিএনপির ব্যবসায়ীরা, গডফাদাররা। তারা জানতো, বাজারে কোনো সরকার নেই। সরকার পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য যারাই আসবে, তাদেরই হেনস্তা করা হবে। গডফাদারগণ তাই করেছে। সুতরাং রমাদানে জিনিসপত্রের দাম তো কমেনি, উপরন্তু দেশময় বাজারে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, যা কখনো দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেনি। অনেকেই বলেছেন, বিএনপি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিল, সে কারণে রমাদানের বিষয়টিতে তারা মনোযোগ দিতে পারেনি। কিন্তু বাজারে যা ঘটেছে, তা তো বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের নির্দেশেই হয়েছে। বাজারে তো অন্তর্বর্তী সরকার কখনো ছিল না।
২০২৪-এর বিপ্লবের পর স্থানীয় সরকার, হাট-বাজারসহ যা কিছু সবকিছুই তো বিএনপির দখলে ছিল। জেলা পর্যায়ে সামান্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া (অন্তর্বর্তী সরকারের) বিএনপির নিয়ন্ত্রণই ছিল সর্বত্র। এ বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। জীবনে ওই একটি বছর (২০২৫) দেশবাসী রমাদানে একটু স্বস্তি ও শান্তি পেয়েছে- এ সুখানুভূতি নিয়েই দেশবাসী কবরে যাবে।
এবার “স্বপ্ন” বাড়ি যায়নি। বিএনপির আমলে রমাদান যেভাবে পার হয়েছে, সেভাবেই বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টিও অতিক্রান্ত হয়েছে। পরিবহন ব্যয় ২-৩ গুণ বেশি ছিল। কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কী ট্রেন, কী বাস, কী স্টিমার, কি লঞ্চ কোথাও কোনো স্বস্তি ছিল না। লঞ্চের ধাক্কাধাক্কিতে ২ জন মানুষের দেহ খণ্ডিত হয়ে সলিল সমাধি হতে হতে কী হয়ে গেল, তা অবর্ণনীয়, অচিন্তনীয়, নিষ্ঠুর ও নির্মম। পরিবহন ব্যয় ও রাস্তাঘাটের ঝামেলা, উটকো ঝামেলা, শৃঙ্খলার ঝামেলা, মান-সম্মান-ইজ্জতের বড় ঝামেলা ছিল এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। পরিবহনের ব্যয় বাধ্য হয়ে মেটাতে গিয়ে ঈদের খুশি বা আনন্দ এবার অনেকাংশে উবে গেছে। বাড়িতে বা গ্রামে যাওয়া-আসা হয়তো অনেকের হয়েছে, কিন্তু সুখ-শান্তি-স্বস্তি বাস্তবে কারো মনে উঁকি মেরেছে বলে মনে হয় না। একরাশ হতাশা এবং নিরাশাই ছিল ঈদের কড়চা। আদর বা স্নেহের বশে ‘ঈদী’ দেওয়ারও অনেকের সঙ্গতি ছিল না। এক ধরনের কমতি, হাহাকার বা আফসোস সব স্বপ্ন বাড়িতে বিরাজ করছিল। অনেকেই ব্যথাতুর মনে মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলে বলেছেন, হে আল্লাহ! গাফুরুর রাহীম। এমন রমাদান এবং ঈদ যেন আমাদের জীবনে না আসে।