বিপ্লবোত্তর ঈদুল ফিতর কেমন কাটল?


২৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:১৬

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মুসলমানদের বছরে দুটি বড় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ২০২৪-এর বিপ্লবের পর এই প্রথম বাংলাদেশে মুক্ত পরিবেশে ঈদুল ফিতর কয়েকদিন পূর্বে উৎসবমুখর পরিবেশে হয়ে গেল। আমরা যারা ঢাকায় ঈদ করেছি, তাদের চেয়েও যারা গ্রাম-গঞ্জে গিয়ে ঈদ করেছে, তাদের খুশির খবর বেশি। কারণ এলাকায় মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, গ্রামবাসীর সাথে ঈদের মাঠে নামাজ পড়া বড়ই আনন্দের। আমরাও ছোটবেলা এবং যতদিন মা-বাবা বেঁচেছিলেন বাড়িতে গিয়েই ঈদ করেছি। ভালো লাগতো। এখন যেহেতু গ্রামের বাড়িতে কেউ নেই, তাই আর যাওয়া হয় না। এবার ঈদের নামাজ পড়লাম ছেলে-নাতিসহ ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ভাব থাকলেও বিরাট মাঠ ভরে গিয়েছিল। আনন্দেই কাটল। এক পথে যাওয়া, এক পথে আসা। ঢাকা শহরে হলেও আমরা ৩০টি ফ্ল্যাটের মানুষ সবাই ছাদে পুরুষ-মহিলা পৃথকভাবে সবার খাবার নিয়ে আমরা ছাদে যাই। পৃথক কামরায় চেয়ার-টেবিল বসানো থাকে। প্রত্যেকেই তাদের নিজের খাবার ও প্রতিবেশীদের খাবার যোগ করে আলাদা স্বাদে ঈদের খাবার আমরা উপভোগ করেছি এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি। গ্রামে যেমন সমাজের লোকদের একসাথে ঈদের আয়োজন সারে, আমরাও ঢাকা শহরে এভাবেই সবাই ঈদ উৎসব পালন করি। সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ এখানেই হয়ে থাকে। আপনারাও শহর-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে সবাই মিলে একসাথে ঈদ আয়োজন করলে আনন্দ পাওয়া যাবে।
উল্লেখ থাকে যে, ঢাকা শহর থেকে প্রায় কোটি লোক গ্রামে যাওয়ায় ঢাকার সড়ক ছিল ফাঁকা। এবারের বড় বিষয় ছিল গ্রাম-গঞ্জে যাওয়ার জন্য বাস ভাড়া অতিরক্ত আদায় নিয়ে। মন্ত্রী বলেছিলেন, ভাড়া বেশি নেয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে মিডিয়ার সামনে যাত্রীরা বলছিল, ভাড়া বেশি নেয়া হয়েছে। আপনারাও দেখেছেন। মন্ত্রীদের মুখে যখন আমরা চাঁদার ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে দেখি, তখন সাধারণ মানুষের জন্য চাঁদা থেকে বাঁচার কোনো বাস্তব অবস্থায় ফিরে আসার কোনো পথ থাকে না। এখনো গ্রামের নিত্যপণ্য যখন শহরে আসে, তখন সেগুলোর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। জামায়াত জোটের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন তার এলাকা ঢাকার কাওরান বাজার। তিনি ব্যবসায়ীদের নিয়ে একাধিকবার বসেছেন কীভাবে চাঁদামুক্ত পরিবেশ তৈরি করা যায়। আমরা আশা করব, প্রত্যেক এমপি যদি তার এলাকার বাজার কমিটির সাথে বসে এ ফাও খাওয়ার ঐতিহ্য বিদায় দিতে পারেন, তবে সাধারণ মানুষের জন্য বড় উপকার হবে। দেশের আর্থিক খাত চাঁদামুক্ত হতে পারবে। মিডিয়ায় জানা গেল, এবারও নাকি রোজার আগে চাঁদা আদায় হয়েছে ১৪৮ কোটি টাকা। ভাগ-বাঁটোয়ারা তো এলাকার ছেঁচড়া চাঁদাবাজ ওপরতলার লোকদের ভাগে গেছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। বিশেষ করে বাস, লঞ্চ ও ট্রেনের ভোগান্তি এবং বড় ধরনের এক্সিডেন্টে মানুষের প্রাণ গেছে প্রায় ৩০ জনের মতো। আবার আহত হয়েছে কয়েকশত। শুধুমাত্র গেট রক্ষকদের চাকরি গেলেই চলবে না আর নিহতদের জনপ্রতি পরিবারকে সরকারের পক্ষে থেকে ১ লাখ আর জেলা প্রশাসকদের থেকে ২৫ হাজার টাকা দিলেই চলবে না। নিহতদের পরিবারের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করে দিতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। স্থানীয় এমপি সাহেবদেরও পজিটিভ ভূমিকা রাখতে হবে।
এবারে বড় ধরনের চমক দেখা গেছে, জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট এক কাতারে নামাজ পড়েছেন। কোলাকুলি করেছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রেসিডেন্টের সাথে। জনগণ এটা খুব ভালো চোখে দেখেনি। এই দহরম-মহরম আওয়ামী ও বিএনপির ঐকমত্য। এ প্রেসিডেন্ট যেখানে শেখ হাসিনাকে পায়ে ধরে সালাম করতেন, তার সাথে বিপ্লবের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বুক মেলালেন। আমার মনে হয়, যেহেতু সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে যেভাবেই হোক তাদের উচিত তাদের পছন্দমতো ভালো একজন প্রেসিডেন্ট বানানো। আমরা মনে করি, বিরোধীদলও তাদের উদ্যোগকে সাড়া দেবে। জনগণও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।
প্রধানমন্ত্রী তার যমুনার বাসায় কূটনৈতিক ও দেশের গণ্যমান্য লোকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন; এমনকি গত সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবও যমুনায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে, ভালোই মনে হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধীদলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার সরকারি বাসভবন ২৯ মিন্টো রোডে কূটনৈতিক মিশনপ্রধানদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। আবার দেশের রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশার গণ্যমান্য পুরুষ-মহিলাদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। পরিবেশটি ছিল খুবই উৎসবমুখর ও বিভিন্ন পেশার লোকদের মিলনমেলা। বিরোধীদলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে জামায়াতের নির্বাচিত এমপি এবং কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। দেশের সরকারি ও বিরোধীদল যদি ভূমিকা নিয়ে দেশ চালায়, তবে কারো প্রভূত্ব যেমন মানতে হবে না, তেমনি এই ১৮ কোটি মানুষের দেশ, ৫৫ হাজার বর্গমাইলের দেশ, নদী, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বতঘেরা আমাদের এই জন্মভূমিকে আমরা দুনিয়ার বুকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। আরো সুবিধা হলো আমাদের জনসংখ্যার ৯২% লোক এক আল্লাহ বিশ্বাসী অন্যদিকে অন্যান্য ধর্মের লোকদের সাথে রয়েছে ভালো সম্পর্ক। ভারতে ৩০ কোটি মুসলমান থাকলেও সেখানে তারা নির্যাতিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে। আবার এই মোদির আমলেই বাবরী মসজিদ ভেঙে মন্দির করেছে, যা বাংলাদেশে কল্পনাও করা যায় না। আমরা এক আল্লাহর বান্দা। আমরা গোটা দুনিয়ায় সমৃদ্ধির দুনিয়া বানাতে চাই। ঢাকায় দীর্ঘদিন ছুটি থাকার কারণে ঢাকার আশপাশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় জনগণের ছিল উপচেপড়া ভিড়। আমাদের সাথে তারা সময় কাটিয়েছে ছেলেমেয়ে নাতি-পুতিসহ। মাঝেমধ্যে এমন ছুটি কাটাতে পারলে মন ও শরীরের উপকার হয়। যদিও আমেরিকা ক্ষমতার বলে ট্রাম্প মুসলিম দেশ ইরানের ওপর অসম ও অতর্কিত যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে বড় বড় নেতাকে মেরে ফেলছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি। মুসলিম দেশগুলো ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে ইরানের পাশে দাঁড়াই এবং আমেরিকা ইহুদিবাদ নেতানিয়াহুর ইসরাইলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। মহান আল্লাহ আমাদের ঐক্য ও সংহতি দেখলে সহযোগিতা করবেন আমরা ধরে নিতে পারি। গোটা দুনিয়াতেই এবার আমেরিকা ও ইসরাইলের আক্রমণের ফলে ঈদুল ফিতর উদযাপন কষ্টের মধ্যেই পালন করতে হয়েছে। অনেক দেশ খোলামাঠে নামাজ আদায় করতে পারেনি। মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল আকসা মসজিদেও ইসরাইলিরা মুসল্লিদের নামাজ পড়েত দেয়নি। তাই ইহুদিবাদী ইসরাইলের পতন হবেই, ইনশাআল্লাহ। শুধুমাত্র মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য দরকার। সম্পদ ও সামরিক দিক থেকেও খুব একটা কমতি নেই ইরান ও মুসলিম দেশগুলোর। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া প্রকাশ্যে ইরানকে সাপোর্ট দিচ্ছে। ন্যাটোভুক্ত দেশ এবং আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন সে দেশের জনগণেরও সমর্থন পাচ্ছে না। আমরা আশা করি, এবার রফাদফা একটা হয়ে যাবে।
যুদ্ধ লাগার কারণে গোটা দুনিয়ায় অর্থনৈতিক দুরবস্থা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। দেশে দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশসহ সর্বক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। ইরানের হরমুজ প্রণালী জ্বালানি তেলের সরবরাহের বড় উৎস। যদিও ইরান বলেছে, বন্ধু রাষ্ট্রের তেল সরবরাহে বাধা নেই। আমাদের জ¦ালানিমন্ত্রীও আশ্বস্ত করেছেন যে, জ¦ালানি তেলের কোনো ঘাটতি হবে না। তবে সরকার থেকে জ¦ালানি সাশ্রয়ের ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছে। ঈদুল ফিতরের ব্যাপারে বলতে গেলে আমরা যদিও ভালো-মন্দের মধ্যেই কাটাতে পারলাম। কিন্তু আমাদের ফিলিস্তিনের ভাই-বোনরা করুণভাবে যুদ্ধের মধ্যেই ঈদ উদযাপন করেছেন। যুদ্ধের দামামা আমেরিকা ও ইসরাইলের বোমার মধ্যেও তারা আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে ভোলেননি। আমরা যুদ্ধ চাই না।
দেশের রাজধানীসহ বড় বড় শহরগুলোয় খোলামাঠে ও মসজিদগুলোয় মানুষ ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন। গ্রাম-গঞ্জে যাওয়ার জন্য যেমন বাস, লঞ্চ, রেলে করে মানুষ গেছে, আবার দীর্ঘ ৭ দিন ছুটি ভোগ করে আবার যার যার কর্মক্ষেত্রে ফিরতে শুরু করেছেন। আমাদের দেশের মানুষ যেমন উৎসবমুখর দুই ঈদে গ্রামমুখী হন অন্য দেশে এমন আছে কিনা, তা আমার জানা নেই। তবে আমাদের দেশ থেকে অনেকেই যাদের সামর্থ্য আছে, তারা রোজার শেষ দশ দিন কাবায় ইতিকাফ করতে যান। রোজার মধ্যে আমারও একবার কাবায় থাকার সুযোগ হয়েছিল, আলহামদুলিল্লাহ। কাবা ও মদিনার মসজিদে কিন্তু ২০ রাকাত তারাবি হয়। সবচেয়ে উপভোগ্য মদিনায় ইফতার আয়োজন। মদিনার মসজিদে আসরের পর থেকেই গোটা মসজিদে ইফতারের বিছানা দেয়া হয়। ছোট বড় সবই চায় যেন তাদের সাথে আপনি ইফতার করেন। খেজুর থেকে শুরু করে চায়ের মতোই এক প্রকার পানীয় ‘গাওয়া’ পরিবেশন করা হয়। প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যেই ইফতার শেষ করে ইফতারির বিছানা গুটিয়ে ফেলে মাগরিবের নামাজে শরিক হওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। মদিনায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা বা ভিন্ন পথে ঢুকতে হয়। বের হওয়ার সময় আবার যার যার সাথীদের সাথে মিলিত হওয়া যায়। কোনো অসুবিধা হয় না।
বর্তমানে প্রায় সব দেশেই গ্রুপ করে হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজ ও ওমরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে হজ ও ওমরাহ করার আয়োজন সহজ হয়েছে। হজ এজেন্সির লোকের অভিজ্ঞ লোক হজ ও ওমরাহকারীদের গাইড করে থাকেন। খাওয়া-দাওয়া, যাতায়াত হোটেল থাকা সবই তারা করে থাকেন। বাংলাদেশেও শহর থেকে গ্রামে এই হজ এজেন্সির শাখা আছে। আপনারা অভিজ্ঞ হজ এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করলে তাদের সহযোগিতায় আপনি নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যভাবে হজ ও ওমরাহ করতে পারবেন।
রোজার পর ছয় রোজার ডাবল সওয়াবের মওসুম চলছে। আমরা যারা সোমবার, বৃহস্পতিবার ও আইয়ামে বীজের তিন রোজা রাখি তারা যদি এর সাথে ছয় রোজার নিয়ত করি তবে ডাবল সওয়াব হয়ে যাবে। সাথে সাথে ৩৬০ দিনের মহান আল্লাহ রোজার রাখার সওয়াব আমাদের দেবেন।
পূর্বের তুলনায় মক্কা-মদিনার ব্যবস্থাপনায়ও আধুনিকতার ছাপ লক্ষ করা যায়। পূর্ব থেকে এজেন্সিগুলো সে দেশের মোয়াল্লেমদের যোগাযোগ করে হাজী সাহেবদের থাকা-খাওয়া, যাতায়াতে এবং দর্শনীয় জায়গায় সফর করতে কোনো অসুবিধা হয় না। আমাদের নিয়ত এবং সুস্থতা খুবই জরুরি। সাথে পাসপোর্ট ও রিয়ালের ব্যবস্থা এবং বর্তমানের টেলিফোনের কারণে হারিয়ে যাবার যেমন ভয় নেই, অন্যদিকে দিকনির্দেশনারও ভালো ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা আগামী দিনের হজ, ওমরাহ এবং ঈদুল আজহা যথাযথভাবে পালনের আশা রেখে এবং এবারের যাতায়াতের যেমন বাস-ট্রেনে অসুবিধা হয়েছে, তা যেন শুধরাতে পারি, সে ব্যাপারে সরকারকে আগে থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের ওপর অর্পিত ফরজ ও ওয়াজিব যাতে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারি, সেই আশা রেখে শেষ করছি।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com