আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক দলে শিক্ষণ ক্ষতি


২৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:১০

॥ ওয়াহিদ মুন্না ॥
শিক্ষণ ক্ষতি এখন শিক্ষা ও নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সহজ ভাষায়, শিক্ষণ ক্ষতি হলো এমন অবস্থা যখন প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা যায় না। কখনো তা কমে যায়, কখনো পুরোপুরি থেমে যায়।
এই ধারণাটি শুধু বিদ্যালয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক দল এবং জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শিক্ষণ ক্ষতি দেখা যায়। যখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করতে পারে না, তখন সেখানে জ্ঞান ঘাটতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রশাসন, রাজনীতি এবং শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই জ্ঞান সঞ্চয়ের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষণ ক্ষতি ও জ্ঞান ঘাটতির ধারণা
একাডেমিকভাবে শিক্ষণ ক্ষতি বলতে বোঝায় প্রত্যাশিত জ্ঞান অর্জন ও বাস্তব জ্ঞান অর্জনের মধ্যে পার্থক্য। জ্ঞান অর্জন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মানুষ শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে। এ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হলে শিক্ষণ ক্ষতি ঘটে। জ্ঞান ঘাটতি তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান, গবেষণা বা অভিজ্ঞতা থাকে না। তখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো সমস্যা ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হয়ে যায়। এ কারণে শিক্ষণ ক্ষতি শুধু শিক্ষা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আমলাতন্ত্রে জ্ঞান অর্জন
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় কিছু মন্ত্রণালয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়গুলো জাতীয় বাজেট, প্রশাসনিক নীতি এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে এখানে কর্মরত কর্মকর্তারা নীতি প্রণয়ন ও প্রশাসনের গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এ ধরনের মন্ত্রণালয়ে কাজ করলে একজন কর্মকর্তা রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব জ্ঞান লাভ করেন। তারা বাজেট ব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সমান্তরাল দক্ষতা অর্জন করেন।
অন্যদিকে ছোট কিছু সাংস্কৃতিক ও ছোট কমিশন রয়েছে যেমন নদী রক্ষা কমিশন (নরক), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি। এ প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রশাসনিক ক্ষমতার দিক থেকে এগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট। তাই তো সরকারের সুনজরে যেসব কর্মকর্তা থাকেন না, তারাই এসব কম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে পদায়ন করে থাকে।
যেসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তারা অনেক সময় বড় প্রশাসনিক নীতি প্রণয়নের অভিজ্ঞতা কম পান। ফলে তাদের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ কমে যায়। এটিও এক ধরনের শিক্ষণ ক্ষতি।
রাজনীতিতে শিক্ষণ প্রক্রিয়া
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও শিক্ষণ প্রক্রিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি দল যখন সরাসরি নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করে, তখন তারা প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নাও পেতে পারে। এর ফলে সরকার পরিচালনায় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। গণতন্ত্রে বিরোধীদলে থাকা একটি বড় শিক্ষণ প্রক্রিয়া। বিরোধীদল সংসদে সরকারের কাজ পর্যবেক্ষণ করে। তারা বাজেট বিশ্লেষণ করে, নীতি নিয়ে বিতর্ক করে এবং বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করে। এ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতারা প্রশাসনের বাস্তবতা বুঝতে শেখেন।
বিশেষজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা
বিশেষজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘১০,০০০ ঘণ্টার নিয়ম’। এ ধারণাটি দিয়েছিলেন মনোবিজ্ঞানী কে আন্ডার্স এরিকসন ও তার সহ-গবেষকদের বই ‘দি রোল অব ডেলিবারেট প্রাকটিস ইন দ্য একুইজিশান অব এক্সপার্ট পারফরম্যান্স’। পরে সাংবাদিক ম্যালকম গ্লাডওয়েল তার বই ‘আইটলায়ার্স : দ্য স্টোরি অব সাকসেস’-এ এই ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো বিষয়ে দক্ষ হতে দীর্ঘসময় অনুশীলন প্রয়োজন। রাজনীতিতেও একই কথা প্রযোজ্য।
একটি রাজনৈতিক দল পাঁচ বছর বিরোধীদলে থাকলে তারা হাজার হাজার ঘণ্টা সরকারি নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারে। অনেক দেশে বিরোধীদল ‘শ্যাডো মন্ত্রণালয়’ গঠন করে যেমনটি বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো ছায়া মন্ত্রিসভা তৈরি করেছে। এতে বিরোধী নেতারা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এর ফলে তারা ক্ষমতায় এলে প্রশাসন পরিচালনা সহজ হয়।
বহুমাত্রিক জ্ঞানী নিধনের ফল
আধুনিক বিশ্বে জ্ঞান উৎপাদনে বিশেষায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকরা এখন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেন। এ পদ্ধতি বিজ্ঞানকে অনেক এগিয়ে নিয়েছে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতীতে অনেক পণ্ডিত ছিলেন যারা একাধিক বিষয়ে দক্ষ ছিলেন। তাদের বলা হয় পলিম্যাথ। তারা বিভিন্ন জ্ঞানের শাখাকে একত্রে ব্যবহার করতেন। ইসলামের স্বর্ণযুগে এমন অনেক পণ্ডিত ছিলেন। যেমন ইবনে সিনা, আল বিরুনী, আল খাওয়ারিজমি, ইবনে রুশদ, আল গাজালি, ওমর খৈয়াম, আল ফারাবি, আল কিন্দি। তারা চিকিৎসা, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বে একসঙ্গে অবদান রেখেছেন। এ ধরনের পণ্ডিতরা বিভিন্ন জ্ঞানের শাখার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতেন। ফলে জটিল সমস্যার সমাধান সহজ হতো।
আজকের বিশ্বে অনেক সমস্যাই অত্যন্ত জটিল। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বা বৈশ্বিক অর্থনীতি। এসব সমস্যার সমাধানে একাধিক জ্ঞানের শাখার প্রয়োজন হয়। কিন্তু পলিম্যাথের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক সময় জ্ঞান বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সংকীর্ণ হয়েছে জ্ঞান সম্মিলন।
প্রশাসনিক পরিবর্তন ও জ্ঞান ক্ষতি
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোয়ও পরিবর্তন আসে। অনেক সময় আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আবার নতুন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ পরিবর্তনের ফলে প্রশাসনে জ্ঞানের ধারাবাহিকতা ভেঙে যেতে পারে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর থেকে সরে গেলে নীতিনির্ধারণে সাময়িক দুর্বলতা তৈরি হয়। অন্যদিকে নতুন কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এ সময়ে প্রশাসনের কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে। এটিও একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষণ ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষণ ক্ষতি
শিক্ষণ ক্ষতির সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যায় বিদ্যালয়ে। যখন স্কুল দীর্ঘসময় বন্ধ থাকে, তখন শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগ কমে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা বৈশ্বিক সংকটের কারণে স্কুল বন্ধ হতে পারে। আবার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোনো মহামারি তথা যুদ্ধ বাধলে অনেক দেশে স্কুল দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। স্কুল বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা হারায়। অনেক বিষয় ভুলে যায়। নতুন বিষয় শেখাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তাদের অনেকের কাছে অনলাইন শিক্ষার সুবিধা থাকে না। এর ফলে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
শিক্ষণ ক্ষতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এটি শুধু বিদ্যালয়ের বিষয় নয়। প্রশাসন, রাজনীতি এবং জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে। প্রশাসনে সমান সুযোগে অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। রাজনীতিতে বিরোধী দলের শিক্ষণ ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জ্ঞানচর্চায় আন্তঃবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ানো দরকার। এতে জ্ঞান ঘাটতি কমবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ জ্ঞানই একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই জ্ঞান অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত।