বর্তমান নেতৃত্ব থেকে মুক্তি চাইলেও আগ্রাসন মানবে না ইরানিরা
১৭ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৬
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
আজকের ইরান ইতিহাসে ‘পারস্য’ সভ্যতা নামে পরিচিত, যার বিকাশধারা সুপ্রাচীন ও মহিমান্বিত। সহস্রাব্দ ধরে এই জনপদ তার প্রজ্ঞা আর সৃজন দিয়ে বিশ্বসংস্কৃতি ঋদ্ধ করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এক কঠোর শৃঙ্খলেরও নাম, যা থেকে মানুষ মুক্তি চায়, কিন্তু বিদেশের কোনো আগ্রাসন তারা মানবে না। বাইরের চাপ যত বাড়ে, তাদের ভেতরের ফাটলগুলো তত বেশি সুসংহত হয়। ইরানের সুসংহত জনগণ, ধর্মীয় নেতৃত্ব, আনুগত্য, লড়াই এবং ইরানের অনন্য সরকার ব্যবস্থা ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিকে এক অদম্য শক্তিতে পরিণত করেছে। ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ হামলার মোকাবিলা ইরান বীরদর্পে করলেও চোরাবালিতে বিশ্ব সামরিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান : প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে ইরান বিশ্বের ১৭তম বৃহত্তম দেশ। তথ্যমতে, ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৩৯ বছরের নিচে। দেশটির জনগণের গড় বয়স প্রায় ৩৩ থেকে ৩৪ বছর। অধিকাংশ ইরানিই ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণ করেছে, যেটি দেশটির শক্তির অন্যতম আধার। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। সৌদি আরবের পরই এর অবস্থান, যার আয়তন প্রায় ১৬.৫ লাখ বর্গকিলোমিটার। ইরানের বিস্তৃত অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক শুষ্ক ও আধাশুষ্ক অঞ্চল নিয়ে গঠিত, প্রধানত মরুভূমির ভূদৃশ্য। যদিও দেশটিতে পর্বতশ্রেণি, উর্বর উপত্যকা এবং উপকূলীয় অঞ্চল রয়েছে, তবে এর বিস্তৃত মরুভূমি অঞ্চলগুলো ইরানের জলবায়ু এবং পরিবেশগত অবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। ইরানের সাতটি দেশের সঙ্গে স্থলসীমা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত ইরাকের সঙ্গে। এরপর রয়েছে তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আজারবাইজান, তুরস্ক এবং আর্মেনিয়ার সঙ্গে। উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর থেকে দক্ষিণে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের ভূ-প্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর ইতিহাসও সমৃদ্ধ।
অর্থনীতি ও শিক্ষা : ইরান বিশ্বে ৩৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার ৮৯ শতাংশ, আর তরুণদের প্রায় ৯৯ শতাংশ। ইরান আজ মেডিকেল এবং পারমাণবিক গবেষণায় ও শিক্ষায় অনেক এগিয়েছে। দেশটি তথ্যপ্রযুক্তি, রোবটিক্স, ও মহাকাশ গবেষণায়ও গুরুত্ব দিচ্ছে। ইরান খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ। এটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী এবং তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর সংযোগ; বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি ইরানের Triumph Card।
সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ-শিয়া রাষ্ট্র ইরান
সাফাভিদ আমলের আগে ইরান মূলত সুন্নি শাফেঈ ও হানাফি মাযহাবের অনুসারী ছিল, তবে কিছু অঞ্চলে আগে থেকেই শিয়াদের উপস্থিতি ছিল। ১৫০১ সালে শাহ ইসমাইল সাফাভি নিজেকে ইরানের শাহ হিসেবে ঘোষণা করে শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে সুন্নি স্কলারদের নির্মমভাবে হত্যা এবং নির্বাসিত করে সাধারণ জনগণকে শিয়া মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করেন। অন্যদিকে শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে দিতে সাফাভিদ শাসকরা লেবানন ও ইরাক থেকে শিয়া স্কলারদের ইরানে নিয়ে আসেন। উল্লেখ্য, এসময় প্রতিবেশী সুন্নি অটোমান বা ওসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের আলাদা করতে এবং রাজনৈতিক পরিচয় শক্তিশালী করতে শিয়া মতবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ইসলামী ইনকিলাব : ১৯৭৯ সালে ইরানে এক নতুন ইনকিলাব (Islamic Revolution of Iran) হয়। এই ইসলামী ইনকিলাব বা বিপ্লব বিশ্বকে এক ভিন্ন রাষ্ট্র-বাসনার পথ দেখায়। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো এই ইনকিলাব দেখে অবাক হয়েছিলেন। তিনি একে বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক রুহানিয়াত’। এটি নিছক কোনো ক্ষমতার বদল নয়। এটি ছিল এক সভ্যতার পুনর্জাগরণ। এই ইনকিলাব দেখিয়েছিল, কীভাবে ধর্ম আর রাজনীতি মিলে এক অজেয় প্রতিরোধের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে গণভোটের মাধ্যমে ৯৮% ভোটার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে মত দেয়। এরপর খোমেনিকে ‘সর্বোচ্চ নেতা’ (Supreme Leader) হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সংবিধানে ইসলামী শরিয়াকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
আগ্রাসন বিরোধী ইরানি জনগণ : বোমারু বিমানের গগনবিদারী চিৎকারের আড়ালে তাকাতে হবে সাধারণের মনস্তত্ত্বের দিকে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা ইরানিদের হৃদস্পন্দন মাপছেন এক ভিন্ন তুলাদণ্ডে। সেখানে মানুষ এক আশ্চর্য টানাপড়েনের শিকার। তারা অভ্যন্তরীণ শাসনের কঠোরতা থেকে মুক্তি চাইলেও, তাদের জাতীয়তাবাদে ভিনদেশের কোনো খবরদারির বিরুদ্ধে তারি স্পাত কঠিন। এই স্পাতই ইরানকে এক অলৌকিক স্থিতিস্থাপকতা দিয়েছে। বাইরের চাপ বৃদ্ধির সাথে ভেতরের অনৈক্যগুলো ঐক্যের আরো কঠিন স্পাতে পরিণত হয়।
ইরানের সরকারব্যবস্থা : ইরান একটি অনন্য ইসলামী প্রজাতন্ত্র, যার সরকারব্যবস্থা ধর্মীয় নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের সংমিশ্রণে গঠিত। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটি ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader)-এর হাতে। সুপ্রিম লিডার সর্বোচ্চ প্রভাবশালী, তিনি সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। এর পাশাপাশি ইরানে একটি নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা রয়েছে, যার অধীনে প্রতি চার বছর পরপর চৎবংরফবহঃ নির্বাচিত হন।
প্রেসিডেন্ট দেশের প্রশাসনিক প্রধান হলেও নীতিগত ও সামরিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতাই নিয়ে থাকেন। এছাড়া রয়েছে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ (Majlish), যার সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। বিচার বিভাগ ও সংবিধান রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে গার্ডিয়ান কাউন্সিল, যারা প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে আইন নিরীক্ষণ করেন। এই সরকারব্যবস্থা ইসলামী শরিয়া, শিয়া মতবাদ, ও আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত হয়, যা বিশ্বে বিরল। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনি নিহত হলেও দেশটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনন্য ঐক্যের কারণে কোনো ভাঙন দেখা যায়নি। এরই মধ্যে খোমেনির ছেলে মোজতবা খোমেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশটি।
হরমুজ প্রণালী : একদিকে পারস্য উপসাগর, অন্য দিকে ওমান উপসাগর। দুইয়ের মাঝে ২১ মাইলের সঙ্কীর্ণ জলপথের নাম হরমুজ প্রণালী- মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক প্রণালী। হরমুজ প্রণালী সর্বসাকুল্যে প্রায় ১০০ মাইল লম্বা। সাধারণ ভাবে এটি ইরানের জলসীমার মধ্যে পড়লেও বাণিজ্যিক গুরুত্বের বিচারে একে আন্তর্জাতিক পানিপথ হিসাবে ধরা হয়। হরমুজের অবস্থান তার ওপর ইরানের অলিখিত একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করেছে। শুধু এই প্রণালীই নয়, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগরসহ সমগ্র এলাকার উত্তরাংশজুড়ে রয়েছে ইরানের সীমানা। একই অংশের দক্ষিণ উপকূল সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, কুয়েতের সীমানায় ভাগ করা। এই দেশগুলো থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালী। সারা বিশ্বের জ্বালানির এই প্রাণকেন্দ্রে ইরান ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ঘোষণা করেছে। আমেরিকা-ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে হরমুজ। হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয় মার্কিন-ইসরাইলের সাথে সম্পর্কে রয়েছে এমন দেশের কোন জাহাজ হরমুজ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেই হামলা করা হবে।
সর্বশেষ খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বের সকল দেশের ওপর থেকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের বাধা তুলে নেয়া হয়েছে। তবে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
সেনাবাহিনী : আইআইএসএসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ২৩ হাজার। এর মধ্যে নিয়মিত বাহিনীর সদস্য আছে সাড়ে তিন লাখ। যেটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে শত্রু মোকাবিলায় প্রাণবন্ত করে রাখে।
IRGC – Islamic Revolutionary Guard Corps: IRGC – Islamic Revolutionary Guard Corps দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের (Islamic Revolution 1979) পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির (Ayatollah Ruhollah Khomeini) দিকনির্দেশনায় এটি গঠন করা হয়। প্রথম লক্ষ্য ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত হুমকি থেকে রক্ষা করা এবং বিপ্লবের মূল আদর্শকে নিশ্চিত করা। আইআরজিসি শুরু থেকেই ইরানের সাধারণ সেনাবাহিনীর (Iranian Army/Artesh) বাইরে থেকে পরিচালিত হয় এবং সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার (Supreme Leader) অধীনে থাকে।
কুদস ফোর্স : ইরানের হাতে আছে কুদস ফোর্স। অপ্রচলিত যুদ্ধ, ছায়াযুদ্ধ ও বিদেশের মাটিতে গোপন অভিযান চালানোর জন্য এই বাহিনী বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। আনুমানিক হিসাবে এই বাহিনীর সদস্য পাঁচ হাজার। ধারণা করা হয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ছড়িয়ে আছে কুদস ফোর্সের সদস্যরা।
পারমাণবিক অস্ত্র : পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে ইরান নিজে কখনো ঘোষণা দেয়নি, পশ্চিমা কোন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নিশ্চয়তা দেয়নি। তবে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ও এ-সংক্রান্ত প্রযুক্তিজ্ঞান রয়েছে।
২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হোসেন বারাক ওবামা বলেছিলেন, ইরানের কাছে যেসব উপকরণ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি আছে, সেগুলোর সহায়তায় দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব। ওই বছরই ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। তা থেকে ট্রাম্পের দেশ বের হয়ে যাওয়ায় এবং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পারমাণবিক চুক্তির বাধ্যবাধকতায় আর নেই খমিনির দেশ। ফলে ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি ফের শুরু করে, বা ইতোমধ্যেই তৈরি করে থাকে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে যেহেতু বিশ্ব সামরিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সাথে একাই বীরদর্পে লড়াই করছে ইরান। ইরান ইতিমধ্যেই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করছে।
ড্রোন : বেশ কয়েক বছর ধরেই যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করছে ইরান। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব ড্রোন ২০১৬ সালে ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে ইরান। নিজেরা ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রদের কাছেও এই প্রযুক্তি সরবরাহ করছে ইরান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনগুলোর মতো ততটা উন্নত নয় ইরানের ড্রোন তবে সস্তা ফলে তারা বিপুল অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। এগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট ছোড়া সম্ভব না হলেও বিকল্প হিসেবে ‘সুইসাইড ড্রোন’ তৈরি করছে ইরান। এসব ড্রোনের নাম ‘রাদ ৮৫’। এসব ড্রোনে বিস্ফোরক যুক্ত করে সেগুলো দিয়ে চালানো যায় আত্মঘাতী হামলা।
সশস্ত্র নৌযান : যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে যেমন বিমানবাহী বা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মতো রণতরী আছে তার জবাব হিসেবে ইরান বানিয়েছে ছোট আকারের হাজার হাজার সশস্ত্র নৌযান। এসব নৌযান থেকে ছোট ছোট ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়। ২০১৫ সালে এক সামরিক মহড়ায় এ কৌশল দেখিয়েছিল ইরান। তাতে দেখা যায়, এসব ছোট নৌযান দিয়েও অত্যন্ত কার্যকর উপায়ে বড় আকারের যুদ্ধজাহাজকে পরাস্ত করতে পারে ইরান।
সামুদ্রিক মাইন : বিপুলসংখ্যক সামুদ্রিক মাইন আছে ইরানের। ১৯৮৬ সালে এমনই এক মাইনের আঘাতে মার্কিন এক যুদ্ধজাহাজ প্রায় ডুবতে বসেছিল। তবে সমালোচকেরা বলছেন, ইরানের এসব মাইনের অধিকাংশই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। যদিও ২০১৫ সালের সামরিক মহড়ার সময় ইরানের নৌবাহিনীর তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা রিয়াল অ্যাডমিরাল আলী ফাদাভি বলেছিলেন, তাঁর দেশ মাইন প্রযুক্তি এতটাই হালনাগাদ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র তা কল্পনাও করতে পারবে না।
আকাশ প্রতিরক্ষা : কার্যকর বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানের না থাকলেও বেশ কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড ইউনিটের জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স সেন্টারের সাবেক পরিচালক কার্ল শুস্টার বলছেন, যুদ্ধে হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমেই ইরানের এসব প্রতিরক্ষা স্থাপনা ধ্বংস করার চেষ্টা চালাবে। তবে সেই কাজটি সহজসাধ্য নয়। ইরান নিজেই এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে এবং এর সঙ্গে সমন্বিত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মিশেল ঘটিয়েছে। ইরানের তৈরি এমনই একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নাম ‘সেভম-ই-খোরদাদ’।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) বলছে, আকাশে সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড়া যুদ্ধবিমানেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম ইরান। অন্যদিকে ২০১৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে ইরান পেয়েছে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ‘এসএ-২০সি’। মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মতে, আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ইরানের হাতে থাকা সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র এটি।
ইরানের মিত্র দেশসমূহ : ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক মিত্র দেশসমূহ মূলত তাদের ভৌগোলিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হলো রাশিয়া- যার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি, অস্ত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গভীর সহযোগিতা রয়েছে। চীন ও ইরানের বড় মিত্র; বিশেষ করে বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, ইরাক, লেবাননের হিজবুল্লাহ, এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের কৌশলগত অংশীদার বা মিত্র হিসেবে বিবেচিত। ইসলামী ভাবধারার আদান-প্রদান ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে ইরান এসব গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার রেখেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে, ইরান এই মিত্রদের সাথে বিকল্প কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার অবস্থান আরো দৃঢ় করেছে।
ইরানের শত্রু দেশসমূহ : আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানের কিছু স্পষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক উত্তেজনা, ধর্মীয় মতপার্থক্য ও আঞ্চলিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শত্রু রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, যার সঙ্গে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই সম্পর্ক তীব্রভাবে খারাপ। ইসরাইলও ইরানের অন্যতম বড় শত্রু; বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে। এছাড়া সৌদি আরবÑ যার সঙ্গে ইরানের ধর্মীয় (শিয়া-সুন্নি মতভেদ) ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, তাও দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার রূপ ধারণ করেছে। এই তিনটি রাষ্ট্র ছাড়াও পশ্চিমা জোটভুক্ত কিছু ইউরোপীয় দেশ ও আরব উপসাগরীয় কয়েকটি রাষ্ট্র ইরানের নীতির সমালোচক ও বিরোধী হিসেবে পরিচিত। ইরান এসব শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা, প্রোপাগান্ডা ও আঞ্চলিক মিত্রতার মাধ্যমে পাল্টা অবস্থান তৈরি করলেও স্যাংশনসহ শত্রুদের কর্মকাণ্ড ইরানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোণঠাসা করছে।
যুদ্ধ সমাপ্তির ইঙ্গিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের-তিন দফা শর্তে ইরান : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধ খুব শিগগির শেষ হতে পারে। তাঁর দাবি, সংঘর্ষে মার্কিন সাফল্য পরিকল্পনার তুলনায় বেশি। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার একাধিক সামরিক ও অসামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরানের দাবি, এই সংঘর্ষ শুরু করেছে আমেরিকা ও ইসরাইল। তাই যুদ্ধ থামাতে হলে তাদেরই কয়েকটি শর্ত মানতে হবে। ইরান জানিয়েছে, প্রথমত তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে আর কখনো ইরানের ওপর আক্রমণ করা হবে নাÑ এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে আমেরিকা ও ইসরাইলকে।
ইতিহাসসমৃদ্ধ পারস্য সভ্যতা তথা ইরান যুদ্ধবিরতির চেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধেই সুবিধাজনক অবস্থানে যেমনটি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি ঘোষণা করেন, ‘ইরান, আমেরিকার মতো নয়, দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে’, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আলোচনার সম্ভাবনা করে দিয়ে বলেছিলেন তিনি। দেশটির কর্মকর্তারা আরও বলেছেন যে, ‘আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, যা ইঙ্গিত করে যে সংঘাত কয়েক মাস বা তার চেয়েও দীর্ঘকাল চলতে পারে। ইরান সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ গত ৮ মার্চ বলেন, ‘আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। আমাদের আক্রমণকারীকে শাস্তি দিতেই হবে’। আমেরিকা গন্তব্য ভুলে ইসরাইলের লক্ষ্য পূরণে এসে রাজনীতির অন্ধকার গোলকধাঁধা থেকে বের হতে চাইলেও চোরাবালিতে বন্দী। ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত দাসত্ব আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতিকে এক অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজকের ইসরাইল নামক ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি না থাকলে হয়তো তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বসন্তের ছোঁয়া থাকত। আমেরিকা আরো বুঝতে ভুল করেছে যে বর্তমান নেতৃত্ব থেকে মুক্তি চাইলেও ইরানিরা ভিনদেশি আগ্রাসন মানে না।
তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা, ডেইলি ডন, সিএনএন, নিউজউইক, নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, সৌদি গেজেট, US Central Command, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।