রক্তক্ষয়ী ৩৬ জুলাই বিপ্লবের ফসল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:৩০
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনের গুম, খুন, হত্যা, জেল-জুলুমের কথা দেশবাসীর অজানা নয়। মহান আল্লাহর ধৈর্যের সীমার শেষ নেই। তারপরও শেখ হাসিনার জুলুমতন্ত্রের ফলে মানুষের উপকারে মহান আল্লাহ হাসিনাকে দেশছাড়া করেছেন। তখনকার ছাত্র-জনতার আবেগ-উচ্ছ্বাস, ত্যাগ-কুরবানির ফলে আজকের বাংলাদেশ।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশে আসতে পেরেছেন। মায়ের জানাযায় অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন। রাজকীয় সংবর্ধনায় তিনি দেশে এলেন। যদিও তাকে নির্বাসনে পাঠানোর দিন শেখ হাসিনার দোসরদের অত্যাচারে তারেক জিয়া হেঁটে এয়ারপোর্টে যেতে পারেননি। তাই তো শেখ হাসিনার বিচার চেয়ে বলেছেন, তিনি ঐ অত্যাচারের কথা ভুলেননি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অধীনে জনগণের অংশগ্রহণে ১২ ফেব্রুয়ারি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হলো। এখন একে একে বের হয়ে আসছে নেপথ্যের ইঞ্জিনিয়ারদের কার্যকলাপ। বাইরের পরিবেশ ভালো থাকলেও ভোটকেন্দ্রের ভেতরে পূর্বপরিকল্পিত ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিএনপিকে জয়যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে ড. ইউনূসের সরকার। লন্ডন বৈঠকের ওয়াদা ড. ইউনূস বাস্তবায়ন করেছেন, সহযোগিতা করেছেন ড. খলিলুর রহমান। আবার জামায়াত জোটের নেতা বর্তমান বিরোধীদলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে আতঙ্কে রেখে বিরোধীদলে থাকার পরামর্শ দিয়ে দেশে অরাজকতা এড়ানোর ব্যবস্থা করে। ভোট চুরি-ডাকাতি এবং গণরায় ভুল তথ্যারোপ করে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের হারিয়ে দেয়া হয়। রাতেই এ কাজ করা হয়। মিডিয়াকে তারা কাজে লাগিয়েছে। আর কয়েকদিন পূর্বে ড. ইউনূস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের প্রকাশ্যে তার স্বীকারোক্তিতে প্রমাণ হয়েছে, পরিকল্পিতভাবেই জামায়াত জোটকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে দেশের জনগণের ভোটের মূল্যায়ন না করে। জনগণ দীর্ঘদিন সরাসরি ভোট না দেয়ার কালচার থেকে এবারে দূরদূরান্ত থেকে ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের পছন্দমতো সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত প্রার্থী জামায়াত জোটকে ভোট দিয়েছে। আমি নিজে পাবনা-১ আসনে ভোটের সময় গ্রামে গিয়ে এর প্রমাণ পেয়েছি। এক ভদ্রলোক কক্সবাজার থেকে এসেছে পাবনায় ভোট দিতে। আপনারা আরো দেখেছেন, ভোটের আগে বাস, লঞ্চ, রেলে উপচেপড়া ভিড়ে দাঁড়িপাল্লার স্লোগান দিয়ে জনতা ভোট দিতে গ্রামে গিয়েছে।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান স্পষ্টতই বলেছেন, নারীবিমুখ গোষ্ঠীকে তারা মেইনস্ট্রিমে আসতে দেয়নি। আবার বলেছেন, তারা বিরোধীদলে থাকলে যেন ক্ষমতার মূলে আসতে না পারে, সেই ব্যবস্থা তারা করেছে। অর্থাৎ বিরোধীদলকে মাত্র ৭৭ সিটে এবং সরকারি দলের ২০৯ সিটে এনে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয় দেখানো হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না, মহান আল্লাহর ফয়সালাই চূড়ান্ত ফয়সালা।
নতুন রাজনৈতিক সরকারের বয়স এক মাস হয়নি। বড় আকারের মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা। সরকারের হাতে টাকা নেই। আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধে বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তার মধ্যেও আমাদের চলতে হবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, ইতোমধ্যেই হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন দেশের সব দল মিলে জুলাই বিপ্লবকে কার্যকর করার জন্য জুলাই সনদ তৈরি করে সই-স্বাক্ষর করে প্রকাশ্যে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠান করা হলো। শুধু তাই নয়, এ সনদের কার্যকারিতার জন্য গণভোট করা হলো জাতীয় নির্বাচনের দিনেই। মানুষ এ গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশ দিয়েছে হ্যাঁ ভোট। গণভোটের ওপর কোনো আইন বা সংসদের পাসের দরকার হয় না। গণভোট শহীদ জিয়ার আমলেও হয়েছে।
এখন নতুন সরকারের কিছু লোক দেশটাকে আবার আগের স্বৈরাচার আমলের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করছে। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে আইনের জটিলতায় জুলাই সনদ এবং গণভোট কার্যকর হবে কিনা, তা জানার জন্য হাইকোর্টে রিট করেছে। কোর্ট আবার রুলও জারি করেছেন। বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত দেশের মানুষের চিন্তায় চলতে দিতে চায় না পাশের দেশের লোকেরা। কারণ বাংলাদেশ যদি উন্নতি-অগ্রগতিতে এগিয়ে যায়, তাতে ভারতের পূর্বাংশের ৭ রাজ্যে তাদের পরিচালনায় অসুবিধা হবে। ভারত কোনোদিনই পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ভালো চায় না। শুধু তাই নয়, পাশের কোনো দেশের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই। মালদ্বীপ থেকে ভারত সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে। নেপালেও নতুন সরকার আসছে। আমরা কারো প্রতি সংঘাত নয়, সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই-
দেশ চালাতে গিয়ে নতুন সরকার মন্ত্রিসভা নিয়ে কেমন করবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে এখনই কিছু মন্ত্রীর কথায় চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা আবিষ্কার হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে চাঁদা নিলে নাকি তা চাঁদা হবে না। বিনা পুঁজিতে যদি প্রতিদিন দেশে শতকোটি টাকা ফাও কামাই হয় বা সাধারণ জনগণের ঘাড়ে পড়ে, তা কোনোভাবেই নির্বাচিত সরকারের জন্য কল্যাণকর নয়। প্রধানমন্ত্রী তার বাপের কৃচ্ছ্রতার কথা মনে করে জনগণের ওপর এ চাঁদাবাজির বাড়তি খরচ বন্ধ করার আবেদন করছি। মন্ত্রী-এমপিরা যেমন ট্যাক্স ছাড়া গাড়ি পাবে না, প্লট পাবে না, আবার যার এলাকায় তারা যাতে চাঁদাবাজি করে হাট-বাজারে জিনিসপত্রের দাম না বাড়াতে পারে, তারও নির্দেশনা দিতে হবে।
জামায়াতের এমপিরা তাদের এলাকায় গ্রাম-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় গিয়ে জনগণের ভালোমন্দের খবর নিচ্ছেন। হাট-বাজারে যাতে চাঁদাবাজি না হয়, তারও খোঁজখবর নিচ্ছেন। এটা ভালো উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসেবা ঠিকভাবে চলছে কিনা, তারও খবর নিচ্ছেন। এলাকার নির্মাণকাজ সঠিকভাবে চলছে কিনা, তারও দেখাশুনা করছেন। অফিস-আদালতে মানুষের সেবা পাওয়া নিশ্চিত করার কাজও তারা করছেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, সহযোগিতা করছেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে শুধু সালাম বিনিময় নয়, সাথে তাদের চলার পথে ভালো উদ্যোগ নেয়াও এমপিদের কাজ। স্থানীয় সরকারের কাজও তারা দেখভাল করছেন। আমরা এমপিদের কাছে অর্থ চাই না। চাই ভালোবাসা এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা যাতে ভালো চলে, তার ব্যবস্থা করা। নতুন সরকার পূর্বের হাসিনা সরকারের পায়ে সালাম করা প্রেসিডেন্টকে কেন যেন ভুলতে পারছে না। প্রেসিডেন্ট নিজেও অস্বস্তিতে বঙ্গভবনে দিনাতিপাত করছেন। বিরোধীদল; এমনকি সরকারি দলের অনেকেই আর চুপ্পুকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চায় না।
বিপ্লবের মাধ্যমে কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন হলে বা দেশ থেকে পালিয়ে গেলে, তার কোনো পদেই আর আগের স্বৈরাচার সরকারের দোসরদের থাকার কথা নয়। দেশের সব বিভাগে নতুন লোক নিয়োগই প্রত্যাশা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হুকুমের দাস হিসেবে তার কাজ করে যাচ্ছেন, যা তার জন্য বেমানান। সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণের মাধ্যমেই সংসদ শুরু হয়। এবারের সংসদ অধিবেশনে যদি বিরোধীদল প্রেসিডেন্টের ভাষণ বর্জন করে, তবে শুরুটাই নেগেটিভ দিয়ে শুরু হবে; যা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।
নতুন সরকারের অবশ্যই জুলাই সনদের আলোকেই সব সমাধান করার উদ্যোগ নেয়া উচিত। জামায়াত জোট ইতোমধ্যেই সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে দলবল নিয়ে উপস্থিত হয়ে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমাদের এই দেশ আসলে সরকারি দল ও বিরোধীদল সঠিকভাবে মর্যাদায় কাজ করতে পারেনি। সরকারের খয়ের খাঁ হিসেবে কাজ করেছে, যা জনগণের ভোটের মর্যাদা রক্ষা হয় না।
এবারের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তারা সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করবে। দেশের ক্ষতিকারক কোনো কাজে তারা বিরোধিতা করবে সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে। দেশের জনগণ চায় সংসদ সদস্যরা তাদের কথা, তাদের এলাকার কথা সংসদে তুলে ধরুক এবং সব সমস্যার সমাধান যাতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করা হয়, তার উদ্যোগ নেয়া। সরকারপ্রধান তারেক জিয়া তার বাবা ও মায়ের দেখানো পথেই চলবেন বলে আমরা আশা করি। তাকে পাশের লোকেরা বিপথে চালাতে চাইবে। এ ব্যাপারে সজাগ-সচেতন হয়ে দেশ চালাতে পারলে তারও লাভ, দেশেরও লাভ। আমাদের দেশের অতীতের সরকারগুলো দেশের ভালো চিন্তা না করে তার আত্মীয়-স্বজন ও দলের ভালো চিন্তা করে দেশের প্রচুর ক্ষতি করে গেছে। ফলে সবারই ক্ষতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে দেশের মানুষ তার বাবা ও মাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার প্রমাণ তাদের জানাজায় বিপুলসংখ্যক লোকের উপস্থিতি। আমাদেরও সুযোগ হয়েছিল তাদের জানাজায় উপস্থিত থাকার। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া দেশের জনগণের ভালোবাসা নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে চলে গেছেন।
আমরা যারা সরকারি দলে বা বিরোধীদলে আছি তাদের মনে রাখতে হবে জনগণের ভালোবাসা পেতে তাদের কাছে থাকতে হবে। আমাদের দেশের মানুষ আবেগপ্রবণ। একটু ভালোবাসলেই তারা কাজে আসে। অন্যদিকে মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব কাজ দেখেন ও শোনেন এবং সব কাজের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খ সংরক্ষিত রাখছেন। দুনিয়ায় মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও মহান আল্লাহর চোখ ফাঁকি দেয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। ভালো কাজের জন্য যেমন দুনিয়ায়ই আমরা পুরস্কৃত হব, তেমনি আখিরাতেও পাব সীমাহীন সুখের জান্নাত। অন্যদিকে মন্দের জন্য দুনিয়ায়ও অপমান আর ভোগান্তি আবার পরকালে রয়েছে সীমাহীন অশান্তি আর ভোগান্তি, যার শেষ নেই।
১৮ কোটি মানুষের দেশ আমাদের বাংলাদেশ। মাটি, পানি, পাহাড়-পর্বতঘেরা একটি সুন্দর দেশ। আমরা যারা নেতৃত্ব দিই, তারা যদি সততার সাথে মানুষের ভালো কামাই করার জন্য দেশ পরিচালনা করি, তবে আমাদের নিজেদেরও ভালো হবে; অন্যদিকে জনগণেরও ভালো হবে। দেশের আমলারা দেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাদেরও ভালো হতে হবে। অবৈধ কামাই কিন্তু পরিবারে শান্তি আনে না। বৈধ আয়ে পরিবার চালালে পরিবারের লোকদের অসুখ-বিসুখ কম হবে, ছেলেমেয়েদের মেধা ভালো হবে, সামাজিকভাবেও লোকদের প্রশংসা পাওয়া যাবে। আপনার দুনিয়ার সব কাজে মহান আল্লাহর রহমত পাবেন। আমার জীবনে এ জাতীয় ঘটনা লক্ষ করেছি। আর অবৈধ আয়ের লোকেরা অসুখ-বিসুখে ভোগে। জনগণও তাকে ঘৃণা করে। আল্লাহর রহমতও তাদের আসে না। যেমন আমাদের দুর্নীতির রানির অবস্থা। তার পিয়নের ৪০০ কোটি টাকা থাকার কথা প্রকাশ্যে গর্ব করে বলেছিলেন। তারা আজ কোথায়? তাদের কবরও এ দেশের মাটিতে হবে কিনা, বলা মুশকিল। তাই আসুন, এ রমাদানের দিনে গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করি, নিজের পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য দোয়া করিÑ যেন মহান আল্লাহ আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করেন। মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।