মার্কিন বর্বর হামলায় বিপর্যস্ত মুসলিম বিশ্ব
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:১৩
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভূরাজনৈতিকভাবে অতি সংবেদনশীল এক অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য, যেটি মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঞ্চলটি বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নিরাপত্তানীতি ও জ্বালানি স্বার্থের নামে অঞ্চলটিতে তার সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর অঞ্চলটির ওপর নির্ভরশীল হয়। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঠাণ্ডাযুদ্ধের আগমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহ দেয় অঞ্চলটিতে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করতে। অন্যদিকে ইসলামোফোবিয়া, ইরান-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্ব যেন পরিণত হয়েছে এক বিস্ফোরণ ভূমিতে, যেখানে আগুন জ্বলছে শুধু ভূখণ্ডে নয়Ñ জ্বলছে ইতিহাস, রাজনীতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও।
ইসরাইলি সংকট ও আমেরিকার দ্বিমুখীনীতি : মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বে মার্কিন কৌশলের মূলে রয়েছে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সামরিক, আর্থিক এবং কূটনৈতিক অটল সমর্থন। যদিও এ নীতির জন্য মার্কিনিদের অপরিমেয় নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে, যা ফিলিস্তিনে দখলদারিত্ব এবং বাস্তুচ্যুতির ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। দেশটি গণতন্ত্রের কথা বললেও বহুত্ববাদ দমনকারী শাসনব্যবস্থা এবং মতাদর্শকে শক্তিশালী করে। ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি খুব কমই স্বাধীনতাকে সমর্থন করে, বরং আখ্যান (narratives) এবং সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর বিভক্তির কারণে অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিরসনে মার্কিন হস্তক্ষেপের আমন্ত্রণ জানালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গভীর অস্থিরতা নিয়ে আসে। যাকে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ বলা হলেও চরমপন্থার (radicalization) চক্রগুলোকেই চিরস্থায়ী করে।
‘প্রমিজড ল্যান্ড’ : ইসরাইলের পতাকার প্রতীকেই রয়েছে বিস্তৃত ইসরাইলের ধারণা। তাদের মতে, পতাকার ‘ডেভিডের তারা’ চিহ্নের ওপরে ও নিচে থাকা দুটি সমান্তরাল নীল রেখাকে নীলনদ ও ফোরাত নদীর প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই দুটি নদীর মাঝখানের ভূখণ্ডকেই ধর্মীয় বর্ণনায় কখনো কখনো ইসরাইলের ঐতিহাসিক বা প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
যদিও রাষ্ট্রীয় নীতিতে এমন বিস্তৃত ভূখণ্ড দাবির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই, তবু এই ধারণা ঘিরে বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। কিছু গোষ্ঠী হিব্রু বাইবেলের ইজেকিয়েল ৪৭ অধ্যায়ের ১৩ থেকে ২০ শ্লোক এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ভূখণ্ডকেই তথাকথিত ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ বা প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলে এটি বাস্তবায়নের জন্য মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে সংঘাত।
মুসলিম বিশ্বে মার্কিন হস্তক্ষেপ : মার্কিন হামলায় একের পর এক মুসলিম দেশ তছনছ হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বকে অনুধাবন করতে হবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যা করতে চাচ্ছে, তা সুদূরপ্রসারী মুসলিমবিহীন বিশ্ব তৈরি করার নীলনকশারই অংশ। নাইন-ইলেভেনের পর মুসলমানদের দায়ী করে প্রেসিডেন্ট বুশ ইতিহাসব্যাপী মুসলিম-খ্রিস্টান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ক্রুসেডের উল্লেখ করে বিশ্বকে ইঙ্গিত দেন তারা ক্রুসেডে আছেন। সুতরাং কার্যক্রমে লক্ষণীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম বিশ্বে হামলা বাগদাদ, কাবুল, কায়রো, দামেস্ক, গাজা কিংবা তেহরান খালি করা নয়, আসল উদ্দেশ্য মুসলিম বিশ্বকে খালি করা।
৯/১১ : ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, টুইন টাওয়ার, সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগনে এক বিমান হামলা হয়। সেই হামলার কিছুক্ষণ পরই কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই হামলার জন্য মুসলিমদের দায়ী করা হয়। দায়ী করা হয় সৌদি আরবের নাগরিক ওসামা বিন লাদেন, আফগানিস্তান, আল-কায়েদা এবং মুসলিম বিশ্বকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন বলয়ের পক্ষ থেকে।
আফগানিস্তান : ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন হামলার পর ওয়াশিংটন তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করার সুযোগ পায়। ‘অপারেশন সাইক্লোন’-এর মাধ্যমে, সিআইএ মুজাহিদিনদের অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
আমেরিকা তখন মুজাহিদিনদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যায়িত করে, কিন্তু একই যোদ্ধারা যখন পরিত্যক্ত হয়, তখন তারা তালেবান ও আল-কায়েদায় পরিণত হয়।
৯/১১-এর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকারকে অভিযুক্ত করে এবং অন্যায়ভাবে ওসামা বিন লাদেন কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট তুলে দিতে চাপ সৃষ্টি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ওসামা বিন লাদেন কে তুলে দিতে তালেবান সরকার অস্বীকৃতি জানালেও বিচারের জন্য তৃতীয়পক্ষ কোনো রাষ্ট্রে ওসামা বিন লাদেনকে উপস্থিত করতে রাজি হয়, যেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেয়নি। অবশেষে ৯/১১ এর মাত্র কয়েকদিন পর ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর ভোররাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্বাধীন ন্যাটোকে সঙ্গে নিয়ে হামলা চালিয়ে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে ক্ষমতায় বসায়। ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে আছেÑ এমন অভিযোগে হামলা করে লাখ লাখ নাগরিক হত্যা করে দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলেও তার কোনো বিচার হয়নি।
এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের এ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিল ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে উত্তর আরব সাগরে দাফন করা হয়েছে। তবে লাদেনের মৃতদেহ কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করে দেশটিকে পরবর্তীতে হামলার পাইপলাইনে রাখাও হতে পারে।
তালেবান দেশপ্রেমিক সংগঠন : তালেবান হামলা সহ্য করতে না পেরে ২০২০ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের সাথে সকল প্রকার সেনাসদস্য আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করার এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তালেবানকে দেশপ্রেমিক সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। যে তালেবান ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন, আফগানিস্তান ৬টি রগ স্টেট বা দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের একটি। অবশেষে ৩১ আগস্ট ২০২০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো তালেবানের কাছে চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। যদিও ২০২১ সালের মে মাস নাগাদ আফগানিস্তানে তাদের থাকার কথা ছিল। প্রাসঙ্গিক কারণে উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের পর আমি আমার এমফিল গবেষণার সুপারভাইজার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হুসাইনকে আমার পর্যবেক্ষণ জানিয়েছিলাম যে সাধারণ জনগণের নিকট তালেবান এতটা জনপ্রিয় দল, তাদের দ্রুত সরকারে প্রত্যাবর্তন অবশ্যম্ভাবী এবং মার্কিন মদদপুষ্ট প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সরকারের প্রতি তারা বিতৃষ্ণ। তবে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি ও কিলোমিটার অন্তর আকাশে সিসিটিভিসংবলিত বেলুনের কারণে সরাসরি কিছু বলছে না।
ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হামলা : ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, তারপর ১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকে মার্কিননীতি (ওয়াশিংটন) তার বিরুদ্ধে চলে যায়। পরে ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইঙ্গ-মার্কিন জোট WMD (Weapon of Mass Destruction) রাখার অভিযোগে ইরাকে অন্যায়ভাবে হামলা করে এবং সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। যদিও সেখানে কোন WMD Weapon of Mass Destruction পাওয়া যায়নি। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকি প্রেসিডেন্ট এবং মুসলিম উম্মাহর নেতা সাদ্দাম হোসেনকে মুসলিমদের পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ভোরে এক মিথ্যা, অন্যায় ট্রায়ালের মাধ্যমে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়।
আরব বসন্ত : ২০১১ সালে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্ররোচনায় এবং প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে আরব দেশগুলোর সরকার এবং সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে, যেটি বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমা বিশ্বের গণমাধ্যম আরব বসন্ত হিসেবে পরিচিত করে। আরব বসন্ত নামক ঝড়ের কবলে বেশকিছু মুসলিম শাসনের পতন হয়, তিউনিশিয়া তার প্রথম।
তিউনিশিয়া ও মিশর : আরব বসন্তের নামে তিউনিশিয়ার ‘জাইন-এল আবেদিন বেন আলী’ এর ২৪ বছরের রাজত্বের পতন হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদে শুরু হলেও বসন্তের পলাশ ফুটল আরও কয়েকটি আরব দেশে। জানুয়ারিতে যখন তিউনিশ জনতা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল, সেই সময় মিশরের মানুষও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়াজ তুলল। তারা চিৎকার করে বলল, ‘হোসনি মুবারক, তোমার জন্য বিমান নিয়ে অপেক্ষা করছে বেন আলী।’ সারা দেশ কায়রোয় জড়ো হলো। কায়রোর সব রাস্তা মিশল তাহরীর স্কয়ারে। ২৫ জানুয়ারি যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা চলে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং এদিন হোসনি মুবারক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০১১-এ তিউনিশিয়ায় যা শুরু হয়েছিল, অচিরেই তা আরবভূমিতে ছড়িয়ে পড়ল। তিউনিশিয়া, মিশরের পাশাপাশি লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, সিরিয়া, মরক্কো, জর্ডানেও স্বৈরাচারী ও পারিবারিক একনায়কতন্ত্রী সরকারকে উৎখাত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ রাস্তায় নামে।
এরপর ২০১২ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেন মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, যিনি সেই সময় দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত করার পর একাধিক অভিযোগ তুলে মুরসিকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি কারাবন্দী অবস্থাতেই ২০১৯ সালের ১৭ জুন মারা যান।
মুরসির মৃত্যুর পাঁচ বছর পর অনেকেই তাকে স্মরণ করছেন আরব বসন্তখ্যাত স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সেই গণবিক্ষোভের ‘ট্র্যাজিক হিরো’ বা ‘দুর্ভাগা নায়ক’ হিসেবে। মিশরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে যেভাবে তিনি কারাবন্দী অবস্থায় মারা গেছেন, সেটিকে ‘মিশরের দুর্ভাগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন কাতারে অবস্থিত জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের শিক্ষক ড. আবদুল্লাহ আল আরিয়ান।
লিবিয়া : মুসলিম বিশ্বের এক সাহসী নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির ৪২ বছরের রাজত্বের পতন ঘটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট। মুসলিম উম্মাহর এই নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যেটি বিশ্ববাসী গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছে।
সিরিয়া : ২০১১ সালে ২৬ জানুয়ারি থেকে সিরিয়ায় আরব বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করে। সেই সময় সিরিয়ায় শুরু হওয়া দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ প্রদর্শন একসময় অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের পদত্যাগ, তার সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি এবং সিরিয়া দীর্ঘ ৫ দশকের আরব সোশ্যালিস্ট বাথ পার্টি (আরবি নাম : হিয্ব আল-বা’ত আল-আরাবি আল-ইশতিরাকি- কুত্র সুরিয়া) শাসনের পতন।
তারপর থেকে সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব, ইসরাইল, আইএসআইএল, হিজবুল্লাহ, ন্যাটো এমনকি গণচীনসহ সকল পক্ষের স্বার্থের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন অবস্থার মধ্যে এইচটিএস ইদলিব থেকে একের পর এক শহর দখল করে মাত্র ১২ দিনের মাথায় ডিসেম্বর ৮, ২০২৪ সালে আসাদ পরিবারের ৫৩ বছরের শাসন আহমেদ আল-শারা আল জোলানীর নেতৃত্বে অবসান ঘটায়। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদের শাসনভার গ্রহণের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের শাসন শুরু হয়। ২০০০ সালের ১০ জুন হাফিজ আল আসাদের মৃত্যুর পর থেকে ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ পতনের পূর্ব পর্যন্ত হাফিজ আল আসাদের পুত্র প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ দেশটি শাসন করছিলেন।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিলোপ : অল্প কিছুদিন আগেও বিশ্বে ৭টি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ছিল যেগুলো বিলোপ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে মুসলিমবিদ্বেষী মার্কিন বলয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি মুসলিম দেশ স্থায়ী সদস্য থাকলে হয়ত মুসলিমদের এমন দুর্দশা দেখতে হতো না। মদিনা সনদে যেমন সকল জাতিকে সমান অধিকার দিয়ে এক কল্যাণমূলক মদিনা প্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়েছিল প্রকৃতপক্ষে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য সকল জাতিকে সমান অধিকার নিশ্চিত করে কমপক্ষে মুসলিম কোন একটি রাষ্ট্রকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো পাওয়ারসহ স্থায়ী সদস্যপদ দিয়ে জাতিসংঘকে সর্বজনীন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তা না হলে জাতিপুঞ্জের ন্যায় পরিণতি অপেক্ষা করছে জাতিসংঘের।
ইরান : কোনোরকম আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক বিষয়কে পাত্তা না দিয়েই ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণের মুখে পতিত গাজা খালি করতে বলার পর এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরান খালি করার নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২০ সালে তারা কুদ্স ফোর্স কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করে। এবার তারা হত্যা করেছে ইরানের ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ড কোর প্রধান হোসেইন সালামি, ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল বাঘেরি, ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বিমানবাহিনীর কমান্ডার আমির আলী হাজিজাদেহও। অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মার্কিন স্বার্থে আঘাত ইত্যাদি ইস্যুতে শুরু হওয়া মার্কিন ইসরাইল যৌথ ‘Operation Epic Fury’ এবং ‘Roaring Lion’ হামলায় নিহত হন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনী।
নেতানিয়াহু খোলামেলাই বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনীকে হত্যা করলেই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে, কিন্তু যুদ্ধ থামেনি বরং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাল্টা ‘Operation True Promise’ আঘাতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করলে সেখানেও মুসলিমদের রক্ত ঝরছে। বস্তুত বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মুসলমানদের রক্তের কোনো দাম নেই। পৃথিবীর কোনো প্রান্তে যদি কোনো মুসলিম নেতাকে হত্যা করা হয় বা ফাঁসি দেয়া হয় তার জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হয় না কাউকে।
উল্লেখ্য, ইরানে পারমাণবিক প্রযুক্তির সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়, সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে। শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তেহরানের সঙ্গে এই সহযোগিতা গড়ে ওঠে এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সে সময়ের ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তেহরান ও তেলআবিবের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ ছিল। তুরস্কের পর দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে ইরান ১৯৫০ সালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব এই সমীকরণ আমূল বদলে দেয়। নতুন শাসনব্যবস্থা ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। এখান থেকেই আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিপ্লবের পর শিয়া উত্থানের আশঙ্কা তুলে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুন্নি বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে।
অন্যদিকে যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সাফ জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া ইরানের সুপ্রিম লিডার পদের জন্য যাকেই বেছে নেওয়া হবে, তিনি ‘বেশিদিন টিকবেন না’। গত ৮ মার্চ রোববার ইরানের বিশেষ পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প এ কথা বলেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের ফেলো বারবারা স্লাভিন আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প এর আগে মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছিলেন, তিনি মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মেনে নেবেন না।
জাতিসংঘের ভূমিকা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’-এই বাণী নিয়ে জন্মলাভ করে জাতিসংঘ ‘United Nations Organizations-UNO’। বিগত ৮ দশক ধরে নানাবিধ টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তির পতাকা উড্ডীন করে চলেছে। এই শান্তির বার্তা সীমিত থেকেছে সাধারণ বিশ্বে। অসাধারণ ক্ষমতা দ্বারা যারা তাদের আগ্রাসন চালাচ্ছে তাদের রোধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি জাতিসংঘ। বিশ্বে অসাধারণ পঞ্চশক্তি- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অবশেষে চীন যখন যেমন তখন তেমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দীর্ঘ বছরগুলোয় একেকটি অসাধারণ শক্তি একেক সময় স্বীয় স্বার্থ রক্ষায় ভেটো প্রয়োগ করে আসছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার ১৯৪৮ সালে আরব ভূমি ফিলিস্তিন দখল করে যখন ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম হলো আর আরব রাষ্ট্রগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করল, তখন বিপরীত মেরুতে অবস্থানরত এই পঞ্চশক্তি সম্মিলিতভাবে অবৈধ ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাকে বৈধতা দান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রথম শক্তি, যারা তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। মার্কিনি দ্বৈত দলীয় ব্যবস্থায় ইসরাইলের স্বার্থের ক্ষেত্রে অবস্থানের কোনো হেরফের হয়নি। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে ওপর এত অন্যায় হলেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মুসলিম উম্মাহর কোনো ভেটো ক্ষমতা না থাকায় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।
গবেষক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বদা মাথায় রাখা আবশ্যক মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন নামে রাজনৈতিক বিভক্তি, হানাহানি, হত্যা, রাহাজানি, গৃহযুদ্ধ যা কিছু হয় তার সাথে সংযোগ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেভিড হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিউরির বিষ ইসলামোফোবিয়া, যেটির ছোবল ৯/১১-এর পর থেকে অন্য মাত্রায় দৃশ্যমান। যার ফল সর্বশেষ রূপ ইরানের ওপর মার্কিন ইসরাইলের হামলা। এই আগ্রাসী হামলার নিন্দা করেছে ২১টি মুসলিম রাষ্ট্র, যেটি যথেষ্ট না। এক্ষেত্রে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির জোরদার ভূমিকা নেয়া উচিত। এই যুদ্ধ মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সামরিকভাবে ও সম্পদেও ইরান সমৃদ্ধ। ইরানে ইসলামী সরকারের পতন হলে মুসলিম বিশ্বে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। পাশ্চাত্যকে চ্যালেঞ্জ করার আর কোনো শক্তি থাকবে না। পরবর্তী টার্গেট মুসলিম উম্মাহর একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান, বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা তুরস্ক এবং তালেবান শাসিত আফগানিস্তান। এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য মুসলিম উম্মাহর অনুসরণীয় হলে পবিত্র কুরআনভ এতে বর্ণিত হয়েছে ‘তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সূরা আল-ইমরান: ১৩৯)। অন্যদিকে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা দুশমনের মোকাবিলায় সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও ঘোড়ার ছাউনি তৈরি করো, যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনদের ভয় দেখাবে।’ (সূরা আনফাল: ৬০)।
তথ্যসূত্র : আল-কুরআন, আল-জাজিরা, ডেইলি ডন, রয়টার্স, সৌদি গেজেট, US Central Command (CENTCOM) সিএনএন, এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।