চাঁদাবাজি নাকি সমঝোতায় টাকা দিতে হচ্ছে?
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:০২
স্টাফ রিপোর্টার : একজন ট্রাকচালক ময়মনসিংহ থেকে পঞ্চগড় গিয়েছেন। আবার একই পথে তাকে ফিরতে হবে। যাওয়ার সময় তাকে চার স্থানে চাঁদা দিতে হয়েছে রসিদের মাধ্যমে। পঞ্চগড় পৌঁছে ওই চালক ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে চাঁদা দেওয়ার রসিদগুলো প্রদর্শন করে নিজের বক্তব্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়েছেন। ভাইরাল হওয়ায় ওই ভিডিওতে ভুক্তভোগী চালক চাঁদার রসিদ প্রদর্শন করে কোন কোন স্থানে কত টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে, আগে কত দেওয়া লাগতো, এখন কত টাকা দিতে হচ্ছে, তা তুলে ধরেন। ‘জোর করে নিয়ে চাঁদা আর সমঝোতার মাধ্যমে নিলে তাকে চাঁদা বলা যাবে না’ নৌ, রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এমন মন্তব্যকে উল্লেখ করে ওই চালক বলেন, সমঝোতার মাধ্যমেই এসব স্থানে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি, ফেরার পথে আবার একই রেটে প্রত্যেক স্থানেই চাঁদা পরিশোধ করতে হবে। তার ভাষ্য, দেশটা জগাখিচুড়ি হয়ে গেছে। চাঁদা পরিশোধের রসিদ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিসমিল্লাতে (প্রথম রসিদ) ১৯০ টাকা, দ্বিতীয় একটি রসিদ তুলে ধরে সেই রসিদে ১৮০ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন, এখানে আগে চাঁদা দেওয়া লাগতো ৫০ টাকা। তৃতীয় নম্বরে আরও একটি রসিদ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই রসিদে ৭০০ টাকা নেওয়া হয়েছে, আগে যেখানে নেওয়া হতো ৫০০। তিনি বলেন, এটা হাদিয়া-সমঝোতা, যতক্ষণ সমঝোতা না হচ্ছে ততক্ষণ গাড়ি ছাড়ে না। ৭০০ টাকা না দিলে ৬০ হাজার টাকার গ্লাস ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, ফলে বাধ্য হয়ে এই টাকা দিতে হয়েছে। চতুর্থ নম্বরে আরও একটি রসিদ প্রদর্শন করে তিনি বলেন, এটা বড়, সুপ্রিম লিডার, এটা (রসিদ) ৮০০ টাকা। এটা দেওয়াই লাগবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটা কোনো চাঁন্দা দিচ্ছি না সমঝোতা করছি।
ভাইরাল হওয়ার ওই ভিডিওতে প্রদর্শিত চারটি রসিদে মোট চাঁদার অঙ্ক দাঁড়ায় ১৮৭০ টাকা। একই পরিমাণে আসার সময় চাঁদা দিতে হলে মোট চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৪০ টাকা। ময়মনসিংহ থেকে পঞ্চগড় আসা-যাওয়ায় একটি ট্রাক বা অন্য কোনো পণ্যপরিবহনে যদি এক ট্রিপে ৩ হাজার ৭৪০ টাকা চাঁদা দিতে হয়, তাহলে পণ্যের দাম কী পরিমাণে বাড়ে, আর এর মাশুল গুনতে হয় ভোক্তা সাধারণকে। আর দৈনিক শতসহস্র পরিবহন থেকে কত লাখকোটি চাঁদা তোলা হয়, তার সঠিক হিসাব করলে রাজস্ব আয়ও হার মানবে। চালকদের প্রশ্ন কবে বন্ধ হবে এই সমঝোতার চাঁদা?
গত ৮ মার্চ রোববার ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল বাতেনের উন্নয়নমূলক কাজে বাধা প্রদানসহ তার নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে বাউনিয়া এলাকায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাধার কারণে সেই কর্মসূচি বাতিল করতে হয়। পরে রূপনগরের চলন্তিকা মল্লিকা মসজিদে নামাজ আদায় করে মুসল্লিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। সেখানেও বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। অভিযোগে জানা গেছে, বিএনপির মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক মন্টু মিয়া, সিরু, লিটন, মহাসিন, সোহাগসহ শতাধিক নেতা-কর্মীর নেতৃত্বে এ বাধা দেওয়া হয়। তাদের হামলায় আমাদের পাঁচজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। বিএনপির নেতা-কর্মীরা শুধু হামলাই চালায়নি, তারা আমাদের দুটি মোবাইল ফোন ও একটি ক্যামেরাও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু কেন তারা এমনটি করেছে? জানা গেছে, ওই এলাকায় ময়লার অপসারণের নামে বাসিন্দাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেওয়া হয়, আর ময়লা অপসারণকারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় সামান্য কিছু টাকা। আর বাকি টাকা নিয়ে যান সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। জনগণের যেন বাড়তি টাকা দিতে না হয় এবং শ্রমিকরাও যেন ন্যায্য পারিশ্রমিক পান তার একটা সুরাহ চেয়েছিলেন সংসদ সদস্য, এতেই ঘটে বিপত্তি।
এদিকে গত ৯ মার্চ সোমবার রাজধানীর সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এক মতবিনিময় সভা করেন। সভায় ঘরমুখী মানুষদের আসন্ন ঈদযাত্রা নিরাপদ ও চাঁদামুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন । ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও চাঁদামুক্ত করতে বেশকিছু পদক্ষেপের কথা জানান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম। তিনি আরও বলেন, মালিক সমিতি চাঁদা বন্ধে বদ্ধপরিকর। কোনো পরিবহনে যাতে নির্ধারিত বাড়ার বেশি নিতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা হবে। ফিটনেসবিহীন কোনো বাস সড়কে চলতে দেওয়া হবে না। মহাসড়কগুলোয় নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে চালানো যাবে না। ঢাকার প্রতিটি বাস টার্মিনালে ‘প্যাসেঞ্জার হেল্পডেস্ক’ স্থাপন করা হবে। সেখানে যাত্রীরা তাদের অভিযোগ জানাতে পারবেন।