পুণ্যময় শবেকদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম


১২ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪১

॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
শেষ দশকে উপনীত মাহে রমজান। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের ওপর রমজানের এক মাস রোজা ফরজ করেছেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী (নবী-রাসূল আ.) উম্মতদের ওপরও ফরজ করা হয়েছিলÑ যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। আর এ রমজান মাসেই রয়েছে পবিত্র রজনী শবেকদর বা লাইলাতুল কদর।
‘শবেকদর’ বা ‘লাইলাতুল কদর’র অর্থ হলো ‘অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত’ বা ‘পবিত্র রজনী’। ‘শবেকদর’ শব্দটি ফারসি। শব মানে রাত বা রজনী আর কদর মানে সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি। অর্থাৎ শবেকদর অর্থ হলো- মর্যাদার রাত বা ভাগ্যরজনী। যে রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতই লাইলাতুল কদর।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ (জিবরাইল আ.) অবতরণ করেন; তাঁদের রবের নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে শান্তির বার্তা নিয়ে। এ শান্তির ধারা চলতে থাকে ঊষা (ভোর) পর্যন্ত। (সূরা আল কদর : ১-৫)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে; যা মানুষের হেদায়াতের জন্য পথনির্দেশের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।
লাইলাতুল কদর বা শবেকদরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতদের সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এবং মানবজাতির ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এই কদরের রাতে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। তাই মুসলমানদের কাছে এ রাত অত্যন্ত পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত হিসেবে পরিগণিত। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুসারে, আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই একটি মাত্র রজনীর ইবাদতে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতি বছর মাহে রমজানে এই মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর বা শবেকদর মুসলিমদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে বলে তারা বিশ্বাস করেন। লাইলাতুল কদরের রাত ঠিক কোনটি, তা বোঝা অনেকটাই অসম্ভব। তবে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর একটিকে কদরের রাত বলে মনে করা হয়। পবিত্র রজনী শবেকদরের গুরুত্ব অনেক।
মুসলমানদের কাছে শবেকদর এমন মহিমান্বিত বরকতময় এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এজন্য যে, এ রজনীতে মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ ‘আল-কুরআন’ অবতীর্ণ হয়েছে। কদরের রাত্রের যাবতীয় কাজের ইঙ্গিত দিয়ে এ রজনীর অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হা-মিম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) এক মোবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয়।’ (সূরা আদ-দুখান : ১-৪)। শবেকদরের রাতে ফেরেশতারা ও তাদের নেতা জিবরাইল (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করে ইবাদতরত সব মানুষের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকেন। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, ‘শবেকদরে হযরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট একটি দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকেন, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।’
লাইলাতুল কদরে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত ভাগ্যলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিজিক, সবকিছুর পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাদের লিখে দেওয়া হয়; এমনকি কে হজ করবে, তা-ও লিখে দেওয়া হয়। মুসলমানদের কাছে কদরের রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআনের সূরা কদরে উল্লেখ আছে, হাজার মাস ইবাদতের যে পুণ্য হয়, কদরের এক রাতের ইবাদত তার চেয়ে উত্তম। লাইলাতুল কদরের রাতে সৎ এবং মুমিন মুসলমানদের ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত ও নেয়ামত বর্ষিত হয়। লাইলাতুল কদরে মুসলিমরা আল্লাহর কাছে মাগফিরাত, নাজাত ও ক্ষমা পাওয়ার পরম সুযোগ লাভ করেন। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাঁর পূর্বেকৃত সব গুনাহ-খাতা মাফ করে দেবেন।’ (বুখারি)।
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, লাইলাতুল কদরে যে বা যারা আল্লাহর ইবাদতে মুহ্যমান থাকবে, স্রষ্টা তার ওপর থেকে দোজখের আগুন হারাম করে দেবেন। এ সম্পর্কিত হাদিস হলো, ‘সমস্ত রজনী আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল কদর দ্বারাই সৌন্দর্য ও মোহনীয় করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এ বরকতময় রজনীতে বেশি বেশি তাসবিহ-তাহলিল ও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকো।’ অন্য হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা তোমাদের কবরকে আলোকিত পেতে চাইলে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর রাতে জেগে রাতব্যাপী ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দাও।’ প্রিয়নবী (সা.)-কে তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা শবেকদর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই, তখন কী করব? নবী (সা.) বলেন, তুমি বলবে, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিযী)। লাইলাতুল কদর গোটা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত পুণ্যময় রজনী এবং এ রাত বিশ্ববাসীর জন্য স্রষ্টার অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের অপার সুযোগ এনে দেন। এ রাতে কুরআন শরীফ নাজিল হয়, যার অনুপম শিক্ষাই মুমিনদের সার্বিক কল্যাণ ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তির পথ দেখায়।
পবিত্র এ মাসে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রজনী ‘শবেকদর’ বা লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর নিশ্চিতভাবে পাওয়া- যাতে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাতের ইবাদত হাতছাড়া না হয়। তাই প্রয়োজন কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফারে মশগুল থাকা। যেমন নফল নামাজ- তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলিল মসজিদ, আউওয়াবিন, তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবিহ, তাওবার নামাজ, সালাতুল হাজাত, সালাতুশ শোকর, অন্যান্য নফল নামাজ ইত্যাদি পড়া। নামাজে ক্বিরাত ও রুকু-সিজদা দীর্ঘ করা- যেমন সূরা কদর, সূরা দুখান, সূরা মুযযাম্মিল, সূরা মুদ্দাসসির, সূরা ইয়াসিন, সূরা ত্বা-হা, সূরা আর রহমান এবং ফজিলতপূর্ণ অন্য সূরাগুলো তিলাওয়াত করা। দরূদ শরীফ বেশি বেশি পড়া। তাওবা-ইস্তেগফার অধিক পরিমাণে করা। দোয়া-কালাম, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আসকার ইত্যাদি করা। কবর জিয়ারত করা। নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সব মুমিন-মুসলমানের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা এবং দেশ-জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনায় দোয়া করা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, শরীরের ভেতরে একটি মাংসখণ্ড আছে, সেটি পরিশুদ্ধ হলে গোটা দেহই পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। আর সেটি মন্দ হয়ে গেলে গোটা দেহই মন্দ হয়ে যায়। আর জেনে রাখো, সেটি হলো কলব।’ (বুখারি)। হযরত উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) আমাদের লাইলাতুল কদর সম্পর্কে অবগত করার উদ্দেশ্যে বের হন। পথে দুজন ঝগড়া-ঝাঁটিতে লিপ্ত হন। তখন নবীজি (সা.) বলেন, আমি তোমাদের লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বের হয়েছিলাম, কিন্তু তখন অমুক অমুক বিবাদে লিপ্ত থাকায় তা (লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ) উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। হয়তো এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তোমরা তা অনুসন্ধান করো (রোজার) বেজোড় রাতে।’ (বুখারি)।
পবিত্র শবেকদরে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রজনী পেতে নিরবচ্ছিন্নভাবে রমজান মাসের শেষ ১০ দিন; বিশেষ করে শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতে হবে। কারণ রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিতেই শবেকদর লাভের সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়। তবে আমরা সাধারণত ২৬ রমজান দিবাগত রাত, অর্থাৎ ২৭ রমজানের রজনীকে পবিত্র লাইলাতুল কদর বা শবেকদরের রাত্রি হিসেবে ইবাদত-বন্দেগি পালন করে থাকি। মহান আল্লাহপাক আমাদের এই পবিত্র রমজানের শেষ দশকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বরকতময় রজনী লাইলাতুল কদর তথা শবেকদরের রাত্রি পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : সাংবাদিক।