সেকাল ও একালের ঈদ
৫ মার্চ ২০২৬ ২০:৩৯
মাহবুবুল হক
শুক্রবারে; আসলে শুক্রবার না বলে আমরা যদি জুমাবার বলি, তাহলে ভালো হয়। এখন থেকে শুক্রবার শব্দের বদলে জুমাবার বলবো ও লিখবো, ইনশাআল্লাহ।
পূর্বেই বলেছি, জুমাবারে এ আসরটি বসে মোটামুটিভাবে সকাল ১০টায় এবং শেষ হয় ১২:১৫ মিনিটে। যখন জুমাবারের আজান শুরু হয়। আমরা সবাই জানি, জুমাবারে আজানের পর সব কাজ ছেড়ে দিয়ে মুমিন-মুসলিমদের ঝটপট জুমাবারের সালাত আদায়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। সে অনুযায়ী বেশ কয়েক বছর ধরে একই সময়ে এ আসরটি বসছে।
আসরটি সাজিয়েছেন আরিজ ও আমিরার দাদাভাই। আরিজ ও আমিরার কাজ হলো প্রতি জুমাবার সকাল ১০টার মধ্যে সিটিংরুমে সবার বসার ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে সাদা বোর্ড, মার্কার পেন, ডাস্টার ঠিকঠাক রাখা, কখনো কখনো এসবের প্রয়োজন হয়ে যায়। মাঝখানে কিছুদিন বন্ধ থাকায় ওদের অনভ্যাসে বিদ্যারাস হয়ে গেছে। পুনরায় আসর চালু হওয়ার পর প্রথম দিনে নানারকম অব্যবস্থা ছিল। আজ অবশ্য অনেকটা ঠিকঠাক হয়ে গেছে। খাওয়ার মেনু ঠিকঠাক করতেন তাদের দাদাভাই ও দাদিমণি। দাদিমণিও মাঝে মাঝে এসে সর্দারি করতেন। তার প্রধান কাজ থাকে ঘরটা ঠিকমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হলো কিনা? যেখানে যে জিনিস, সেগুলো ঠিকঠাক ঝাড়মোছ হয়েছে কিনা। বাচ্চারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা গায়ে দিয়ে এসেছে কিনা ইত্যাদি পরখ করা এবং প্রয়োজনে তাদের অভিভাবকদের উপদেশ ও পরামর্শ দেয়া।
দাদিমণি নানারকম উপদেশ দিয়ে থাকেন। দাদাভাই এ নিয়ে আবার নানারকম টিকা-টিপুনি কাটেন। শুরু হয় মৃদু কথা কাটাকাটি। দাদাভাই শেষে অভিমানে ও অনুযোগে ক্লান্ত হয়ে দিশামিশা না পেয়ে দাদিমণির গায়ে হাত দিয়ে বলেন, যাও না ভাই যাও। ওয়েল ইউর ওন মেশিনÑ নিজের চরকায় তেল দাও। কিছুটা রাগ দেখানোর ভান করে দাদিমণি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘যে তেল দেয়, সে সবার চরকায় তেল দেয়।’ আসরের কিশোর বন্ধু-বান্ধবরা দাদাভাই ও দাদিমণির ঝগড়ার ছবি ও ভিডিও করতে থাকে। মাঝে মাঝে এরকম আনন্দের অনুষঙ্গ তৈরি হয়। বাচ্চারা সবাই মহানন্দে উপভোগ করতে থাকে।
আজ সময়মতো এক এক করে সব মেহমান এসে গেছে। সাথে পুরনো দুই বন্ধু এসেছে। ওরা হলো রোজারিও ও সমীর।
দাদাভাই হাঁকডাক দিয়ে সূরা ফাতেহা পড়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। পাঠ শেষ হলেই আরিজকে বলেন, তুমি সূরা ফাতেহার প্রথম আয়াতটির বাংলা শোনাও।
আরিজ : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক।
দাদাভাই : আচ্ছা। এখন বলতো, আরিজ যা বলেছে, সেটা ঠিক হয়েছে কিনা।
সুবোধ : আমার কাছে একটু ভুল মনে হয়েছে।
দাদাভাই : বল, বল, তাড়াতাড়ি বল।
সুবোধ : আরিজ যেখানে কৃতজ্ঞতা বলেছে, সেখানে ধন্যবাদ শব্দটি আমি পড়েছি আর যেখানে বিশ্বজাহান বলেছে, সেখানে আমি পড়েছিলাম বিশ্বজগৎ।
দাদাভাই : হেসে হেসে বললেন, বাংলাভাষা আমাদের সবার ভাষা হলেও ব্যবহারিক জীবনে আমরা যেমন জলকে পানি বলি। সুবোধরা সেখানে জল বলে। এটাতে অসুবিধার কিছু নেই। তোমরা যেটাকে বিশ্বজগৎ বল, আমরা সেটাকে বিশ্বজাহান বলি। সব ভাষার মধ্যে একই শব্দের রকমফের আছে। মূলত ধর্ম ও সংস্কৃতি ভাষাকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন আরিজ বলেছে, কৃতজ্ঞতা আর তুমি বলেছ ধন্যবাদ। একই কথা। কিন্তু আমরা মনে করি মানুষ মানুষকে ধন্যবাদ দিতে পারে। কিন্তু যেখানে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর বিষয়, সেখানে কৃতজ্ঞতা শব্দটা ব্যবহার করাই ভালো। তাই বলে কোনো মহান মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যাবে নাÑ এমন কিছু নয়। এটা মনোভাবের বিষয়। অনুভবের বিষয়। উপলব্ধির বিষয়।
ফটিক : বিশ্বজগতের জায়গায় আমি তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পড়েছি।
দাদাভাই : পড়েছ ঠিক আছে। সেটা নিয়ে আমরা আরেকদিন কথা বলবো। কারণ শব্দটা বড়দের জন্য। তোমাদের জন্য নয়। আজ যারা আলোচনা করলে, তাদের জন্য ধন্যবাদসূচক একটা হাততালি হয়ে যাক।
সবাই খুব জোরে হাততালি দেয়।
আমিরা : সে এতক্ষণ আসরে উপস্থিত ছিল না, ভেতরে গিয়ে নাশতার ব্যবস্থা করছিল। বলে, দাদাভাই তুমি না সব ভুলে যাও। আজতো রমজান ও ঈদের কথা বলার কথা। তা না করে তোমরা হাততালি দিচ্ছো, তাই না। ফেরেশতারা তোমাদের বিরুদ্ধে লিখবে।
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
দাদাভাই : আমিরা একটা ভুল করেছে। রমাদানকে সে রমজান বলেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ভুল সবারই হয়। শুধু বুড়োদের হয় না।
আমিরা : রমাদানের কথা তুমি আগেও কিছু বলেছ। আমি ঈদের কথা শুনতে ইনটারেস্টেড। তুমি খালি একটা বলতে আরেকটা বল।
আরিজ : এই আমিরা বেয়াদবি করছ কেন? এখানে দাদাভাই আমাদের স্যার। স্যারদের সঙ্গে বেয়াদবি করতে হয় না।
সবাই ভাই-বোনের মৃদু কথা কাটাকাটি উপভোগ করে।
দাদাভাই : ঈদ তো শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখে। অর্থাৎ শাওয়াল মাসের চাঁদ। আগেই বলেছিলাম রমাদান মাস শুরু হয় রমাদানের নতুন চাঁদ দেখে। রমাদানের শেষে শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ ওঠে। গত বছর তো আরিজ-আমিরাকে নিয়ে আমরা শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দেখেলিাম। অবশ্য সেই চাঁদটা নতুন চাঁদ ছিল না। ছিল দ্বিতীয় দিনের চাঁদ। বাংলাদেশে প্রথম দিনের চাঁদ খুব কম দেখা যায়। আমাদের ছোটকালে আমরা নতুন মাসের চাঁদ দেখতে পেতাম। তোমরা কারা কারা ঈদের চাঁদ দেখেছ, হাত ওঠাও দেখি।
সবাই বলে আমরা বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ঈদের চাঁদ দেখেছি। কিন্তু তুমি যে বললে, ওটা ২য় দিনের চাঁদÑ এটা শুনে তো আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল।
দাদাভাই : এতে মন খারাপ করার কিছু নেই। মেঘের কারণে, সূর্য ও চন্দ্রের নিজ নিজ অক্ষে ঘোরার কারণে কোনো কোনো দেশে চাঁদের আলো সময়মতো দেখা যায় না। সেসব বিষয় তোমরা আরেকটু বড় হলে অর্থাৎ ক্লাস সিক্সে উঠলে বুঝতে পারবে। শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর আমরা যা করেছি এবং এখন তোমরা যা করো, তা প্রায় একই ধরনের। আমরা মফস্বল শহরে থাকতাম। তোমরা থাক রাজধানীতে। তফাৎ তো থাকবে, পার্থক্য তো থাকবেই। তোমাদের বয়স দশ-এগারো। তোমাদের মতো যখন আমার বয়স ছিল, তখন ছিল ইংরেজি ১৯৫৮-৫৯ সাল। তখনকার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আর এখনকার সবকিছু অবশ্যই একরকম নয়। সে সময় আমাদের পরিবার ও সমাজ ছিল বলতে গেলে গড়ে দরিদ্র সমাজ। তখন মানুষের অত টাকা-পয়সা ছিল না। বাজারে নানা ধরনের জামা-কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল ছিল না। কিন্তু ঈদের আনন্দের বিষয়টা কম ছিল বলে মনে হয় না। বাবা-মা’রা হয়তো ঈদের সময় নতুন কাপড় পরতে পারতেন না, কিন্তু ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির জন্য সাধারণ কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল কিনে সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে চাইতো। তখনকার বাবা-মা’রা ঈদের সময় ছেলেমেয়েদের ২টি ড্রেস বা পোশাক দেয়ার চিন্তা করতো না। একটাই দিতো। সামান্য টাকা-পয়সা থাকলে বা জোগাড় করে হলেও হতদরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে সহযোগিতা ও সহায়তা করতো। বংশের যিনি বড় বা কোনো পরিবারের যিনি অভিভাবক, তিনি সবার সাথে আলোচনা করে খাবার-দাবার, মেহমানদারি, পরিবারের ছোট থেকে বড় সবার কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা ও নায়রীর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ছোট পরিসরে হলেও ব্যবস্থা করতেন। তখন ‘সমাজ-নমাজ’ বলে একটা কথা ছিল। একটা বন্ধন ছিল। সুখে-দুঃখে সবাই একসাথে ছিল। তখন মানুষের আনন্দ ভাগ করে নিতো এবং দুঃখও ভাগ করে নিতো।
এক সমাজ আরেক সমাজের কাছে হাত পাততো না। এতে তারা সামাজিকভাবে অসম্মান হবে বলে মনে করতো। পরবর্তীতে এই নিয়ে গোপনে গোপনে নানারকম কথা উঠতো। বিয়ে-শাদী সাধারণত আশপাশের গ্রামে সম্পন্ন হতো বলে এ বিষয়ে সবাই সজাগ ও সতর্ক থাকতো। তবে খেলাধুলা হতো এক সমাজের সাথে আরেক সমাজের। এক গ্রামের সাথে অন্য গ্রামের। তাই সব বিষয়ে সবাই সতর্ক থাকতো।
নয়ন : এখন তো এসব আমরা দেখি না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের কথাই ভাবি। খুব বেশি হলে আমরা খালাতো ভাই, মামাতো ভাই-বোনদের সাথে টেলিফোনে আলাপ করি। তোরা কয়টা ড্রেস পেলি আর আমরা কয় সেট ড্রেস পেলাম। ব্র্যান্ডের কয়টা আর দেশি কয়টা ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজধানী থেকে আমরা দাদার বাড়ি বা নানার বাড়ি যাই। যেখানে যাই সেখানকার জন্য আব্বা-আম্মা কিছু না কিছু সাথে করে নেন। কিন্তু দাদাভাই আপনি যেভাবে বললেন, সে ধরনের বাধ্যবাধকতা বা টোটাল ব্যবস্থাপনা এখন তো নেই। আপনি আরেকদিন বলেছিলেন, চাঁদ দেখা থেকে শুরু করে অন্তত দিন তিন আপনারা পাড়া বেড়ানো, সবাই মিলে ঈদের মাঠে যাওয়া, ঈদের মাঠে খেলনা বা খাবার কেনা, ঈদের জন্য পাড়া বেড়ানো, রাতে কবিতা, গান, নাটক ইত্যাদিতে ধুমধাম করা। এই দেখ, ভুলে গেলাম বিকালের কথা। বিকালে নাকি তোমরা গোল্লাছুট, হা-ডু-ডু, কানামাছি, হাঁড়িভাঙা, ফুটবল, সাঁতারকাটা, নৌকাবাইচ ইত্যাদি সবকিছু চলতো তিন দিন ধরে। তোমাদের বাবা-চাচারা নাকি হিন্দু বন্ধুদের জামা-কাপড় কিনে দিতো। আবার পূজার সময় তারাও তোমাদের জামা-কাপড় কিনে দিতো, নানারকম শুকনো গ্রামীণ খাবার দিতো। এসব শুনে সত্যি মনে হচ্ছে তখনকার দরিদ্র সমাজই অনেক ভালো ছিল।
রোজারিও : দাদাভাই নয়ন যা বলেছে, সবই ঠিক বলে মনে হচ্ছে। আমার ফাদার-মাদারও অনেকবার আমাদের এ ধরনের কথাই বলেছেন। এমনও শুনেছি, মাদার ও আন্টিরাও মুসলমানদের বাড়িতে বাড়িতে দাওয়াত খেতেন। আবার পূজা ও বড়দিনের সময় মুসলিমরাও আমাদের ইনভাইটেশন গ্রহণ করতেন।
আমিরা এতক্ষণ গালে হাত দিয়ে সব কথা শুনছিল। এখন বলে উঠলো বুঝেছি, বুঝেছি, এখনকার সবকিছু বোগাস। এবার থেকে আমরা ঈদের সময় গ্রামের বাড়িতে চলে যাব।
আজানের মধুর ধ্বনি শোনা যায়। দাদাভাই সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, চল আমরা এখন আরিজ ও আমিরার ডাইনিং টেবিলে যাই। দেখি সেখানে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।