সংস্কারের খণ্ডিত অংশের বাস্তবায়ন দেখতে চাই না : ডা. শফিকুর রহমান
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৫
আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, সেটির পুরোটা মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশের বাস্তবায়ন দেখতে চাই না। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, দেশ সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে। সংসদে একটি সরকারি দল ও আরেকটি বিরোধীদল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় গাড়ি চলে না, অন্তত দুটি চাকা লাগে। সরকারি দল ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করলে তাদের সহযোগিতা থাকবে। তবে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে জামায়াত জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে। তাদের অবস্থানও স্পষ্ট থাকবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় তারা যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো মুখের কথা নয়, অন্তরের কথা। তিনটি শর্ত সবাইকে মানতে হবে। প্রথমত, সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঋণখেলাপিরা কীভাবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। যারা জনগণের টাকা পরিশোধ করতে পারেন না, তারা কীভাবে দেশের নেতৃত্ব দেবেন। সংসদে এমন ব্যক্তিদের যাওয়া উচিত, যারা ব্যক্তিস্বার্থ নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ দেখবেন। কারও প্রতি সামান্য অবিচার হলে তারাও প্রতিবাদ করবেন।
আরেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কে কী নিয়ে আলোচনা করবেন, তা তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে কেউ আলোচনায় এলে দেশ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা হবে। তিনি আরও বলেন, সংসদ কার্যকর রাখতে সরকার ও বিরোধীদলের প্রয়োজন। দেশ সঠিক পথে চললে সহযোগিতা থাকবে, আর ভুল পথে গেলে সরকারকে সমর্থন দেওয়া হবে না।
জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটি এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারায় তারা জনসমর্থন হারিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী সেই ভুল করবে না, মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি অধ্যক্ষ ড. সামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মো. রমজান আলী, সাবেক নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক ভূঞা, কাপাসিয়ার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী এবং ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের মজলিসে শূরা সদস্য এডভোকেট রোকন রেজা শেখ উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের সাথে বালিখলা ফেরিঘাটে কথা শেষে জামায়াতের আমীর কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনার শিমুলবাক গ্রামে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী রিকশাচালক মরহুম শাহ আলম ভূঁইয়ার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, এবার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আমি অনেক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। শ্রমিক, কৃষক সাধারণ মানুষেরা আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমার নিজ নির্বাচনী ঢাকা-১৫ এলাকায় মাঝেমধ্যে যখন যেতাম, ছোট বাচ্চারা দৌড়ে এসেছে। ওরা আমার পিঠে ঝুলেছে, গলায় ঝুলেছে, কাঁধে চড়েছে। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে ওই দৃশ্যগুলো। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে ওরা আমাকে দাদু খেতাবও দিয়েছে।
জামায়াত কর্মী শাহ আলম ভূঁইয়ার স্মৃতিচারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একদিন আমার নির্বাচনীয় আসন ঢাকা-১৫ এর কাফরুল এলাকায় আমি ক্যাম্পেইন করছিলাম, পাশে কয়েকটা রিকশা সারি সারি দাঁড়ানো। মানুষের সাথে হাত মিলাচ্ছি, সালাম দিচ্ছি। হঠাৎ করে রিকশার হাতল ছেড়ে আমার বুকের ভেতরে ঝুঁকে গেলেন এক লোক। আমিও তাকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। তারপর বললাম, আসেন। কয়েকদিন পর শুনলাম তিনি ইটনায় গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করার জন্য। এ সময় হার্ট অ্যাটাকে তিনি মারা যান।
জামায়াতের আমীর বলেন, দুই শ্রেণির মানুষের সাথে মিশে দারুণ আনন্দ পাই। এক ছোট বাচ্চারা। ওরা নিষ্পাপ। ওদের কোনো গুনাহ নেই। ওরা কাছে এলে মনে হয় আমি ফেরেশতাদের সাথে আছি। আরেক দল লোক কঠোর পরিশ্রম করে। দিন আনে দিন খায়। রক্ত পানি করে ঘাম ঝরায় পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেয়ার জন্য। অনেক সময় সাদা ভদ্রলোক নামধারী লোকেরা একটু তাদের এড়িয়ে চলে। তাদের গায়ের গন্ধ লেগে যায় কি না। তাদের গায়ে তো ঘাম লেগে থাকে। আমার কাছে এইটা ঘাম না। শতভাগ হালাল রুজির মানুষের গায়ের ঘাম আমার কাছে আতর।
জামায়াতের আমীর বলেন, আমি আজকে আমার ভাইয়ের পরিবারের কাছে এসেছি। তিনি আমাদের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। অতি সাধারণ মানুষ ছিলেন। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তাকে সম্মান করা, তার পরিবারের খোঁজখবর নেয়া আমার ঈমানের অংশ, আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এলাকাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, বিশাল হাওর আপনাদের সামনে। হাওরপাড়ের মানুষের মন বড় হয়, এটা আমি জানি। প্রকৃতির সাথে আপনারা বেড়ে ওঠেন। এই বড় মনের মানুষগুলোর কাছে ছোট্ট একটা অনুরোধ থাকবে আমার, এই পরিবারটাকে আপনারা দেখে রাখবেন।
উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনায় জামায়াতে ইসলামীর একটি নির্বাচনী জনসভায় যাওয়ার পথে নৌকায় স্ট্রোক করে মারা যান শাহ আলম ভূঁইয়া (৫০)।
জামায়াত আমীর সকাল ১০টায় স্পিডবোটে করে এবং পায়ে হেঁটে শাহ আলম ভূঁইয়ার গ্রামের বাড়ি শিমুলবাক যান। তিনি প্রথম শাহ আলমের কবর জিয়ারত করেন, পরে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন কুশলাদি বিনিময় করেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন।
এ সময় জামায়াত আমীর দলের পক্ষ থেকে শাহ আলমের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। এছাড়া শাহ আলমের অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই মেয়ের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত পড়ালেখা থেকে শুরু করে সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন।
এ সময় তিনি বলেন, আমি যতদিন সংগঠনের দায়িত্বে আছি, ততদিন এই দায়িত্ব পালন করব। ভবিষ্যতে যারা দায়িত্বে আসবেন, তারাও তা পালন করবেন বলে আশা রাখি।
শাহ আলমের কবর জিয়ারত, পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ এবং সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামায়াত কর্মী আব্দুস সালমের পরিবারের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে স্পিডবোটযোগে নদী পথে দুপুর ১২টায় ছাতিরচর গ্রামে যান। সেখানে তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, সান্ত্বনা দেন, আব্দুস সালামের কবর জিয়ারত করেন এবং স্থানীয় মাঠে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তর্ব্য রাখেন। জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি, হিংসা হানাহানিতে জড়িয়ে গেছে, হিংসা দূর হোক, হানাহানি দূর হোক, অশান্তি দূর হোক, আমরা প্রত্যেকেই যেন প্রত্যেককে ভালোবাসতে পারি। আমরা প্রত্যেককে প্রত্যেকেই যেন শ্রদ্ধা করতে পারি। কারণ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, মানুষ তো সৃষ্টির সেরা। এখানে কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান এগুলো আল্লাহ তায়ালা হিসাব নিবেন। এ দেশ আল্লাহর দান, আমরা কেউ দরখাস্ত করে মায়ের পেট থেকে পয়দা হয়নি। আল্লাহ যাকে যেখানে পছন্দ করেছেন, সেখানেই পয়দা করেছেন। আমরা আমাদের দেশ নিয়ে অনেক সন্তুষ্ট। আমাদেরকে আল্লাহ শান্তি দিয়ে ভরপুর করে দিক।
এদিকে তিনি একই দিনে গত রবিবার ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আব্দুস সালামের কবর জিয়ারত ও পরিবারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ এরপর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।