স্বৈরাচারের দোসর জাপা গণধিকৃত-প্রত্যাখ্যাত, ব্যর্থ আওয়ামী ষড়যন্ত্র


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩০

১৯৬ প্রার্থীর কেউ পাস করেননি
চেয়ারম্যান থার্ড, মহাসচিবের জামানত বাজেয়াপ্ত

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ১৯৬ জন বৈধ প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামে স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। প্রায় দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও প্রতিবেশী দেশ ভারতের তাঁবেদারি করা এই দলটিকে ভোটাররা চূড়ান্তভাবে লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছেন। একসময় স্বৈরাচারী স্টাইলে ক্ষমতা দখল করে দীর্ঘসময় দেশ পরিচালনাকারী এই দলটি আওয়ামী লীগ ও ভারতের কাছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েছে। গত তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে না পারায় জাতীয় পার্টিকে তার পাওয়া বুঝিয়ে দিতে পারেনি, বিলম্বে হলেও এবার যখন জনগণ সুযোগ পেয়েছেন, তখনই সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলটির অস্তিত্ব পাতালে নিয়ে ঠেকিয়েছেন। গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর গুলশানে গ্র্যান্ড প্যালেস হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী ১৯৬ জন বৈধ প্রার্থীও তালিকা প্রকাশ করেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সেই তালিকার কেউ পাস করেননি। মহাসচিব জামানত হারিয়েছেন, চেয়ারম্যান তৃতীয় হয়েছেন। নিজেদের দুর্গখ্যাত রংপুরেই ‘গোল্লা’ পেয়েছে দলটির প্রার্থীরা। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরও আওয়ামী লীগ নানা ষড়যন্ত্র করেছিল। সর্বশেষ নির্বাচন বানচালেও ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে নানা প্রচারণা চালায় দলটির নেতাকর্মীরা। কিন্তু এতেও ব্যর্থ হয় তারা। কারণ মানুষ সংস্কারের পক্ষ নিয়ে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনে জনগণ জাতীয় পার্টিকে কবরে পাঠিয়ে দিয়েছে আর ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার আওয়ামী লীগকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হেভিওয়েট অনেকেই রক্ষা করতে পারেননি জামানত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অনেক আলোচিত প্রার্থী এতই কম ভোট পেয়েছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছাকাছিও আসতে পারেননি; এমনকি তাদের জামানত রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ তালিকায় আছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান আইন আরপিও অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আসনের প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। জানা গেছে, গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনে জামানত হারিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি লাঙ্গল প্রতীকে নিয়ে এ নির্বাচনে ভোট পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৭৫টি। এই আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৫২টি। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল ওয়ারেজ ৮৯ হাজার ২৭৪ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ফারুক আলম সরকার পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৪৮৩ ভোট। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মিত্র অনেক বাম রাজনীতিক জামানত হারিয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, গত ৫ বারের এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাফিজউদ্দীন আহম্মেদ, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফি রতনসহ অনেকেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ওই আসনে জামানত হারিয়েছেন তারই বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো দলের বিপুলসংখ্যক প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।
রংপুরেও জাপার জন্য আবেগ নেই
জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের মানুষ। শহরে তার পুরোনো বাড়ি রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি জেল থেকে প্রার্থী হয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জিতেছিলেন। সেই নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ১৭টি আসন জিতে জাপা। ১৯৯১ সালের পর আরও তিনটি নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ভালো ফল করে জাপা। ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসন পেয়েছিল জাপা। এবার বিভাগে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতের আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে মাত্র একটি করে জয়লাভ করেছিল। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি জামায়াত। ১৮ বছর পর এ অঞ্চলে জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। রংপুর-৪ আসনের জয় পাওয়া এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, রংপুরের ৬টি আসনে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগ ও জাপা নাই হয়ে গেছে। মানুষ তাদের প্রত্যাখান করেছেন।
ব্যর্থ আওয়ামী ষড়যন্ত্র
নির্বাচন নিয়ে শুরুতেই আওয়াম লীগ নানা ষড়যন্ত্র করে। নির্বাচন বানচালে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে টানা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। আওয়ামী লীগের দুটি টার্গেট ছিল, একটি নির্বাচন করতে না দেওয়া, অপরটি নির্বাচন ঠেকাতে না পারলেও যাতে গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হয় সেটি নিশ্চত করা। টার্গেটের আলোকে সক্রিয়ও ছিল দলটির নেতাকর্মীরা। তারা সরাসরি কোনো প্রচার-প্রচারণা না চালালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ব্যবহার করে দলটির নেতাকর্মীরা না ভোট দেওয়ার প্রচারণা চালায়। কিন্তু তাতেও তারা সফল হয়নি। ভোট গণনার পর দেখা গেল ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। জনপ্রত্যাখ্যাত আওয়ামী লীগের এ যাত্রার ষড়যন্ত্রও ভেস্তে গেছে।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জাতীয় পার্টি দেশের স্বার্থ রক্ষা না করে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট থাকায় দেশের মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, অতীতের জাতীয় পার্টি যেসব কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, তাতে তারা দেশবাসীর কাছে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। বিশেষ করে তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে দেশের ইতিহাস পাল্টে গেছে। ওই সময় (২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি) জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে তখন নির্বাচনই হতো না, দেশ ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন থেকে মুক্তি পেত। কিন্তু জাতীয় পার্টির ভূমিকার কারণে দেশের স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতে স্বৈরাচারের দোসরের ভূমিকায় থাকায় জনগণ এবারের ভোটে জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারতীয় কূটনীতিক ও দেশটির তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশ সফর করে কূটনৈতিক সীমা লঙ্ঘন করে নির্বাচনে নাক গলিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি জাতীয় পার্টিকে ম্যানেজ করে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি করান। জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যানের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও তার অনুসারীরা ভারতের পরামর্শে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে সম্মত হন। ওই সময় জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না গেলে এককভাবে শেখ হাসিনা নির্বাচনে যেতে পারতেন না, ফলে ভিন্ন ইতিহাস হতে পারতো। জাতীয় পার্টি দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার কথা বিবেচনায় না নিয়ে ভারত ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় শেখ হাসিনার অধীনে শুধু নির্বাচনেই যায়নি, পুরো সময়টা গৃহপালিত বিরোধীদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে এবার জনগণভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ভোটের মাধ্যমে জাতীয় পার্টিকে তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছে। নিজেদের দলকে শক্তিশালী না করে আওয়ামী লীগ তাঁবেদারি করায় জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্বৈরাচারের দোসর ও উচ্ছিষ্টভোগী হওয়ায় মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে দলটিকে উচিত জবাব দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় পার্টির কবর রচিত হয়েছে। এই দলটির আর ভবিষ্যৎ নেই। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লীগের যে অবস্থা হয়েছে ঠিক ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় পার্টিরও একই পরিণতি হয়েছে। এর বেশকিছু কারণও রয়েছে বলে মনে করেন এ বিশ্লেষক। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে শাহরিয়ার কবির বলেন, বিগত তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) নির্বাচনে জাতীয় পার্টি গৃহপালিত বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করেছে। তারা বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ভারতের তাঁবেদারি করেছে।
আর এসব কারণেই জনগণ জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, দেশপ্রেমিক নাগরিকরা ভিন দেশের আনুগত্য পছন্দ করেন না। ফলে জনগণ জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির প্রায় সবাই জামানত হারিয়েছেন। এমনকি দলটির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরও তার আসনে তৃতীয় হয়েছেন, যা দলটির ভবিষ্যৎ কী হবে তার একটি নিদর্শন হয়ে থাকলো।
ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে দলটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বাধার সৃষ্টি করা হয়নি, স্বৈরাচারের দোসর হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও দলটির প্রতি হয়রানি করা হয়নি, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে তারা নির্বাচনী প্রচার চালাতে পেরেছেন। নির্বাচনের সময়ও দলটি নানা ষড়যন্ত্র করেছে নির্বাচন বানচাল করতে। নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে নানা মেকানিজমও করা হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে। তারা এবারও বিরোধীদল হওয়ার জন্য সব ধরণের চেষ্টা-তদবির করেছে, বড় দলের সঙ্গে জোটও করতে চেয়েছে। কিন্তু তাতেও সফল হয়নি। তিনি বলেন, দেশের জাতীয় পার্টির রাজনীতি মানুষ আর কোনো কারণেই গ্রহণ করবেন না।
ফলাফল নিয়ে জাপা মহাসচিবের ব্যাখ্যা
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী দলটির পরবর্তী অবস্থান নিয়ে নিজের চিন্তা-ভাবনার কথা জানান। ভোটের ফলাফলে দলীয় কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে কিনা- জানতে চাইলে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, কিছুটা প্রভাব তো পড়বেই, তবে আমরা তা কাটিয়ে উঠবো। নির্বাচনে ভরাডুবির কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোট সুষ্ঠু দেখানো হলেও গণনায় ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। আমাদের ফল কমিয়ে দেখানো হয়েছে, কোনো কোনো আসনে আমাদের ভোট অন্যদের দেখানো হয়েছে। নির্বাচনে প্রচারণার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা এসেছিল কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু অভিযোগ তো ছিলই, তবে তা ছোট-খাটো। জাতীয় পার্টি এখন কী করবে জানতে চাইলে দলটির এই নেতা বলেন, এখন আমাদের কাজ হবে দলটাকে সুসংগঠিত করা। বিভাগ, জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে সব ইউনিটগুলোকে সচল ও সক্রিয় করা, এটি করতে পারলে আমরা সামনের দিনগুলোয় ভালো ফল লাভ করতে পারবো।