যেভাবে গঠিত হবে উচ্চকক্ষ, কোন দল পাচ্ছে কত আসন?


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫০

স্টাফ রিপোর্টার : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সরকার গঠনের পর এখন আলোচনার শীর্ষে রয়েছে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ। গণভোটের রায় অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। ৬৮ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সিল মেরেছেন। এতে করে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠনসহ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আলোকে উচ্চকক্ষের ১০০ আসন বণ্টন হবে। জনরায়ের পর এটাই বাস্তবতা। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নির্বাচনে নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলেছে। অবশ্য নির্বাচন-পরবর্তী এ বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে এখনো কোনো কথা বলা হয়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এবং জুলাই সনদ প্রণয়ন কমিটি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ার পর রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ীই উচ্চকক্ষ আসন বণ্টন করতে হবে।
কী যোগ্যতা লাগবে উচ্চকক্ষের সদস্য হতে
জুলাই সনদে উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার জন্য আলাদাভাবে কোনো যোগ্যতার কথা বলা হয়নি। জুলাই সনদের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানে নিম্নকক্ষের সদস্যদের যে যোগ্যতা-অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষেও সেটি কার্যকর হবে। কেউ বাংলাদেশের নাগরিক, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি না হওয়া এবং ফৌজদারি অপরাধে ২ বছরের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত না হলে তিনি উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারেন। সহজে বললে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন। এক্ষেত্রে এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বিষয়টি যেহেতু নতুন, আগামীতে এ ব্যাপারে আইন ও বিধি প্রণয়ন করবে সরকার।
কখন গঠন হবে উচ্চকক্ষ
জুলাই আদেশ অনুসারে নতুন এমপিরা শপথগ্রহণের পর থেকে প্রথম ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। এ সময়ে তারা জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাব সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। এর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। আবার যেদিন নিম্নকক্ষের মেয়াদ শেষ হবে, একই দিনে উচ্চকক্ষের মেয়াদও শেষ হবে। এ হিসাবে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। ফলে আগামী ৮ মাসের আগে উচ্চকক্ষ গঠনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
কাজ ও ক্ষমতা
গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংশোধন করতে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমতি লাগবে। আবার রাষ্ট্রপতির অভিসংশনে উচ্চকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন জরুরি। তারা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে। কিন্তু সরকারের ওপর অনাস্থা আনতে পারবে না। তবে এর বাইরে কোনো বিলে ভোট দিতে পারবে না।
ভোটের শতাংশ ও উচ্চকক্ষের সম্ভাব্য আসন
নির্বাচন-পরবর্তী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বড় পাঁচটি দল সম্মিলিতভাবে ৮৯.৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, অন্তত ১ শতাংশ ভোট পাওয়া দলগুলোই উচ্চকক্ষে আসন পাবে। সেই হিসেবে আসন বণ্টন এমন হতে পারে, বিএনপি এককভাবে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পাওয়ায় উচ্চকক্ষে দলটির আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৬টি। জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে উচ্চকক্ষে ৩৬টি আসন পেতে যাচ্ছে। এনসিপি ৩.০৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তারা পাবে ৩টি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে উচ্চকক্ষে ৩টি আসন পাবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.০৯ শতাংশ ভোট পাওয়ায় দলটির জন্য বরাদ্দ হবে ২টি আসন। উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে প্রধান দুই দলের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। বিএনপি চায় সংসদীয় আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করতে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিএনপির প্রস্তাব মানলে প্রতি ৩টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১টি উচ্চকক্ষ আসন বণ্টন হবে। এতে ক্ষুদ্র দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জুলাই সনদে যেহেতু ভোটের অনুপাতের কথা বলা হয়েছে এবং গণভোটে মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলেছে, তাই ভোটের অনুপাতই আসন বণ্টন হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হলে চিত্র পালটে যাবে। কারণ এবারের নির্বাচনে তিনশ’ আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়েছে। সে হিসাবে দলটি উচ্চকক্ষে ৬৯টি আসন পাবে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। ফলে দলটি ২২টি আসন পাবে। এককভাবে ৬টি আসন পাওয়ায় জাতীয় নাগরিক পাটি উচ্চকক্ষে পাবে মাত্র ২টি আসন। অন্যান্য দল মিলে আরও ৭টি আসন পাবে।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। আর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে। জুলাই সনদ ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ৩০বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বাকিগুলোয় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত পোষণ) রয়েছে। এই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ নির্ধারিত আছে। প্রথম ধাপে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। তবে উচ্চকক্ষ গঠনে নির্বাচিত সবগুলো দল একমত হলেও কোন পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা আছে। গণভোটের রায় অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হবে। কিন্তু সরকার গঠন করতে যাওয়া দল-বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ ছিল সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে গঠিত হবে উচ্চকক্ষ। এ ব্যাপারে বিএনপি প্রকাশ্যে এখনো কিছু বলছে না। কিন্তু সূত্র বলছে, তারা ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়। এ ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তাই আশা করা যায়, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটি জনগণের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নেবে।