রোজায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবুও অস্থিরতার শঙ্কা
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯
স্টাফ রিপোর্টার : সরকার ব্যস্ত ভোট নিয়ে, আর অসাধু ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটতে। রোজা আসন্ন হওয়ায় এর সঙ্গে এখন আরও সুবিধা তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের। রোজাকে কেন্দ্র করে সাধারণ ক্রেতাদের জিম্মি করার ধান্ধায় রয়েছে তারা। ফলে রোজা এলেই যেন নতুন করে আতঙ্কে পড়েন সাধারণ মানুষ। রোজার মাস শুরু হওয়ার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, যা বহুদিনের চেনা দৃশ্য। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং রমজানের আগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাজার সিন্ডিকেট এবং এর খেসারত দিতে হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষকে। বাজারে চোখ রাখলেই বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়। ডিম, মুরগি, সবজি, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, তেল, চিনি কোনো পণ্যের দামই স্থির নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে অস্থিতিশীল ডিম ও পেঁয়াজের বাজার। চালের মতো প্রধান খাদ্যের দাম কমার বদলে বেড়েই চলেছে। দু-একটি পণ্যের সামান্য দাম কমলেও তাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পান না।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা, দেশের ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তারা বলছে, রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত। ফলে রোজার সময় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা কম। তবে জ্বালানি সংকট, চাঁদাবাজি, বন্দরে ধর্মঘট ও বাজারে প্রশাসনিক তদারকির অভাবে পণ্যের দামে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে বড় আমদানিকারক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সহায়তা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা। গত ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) আয়োজনে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন নিত্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতারা। রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, মজুদ, সরবরাহ এবং মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে এফবিসিসিআই। মতিঝিলে ফেডারেশন ভবন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। সভায় নিত্যপণ্যের আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আবদুর রহিম খান বলেন, চলতি বছর চিনি ও ভোজ্যতেলের আমদানি ও ঋণপত্র খোলার পরিমাণ গত বছরের চেয়ে বেশি। তাই নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে না। তবে এবার নির্বাচনের পরপরই রোজা শুরু হচ্ছে। তাই বাজারের মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব বেশি। সভায় চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ আবুল হাশেম বলেন, আমদানি তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঠিক হবে না। চিনি আমদানি বেশি হলেও পণ্য যদি জাহাজেই থাকে, খালাস করা না হয়, তাহলে বাজারে স্বস্তি আসবে না।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, মাত্র চার পাঁচটি কোম্পানি আটা, ছোলা, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্য উৎপাদন, আমদানি এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারে বিক্রি করেন। অথচ মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকার এসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিকে জরিমানা করেন।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক মো. তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘এবার মিলগেট পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ৯২ থেকে ৯৩ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম। এবার আমরা যে পরিমাণ চিনি সরবরাহ করছি, তা মেঘনা গ্রুপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে সামনে নির্বাচনের কারণে সরকারি ছুটি ও বন্দরের আন্দোলনের প্রভাবে পণ্য সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
সভায় শ্যামবাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, করপোরেট ব্যবসায়ী আর সিন্ডিকেটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা একই শক্তি। শ্যামবাজার থেকে প্রতিদিন পুলিশ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এক লাখ টাকা করে চাঁদা নেয়। এ বাড়তি অর্থের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর পড়ে।
কাঁচাবাজারে সিন্ডিকেট বলে কিছু নেই মন্তব্য করে বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইমরান মাস্টার বলেন, কাঁচামাল পচনশীল দ্রব্য। তাই এখানে সিন্ডিকেট সম্ভব নয়। সময়মতো বিক্রি না হলে এসব পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। রোজায় পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা ও বেগুনের মতো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে। তাই রোজায় কাঁচাবাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না। তবে এখন লেবুর মৌসুম নয়, তাই এ পণ্যের দাম বাড়তি থাকতে পারে।
পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক কে এম আরিফ উল কবির বলেন, খেজুরকে বিলাসদ্রব্য হিসেবে চিহ্নিত করে তার ওপর ১৩২ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছিল। একসময় যে খেজুর ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত, সেটির দাম একপর্যায়ে ১ হাজার টাকার বেশি হয়ে যায়।
দেশের ছয়টি অঞ্চলে এক সপ্তাহ ধরে বাজার বিশ্লেষণ করে মতবিনিময় সভায় বাজার বিশ্লেষক কাজী আবদুল হান্নান বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একেকটি বাজার থেকে ১০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলার ঘটনা ঘটছে, যা সরাসরি পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলে। এছাড়া রমজানে বড় পরিসরে চাঁদাবাজি শুরু হওয়ার প্রবণতা থাকে।
নিউমার্কেট নিত্যপণ্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, দেশের মানুষ এখন ৮ থেকে ১০টি বড় করপোরেট কোম্পানির হাতে জিম্মি। আর ব্যবসা করতে এমন মানুষকে চাঁদা দিতে হয় যে তা কাউকে বলা যায় না। তবে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজার গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ স্থিতিশীল রয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরোজা রহমান বলেন, ঢাকা মহানগরসহ জেলা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে। রমজান মাসে এ তদারকি আরও জোরদার করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ একটি প্রভাবশালী বাজার সিন্ডিকেট। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে দেয়। চিনি, পেঁয়াজ কিংবা আলুর বাজারে এমন দৌরাত্ম্য নতুন নয়। প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। এর পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হওয়ায় পণ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।