গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সংস্কার কর্মসূচিকে এগিয়ে নেবে


৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৭

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক ও সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদ প্রণীত হয়। গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে পাঁচটি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে কমিশন কয়েক দফায় ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৭২টি বৈঠক করে। বৈঠকসমূহের আলোচনায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের সর্বসম্মত ও বৃহত্তর ঐকমত্য এবং কয়েকটি ভিন্নমতসহ মোট ৮৪টি সুপারিশসংবলিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে। যেটা বাস্তবায়নে জাতীয় নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। যারা সংস্কার চান, তারা ‘হ্যাঁ’ এবং যারা সংস্কার চান না তারা ‘না’ ভোট দিতে পারবে।
এই জুলাই সনদে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কথা বলা হয়েছে। ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারছেন না, বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার, সংদীয় কমিটির সভাপতি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট, বাড়বে নারীর ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে, রাষ্ট্রপতি চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি ছাড়া কাউকে সাধারণ ক্ষমা করতে পারবেন না, টেনে ধরার সুযোগ তৈরি হবে দুর্নীতির লাগাম, বিচার বিভাগ থাকবে ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত, পুলিশ ও জনপ্রশাসনে আসবে স্বচ্ছতা। এছাড়া বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রয়েছে এই সনদে। এই সনদ বাস্তবায়নে ভোট প্রদানে সাধারণ মানুষকে সচেতন করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু কিছু কিছু ব্যক্তি ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে থেকেও গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই লোকেরা সাধারণ মানুষকে বোঝাচ্ছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম থাকবে না। ‘আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে না’ হ্যাঁ ভোট দিলে- এমন আজগুবি মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছাড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ থেকে এসে বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া কিছু লোক।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করতে দেশজুড়ে দূত নিয়োগ করেছে। জামায়াতে ইললামী দেশজুড়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, দলটির আমীরসহ শীর্ষনেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রকাশ্যে হাজার হাজার জনতার মাঝে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে নেতাকর্মীসহ দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু দলটির স্থানীয় কমিটির অন্যতম সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের বক্তব্যে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, গণভোট আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার এই মন্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই সদন বাস্তবায়নে দেশে বিদ্যমান প্রায় সব দল একমত। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোটের কোনো বিকল্প নেই। জনগনকে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জামায়াত ও এনসিপি দেশজুড়ে জোরালোভাবে প্রচার চালাচ্ছে। দল দুটির শীর্ষনেতারা জনসভায় ভোটারদের হ্যাঁ ভোট দেওয়া আহ্বান জানাচ্ছেন। সহযোগী সংগঠন ও সমথর্ক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও দেশজুড়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমান জনসভায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির অন্যতম শীর্ষনেতা (মহাসচিব) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদিও বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব আমাদের না। কিন্তু দলটির অনেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে কেউ কেউ না ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করলেও কর্মীদের বিশাল অংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে, কেননা তারা সংস্কার চান, পরিবর্তন চান।
‘হ্যাঁ’ ভোটে যেসব ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে
ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হবে
গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে প্রণীত হয়েছে জুলাই সনদ। সনদ বস্তবায়নে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ থাকবে বিরোধীদলগুলো। ফলে ক্ষমতার একটি ভারসাম্য তৈরি হবে।
সংবিধান সংশোধন ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা
সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে; তবে প্রস্তাবনাসহ সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যথা ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যা অনুচ্ছেদ ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮৬ অনুচ্ছেদ) হিসেবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে। ১৪১ক সংশোধনের সময় ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগের’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে। (২) জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বিধান যুক্ত করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তার অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতার উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। (৩) জরুরি অবস্থাকালীন নাগরিকের দুটি অধিকার অলঙ্ঘনীয় করার লক্ষ্যে এ মর্মে বিধান করা হবে যে, ‘অনুচ্ছেদ ৪৭ক-এর বিধান সাপেক্ষে কোনো নাগরিকের (ক) জীবনের অধিকার (জরমযঃ ঃড় ষরভব) এবং (খ) বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫-এ বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না।’
রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও ক্ষমা প্রদর্শন
রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। যেকোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সংশ্লিষ্ট আইনে এরূপ বিধান রাখা হবে যে, এরূপ কোনো আবেদন বিবেচনার পূর্বে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও দলীয় পদে থাকা
একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর থাকতে পারবেন, এজন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না। এ বিষয়ে ২৯টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত এবং ৩টি রাজনৈতিক দল ভিন্নমত প্রদান করেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮খ সংশোধনপূর্বক সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ (পনেরো) দিন পূর্বে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ৩০ (ত্রিশ) দিন পূর্বে আইনসভার নিম্নকক্ষের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় (১) প্রধানমন্ত্রী, (২) বিরোধীদলীয় নেতা, (৩) স্পিকার, (৪) ডেপুটি স্পিকার (বিরোধীদলের) এবং (৫) সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি (যদি সংসদে আসন সংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধীদলের অবস্থানে থাকে তাহলে সেসব দলের মধ্য থেকে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোটপ্রাপ্ত দলটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধীদল হিসেবে বিবেচিত হবে) মোট ৫ (পাঁচ) সদস্য সমন্বয়ে একটি ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদের স্পিকার সভাপতিত্ব করবেন। কমিটি গঠিত হওয়ার পরবর্তী ২৪ (চব্বিশ) ঘণ্টার মধ্যে কমিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহ, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সদস্যদের নিকট হতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮গ(৭)-এর বর্ণিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির নাম প্রস্তাবের আহ্বান করবে এবং এক্ষেত্রে প্রতিটি দল এক জন এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এক জন মাত্র ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। রাজনৈতিক দলসমূহ এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যগণ পরবর্তী ২৪ (চব্বিশ) ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে তাদের প্রস্তাবিত নাম দাখিল করবে। কমিটি নিজ উদ্যোগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তির নাম অনুসন্ধান ও অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। পরবর্তী ৭২ (বাহাত্তর) ঘণ্টার মধ্যে কমিটির সদস্যগণ সভায় মিলিত হয়ে নিজেদের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এবং রাজনৈতিক দলসমূহ ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নিকট হতে প্রস্তাবিত নামসমূহ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করত বাংলাদেশের যে সকল নাগরিক সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮-গ(৭)-এর অধীনে উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাদের মধ্য হতে একজনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন এবং তিনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক ৯০ (নব্বই) দিন।
আইনসভা গঠন
বাংলাদেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) সমন্বয়ে গঠিত হবে। এমন সংস্কারে ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত, ৫টি রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে শপথ গ্রহণের তারিখ হতে ৫ (পাঁচ) বছর। তবে কোনো কারণে নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় একইসঙ্গে উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। তালিকায় কমপক্ষে ১০ (দশ) শতাংশ নারী প্রার্থী থাকতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার ও সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ
আইনসভার উভয় কক্ষে একজন করে ডেপুটি স্পিকার সরকারদলীয় সদস্য ব্যতীত অপর সদস্যদের মধ্য হতে মনোনীত করা হবে। জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যগণ দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধীদলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। এতে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত, চারটি দল ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় অনুমোদন
জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এরূপ আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের পর আইনসভার উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন (রেটিফাই) করা হবে। ২৯টি রাজনৈতিক দল ও জোট এ বিষয়ে একমত হয়েছেন, একটি রাজনৈতিক দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। ২টি রাজনৈতিক দল মতামত দেয়নি।
বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ
কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে, তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রধান বিচারপতি, সময়ে সময়ে, যে সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন তার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে। সকল উপজেলা জেলা সদরে অবস্থিত (সদর উপজেলা), সে সকল উপজেলা আদালতসমূহ জেলা জজ কোর্টের সাথে সংযুক্ত রেখে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। বিদ্যমান চৌকি আদালত, দ্বীপাঞ্চল ও ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা আদালতসমূহ বহাল রেখে এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। জেলা সদরের কাছাকাছি উপজেলাগুলোয় নতুন আদালত স্থাপনের প্রয়োজন নেই (প্রয়োজনীয় জরিপ পরিচালনা সমাপ্ত করে)। অবশিষ্ট উপজেলাগুলোর জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য, যাতায়াত ব্যবস্থা, দূরত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা, মামলার সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে আদালত স্থাপন করা হবে। সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ইউনিটের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে।
নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ
বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮ (১) সংশোধনপূর্বক এরূপ যুক্ত করা হবে যে, (ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্ধারিতসংখ্যক নির্বাচন কমিশনারগণের সমন্বয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে নিম্নরূপে গঠিত একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করা হবে : (১) জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই বাছাই/ঝবষবপঃরড়হ কমিটির প্রধান হবেন), (২) ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধীদল হতে নির্বাচিত হবেন), (৩) প্রধানমন্ত্রী, (৪) বিরোধীদলের নেতা, এবং (৫) প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসেবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। এই বাছাই/ঝবষবপঃরড়হ কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারগণের নিয়োগ করার উদ্দেশ্যে বিদায়ী নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য কমিশনারগণের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ (নব্বই) দিন পূর্বে সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে (যেখানে নির্বাচন কমিশনার হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা, প্রার্থী অনুসন্ধানের পদ্ধতি, প্রাধিকার ও কর্মপদ্ধতির উল্লেখ থাকবে) ‘ইচ্ছাপত্র’ ও প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি আহ্বান করাসহ কমিটির নিজস্ব উদ্যোগে উপযুক্ত প্রার্থী অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
(খ) অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের ‘জীবনবৃত্তান্ত’ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করত সর্বসম্মতিক্রমে তাদের মধ্য হতে ১ (এক) জনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্ধারিত প্রতিটি পদের বিপরীতে ১ (এক) জন করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিবে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা
বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথকীকরণের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সচিবালয় থাকবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এই সচিবালয়ে সংযুক্ত তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে। এই সচিবালয়ের ওপর অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক কার্যক্রম, বাজেট প্রণয়ন, অধস্তন আদালতের বিচারকের পদোন্নতি, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হবে।
কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন
ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে ২টি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করা হবে। এতে ৩১টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত, ১টি রাজনৈতিক দল একমত নয়।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন
পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং পুলিশি সেবাকে জনবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি ‘পুলিশ কমিশন’ গঠন করা হবে। এই কমিশনের উদ্দেশ্য হবে (১) শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে পুলিশ যাতে আইনানুগভাবে এবং প্রভাবমুক্তভাবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়, তা নিশ্চিত করা। (২) পুলিশ বাহিনীর যেকোনো সদস্যের উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তিকরণ। (৩) নাগরিকদের পক্ষ হতে পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্য/সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তিকরণ।
জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ
সকল পর্যায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ দায়িত্ব গ্রহণের ৩ (তিন) মাসের মধ্যে ও পরবর্তীতে প্রতি বছর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদ বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দেবেন এবং নির্বাচন কমিশন উক্ত বিবরণীসমূহ কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে।
এছাড়া জাতীয় সংসদের সংসদ নেতা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকারের একজন প্রতিনিধি, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের (যিনি বিরোধীদল হতে নির্বাচিত) একজন প্রতিনিধি, যিনি সংসদ সদস্য হবেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব যুবায়ের বলেছেন, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রয়েছি। এটি জনআকক্সক্ষার একটি অংশ। জনগণ ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী একটি নতুন বাংলাদেশ চায়। যেখানে বৈষম্য থাকবে না। কোনো সরকারের স্বৈরাচার হওয়ার সুযোগ থাকবে না, নতুন ফ্যাসিজমের পথ বন্ধ হবে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট হটাতে যেসব মানুষ জীবন দিয়েছে, শহীদ হয়েছে, যারা আহত হয়েছেন, নতুন বাংলাদেশ তাদেরই স্বপ্ন ছিল। গণভোট হ্যাঁ ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে, ইনশাআল্লাহ।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রয়েছি। কেননা শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে জনগণের স্বার্থে সংস্কার দরকার। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে এককভাবে কোনো শাসকের কর্তৃত্ব থাকবে না। সবার পরামর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হবে। সরকারি দল ও বিরোধীদল উভয়েরই দেশ পরিচালনায় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে। সে কারণে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার বিকল্প নেই। বিএনপির স্থানীয় কমিটির অন্যতম সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেছেন, বিএনপিই প্রথম সংস্কারের উদ্যোক্তা। তারেক রহমানের ৩১ দফার মধ্যেই সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। ফলে আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। সংস্কারের পক্ষে।