সরবরাহ সংকটের মধ্যেও এলপিজির মূল্য বৃদ্ধি
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৫
স্টাফ রিপোর্টার : বাজারের প্রকৃত সমস্যা সামাধান ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের পাকড়াও করতে ব্যর্থ হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় সম্পূর্ণ সফল। বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট ও এজেন্ট এবং দোকানিরা যখন যে যার মতো করে মূল্য নির্ধারণ করে গ্রাহকদের পকেট কাটছে, তখন তাদের নিবৃত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার। অথচ উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের মধ্যেই গত ২ ফেব্রুয়ারি সোমবার নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। এতে ভোক্তারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কেননা এমনিতেই দোকানিরা বেশি মূল্য নিচ্ছে, এখন সেই বাড়তি মূল্যের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। এতে শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকদের ব্যয়ের বোঝা বাড়বে।
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এলপিজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাসিকভাবে মূল্য সমন্বয় করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো দোকানি নিচ্ছে দ্বিগুণ মূল্য। ভোক্তাদের আক্ষেপ প্রতি মাসেই দাম বাড়ে, কিন্তু আয় তো আর বাড়ে না। গ্যাস সংযোগ না থাকায় এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে লাখ লাখ পরিবারকে। এখন এসব পরিবারের রান্না করাই কষ্টের হয়ে গেছে।
মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় সংকট বেশি প্রকট। খুচরা বিক্রেতারা জানান, ডিলার পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তারা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। তবে ভোক্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, দাম বাড়ার খবর পেলেই অনেক বড় ডিলার সিলিন্ডার আটকে রাখে। পরে বেশি দামে বাজারে ছাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। বৈশ্বিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সব মিলিয়ে এলপিজির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট এলপিজির একটি বড় অংশ আসে সমুদ্রপথে আমদানির মাধ্যমে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের কারণে বেশ কয়েকটি জাহাজ আটকা পড়ায় সংকট বেশি বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্দরের জট ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমস্যাও। একসময় শহরের রান্নাঘরে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস সহজলভ্য থাকলেও বর্তমানে নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজিই হয়ে উঠেছে প্রধান বিকল্প। গ্রামাঞ্চলে কাঠ, খড় বা জৈব জ্বালানির ব্যবহার কমে যাওয়ায় সেখানেও এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প জ্বালানির পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি না থাকায় এলপিজির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বা বায়োগ্যাসের মতো বিকল্প ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হলে এই চাপ কিছুটা কমানো যেত।
প্রসঙ্গত, ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কেজিতে বাড়ল ৪ টাকা ২১ পয়সা। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। গত মাসে (জানুয়ারি ২০২৬) দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫০ টাকা। গত মাসে দাম বেড়েছিল ৫৩ টাকা। ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নতুন দাম ঘোষণা করেন। এদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকেই নতুন দাম কার্যকর করা হয়।