ইসলামের আলোকে বিয়ে-শাদী
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৩
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
আদর্শ পরিবার গঠন, মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ এবং মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ হচ্ছে বিবাহ। আর বিবাহ-শাদী হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। এ চাহিদা পূরণার্থেই ইসলামী শরীয়ত বিবাহের হুকুম আরোপ করেছে। মানবজাতিকে অবৈধ মিলন থেকে বিরত রাখা এবং জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্যই বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিন বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন।
আমাদের আদিপিতা হযরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করার পর তিনি কি যেন একটি শূন্যতাবোধ করছিলেন। তার এ শূন্যতা পূরণ তথা মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্যই মহান রাব্বুল আলামিন হযরত আদম (আ.)-এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করেন হযরত হাওয়া (আ.)-কে। ফলে আদম (আ.)-এর অশান্ত মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে এবং জান্নাতের হিমেল ছায়ায় তাদের পবিত্র বিবাহ সংঘটিত হয়। উক্ত বিবাহে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন ফেরেশতারা। আর এ বিবাহই হচ্ছে সর্বপ্রথম বিবাহ। এখান থেকেই বিয়ের প্রচলন শুরু হয়।
কোনো ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান হলে কালবিলম্ব না করে তার বিবাহ করে নেয়া ঈমানী দায়িত্ব। বিয়ে শুধু জৈবিক চাহিদাই নয়, বরং এটি মহান একটি ইবাদতও বটে। বিবাহ দ্বারা দীন-দুনিয়ার কল্যাণ সাধিত হয়। হাদিস শরীফে রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল, তার অর্ধেক দীন-ঈমান পূর্ণ হয়ে গেল, সে যেন বাকি অর্ধেকের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করে চলে।’ (মিশকাত)। রাসূল (সা.) আরো এরশাদ করেন, ‘বিবাহ হলো ঈমানের অর্ধেক, যে ব্যক্তি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করল না, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ মহনবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘ইসলামে বৈরাগ্য নেই এবং বৈরাগ্য জীবনযাপন করাকেও রাসূল (সা.) নিষেধ করেছেন।’ (দারেমী)।
হাদিসে আরো বলা হয়েছে, ‘স্বামী-স্ত্রী যখন একান্তে বসে আলাপ করে, হাসি-খুশি করে, তার সওয়াব নফল ইবাদতের মতো।’ বিবাহের দ্বারা পাপকর্ম থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। জৈবিক চাহিদা পূরণ হয়। নৈতিক চরিত্রের হেফাজত হয়। বংশপরম্পরা অব্যাহত থাকে। সুখময় সমাজ ও আদর্শ পরিবার গঠন সম্ভব হয়। মানসিকভাবে মানুষ সুস্থ থাকে। মনে প্রশান্তি আসে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর হয়। বিবাহের ফজিলত অপরিসীম। ছেলেমেয়েদের বিবাহ দেয়া পিতার দায়িত্ব। যদি পিতা না থাকে, তাহলে তার অভিভাবকের কর্তব্য হলো ছেলেমেয়েদের ভালো পাত্র-পাত্রী দেখে বিবাহ দিয়ে দেয়া।
বিবাহ যেহেতু সবার জন্য অত্যাবশ্যক, তাই মহান রাব্বুল আলামিন অতি সহজে বিবাহ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিবাহের মধ্যে ব্যয়বহুল ও অতিরিক্ত আড়ম্বরতাকে নিষেধ করা হয়েছে। এজন্যই আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) তার নিজের কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বিবাহের অনুষ্ঠান অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। হযরত আলী (রা.) ফাতেমা (রা.)-কে বিয়ে করার জন্য রাসূল (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠালেন, তৎক্ষণাৎ হযরত জিবরাইল আ. রাসূল (সা.)-এর নিকট অহি নিয়ে আসেন, অহি পেয়ে রাসূল (সা.) তার প্রস্তাব কবুল করেন এবং ফাতেমা (রা.)-এর সাথে তার বিবাহের ব্যবস্থা করেন। তখন হযরত আলী (রা.)-এর বয়স ছিল ২১ এবং ফাতেমা (রা.)-এর বয়স ছিল ১৫। রাসূল (সা.) তাৎক্ষণিক সাহাবাদের ডেকে নিজেই খুতবা পড়ে বিবাহ পড়িয়ে দিলেন এবং উপস্থিত মেহমানদের মাঝে খুরমা ও খেজুর বণ্টন করে দিলেন। তার বিয়েতে মোহর ধার্য করলেন মাত্র ৪০০ মিছকাল (১০ দিরহাম)।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হচ্ছে সুন্নতি বিয়ে, অর্থাৎ যে বিয়েতে খরচ কম হয় এবং কোনো জাঁকজমক থাকে না। (মিশকাত)। কিন্তু বর্তমান সমাজে কনের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের মোহর এবং বরের পক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের যৌতুক- এ দুটি বিষয় নিয়ে বিয়ে-শাদীতে চলছে দরদাম তথা বাড়াবাড়ি। অথচ উভয়টি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ তথা হারাম। হযরত ওমর (রা.) বলেন, ‘হে মুসলমান সম্প্রদায়! তোমরা বিয়ে-শাদীতে মোটা অঙ্কের মোহর, জাঁকজমক এবং যৌতুক দাবি কর না। কেননা আল্লাহর কাছে এটার কোনো মর্যাদা নেই। যদি থাকত, তাহলে রাসূল (সা.) তার মেয়ে ফাতেমা (রা.)-এর বিয়েতে করতেন।’ (তিরমিযী)।
ইসলামী শরীয়তে যৌতুক নেয়া এবং দেয়া হারাম। যৌতুকের কারণেই অনেক সোনার সংসার ভেঙে যায়। বিয়েতে যদি আপন পিতা নিজ মেয়ের সাথে নিজ ইচ্ছায় বরের চাওয়া তথা দাবি ছাড়া সাংসারিক প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটা যৌতুক হবে না; বরং এটা উপঢৌকন বা হাদিয়া হবে। কিন্তু নিজের ওপর বোঝা হয় কিংবা বরের চাহিদা বা দাবি মেটাতে যা দেয়া হয়, এটা হবে যৌতুক। সমাজে প্রচলিত যৌতুকের কোনোরূপ বৈধতা শরীয়তে নেই। তার কোনো অস্তিত্ব মহানবী (সা.), খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরামগণের যুগে ছিল না, যার কারণে এটা হচ্ছে নাজায়েজ তথা হারাম।
যৌতুকের নেশা সমাজে মহামারি আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। সমাজের জন্য এক মহাবিপদ ও সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে যৌতুক। কন্যার পিতা কারো কাছ থেকে টাকা ধারকর্জ করে কিংবা সুদের ওপর নিয়ে বরের যৌতুকের চাহিদা মেটান। বর্তমান সমাজে বিয়েতে যৌতুক না দেয়াকে অপমান মনে করা হয়। অথচ রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সম্মান অর্জনের জন্য বিয়ে করবে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করবেন। আর যে ব্যক্তি বিয়েতে যৌতুক দাবি করবে, সেই ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা দরিদ্রতা ও কঠিন আজাব ছাড়া আর কিছুই দেবেন না।’
আমাদের সমাজ আজ যৌতুকের জন্য পাগল। অথচ রাসূল (সা.) তার মেয়ে হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বিয়েতে কোনো যৌতুক দেননি বা সাহাবায়ে কেরামগণও বিয়েতে কোনো যৌতুক দাবি করেননি। তাই আসুন, আমরা এ সমাজ থেকে যৌতুকপ্রথা প্রতিরোধ করি এবং ইসলামী শরীয়ার আলোকে বিবাহ-শাদী সম্পন্ন করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে যৌতুকের মতো হারাম পাপকাজ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন। লেখক : সাংবাদিক।