মায়ের দুধপান ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি


২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১০

॥ সেলিনা আক্তার ॥
মায়ের দুধপান শিশুর জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের রিজিকদাতা। তিনি আমাদের জন্য মঙ্গলকর খাদ্যসমূহ সৃষ্টিকরে খাওয়ার বিধানও দান করেছেন। জন্ম থেকে শুরু করে কখন কোন খাবার খেতে হবে, কীভাবে খেতে হবে, তাও তিনি মহাগ্রন্থ কুরআনের মাধ্যমে বলে দিয়েছেন।
আল-কুরআনের সূরা আল-বাকারার ২৩৩নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানকে দীর্ঘ দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধ পান করাবে।’ এ প্রসঙ্গে সূরা আহকাফে আল্লাহ আরো বলেন, ‘মা তাকে কষ্টের সাথে গর্ভে ধারণ করে এবং দুধ ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস।’ সুতরাং শিশুকে দুধপান করানো মহান আল্লাহর নির্দেশ এবং শিশুর জন্মগত অধিকার। মায়ের দুধ শিশুর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত। শিশুর জন্য মায়ের দুধ সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট খাদ্য। যার সমমানের কোনো খাবার নেই। মায়ের দুধ যেমন পুষ্টিকর, তেমনি বিশুদ্ধ, নিরাপদ, আদর্শ, সর্বশ্রেষ্ঠ খাবার। একটি শিশুর দৈহিক-মানসিক সুষ্ঠু, সুন্দর বিকাশের জন্য যেসব খাদ্য উপাদান প্রয়োজন তার সব উপাদানই সঠিকমাত্রায়, সঠিক তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ অবস্থায় মজুদ থাকে মায়ের দুধে। তাই জন্মের পর পরই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। মায়ের দুধকে শিশুর পুষ্টির ভাণ্ডার বলা হয়। খাদ্যের সব উপাদান মায়ের দুধে পরিমাণ মতো বিদ্যমান। জন্মের পর হতে শিশুকে নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুরা সত্যিকারভাবেই বলিষ্ঠ, রোগমুক্ত ও মেধাবী হিসেবে গড়ে উঠবে। তাই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সবাইকে যত্নবান হওয়া অত্যান্ত জরুরি। মাতৃদুগ্ধ পানে মায়েদের সচেতন করে তোলার জন্য প্রতি বছর আগস্টের প্রথম সপ্তাহব্যাপী মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং নবজাত শিশুর লালন-পালনের যাবতীয় ব্যবস্থা তিনিই করেছেন। আল্লাহ পাক মানুষের শরীর থেকে একটা মাত্র খাবারই তৈরি করে শিশুদের জন্য নিয়ামত হিসেবে উপহার দিয়েছেন। তাই মানবসন্তান জন্মের পর মায়ের দুধই প্রথম খাবার। যা হালকা, মিষ্টি ও উষ্ণ, তা শিশু-স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। দয়াময় আল্লাহ তায়ালা নবজাতককে মায়ের দুধ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ তাৎপর্যপূর্ণ পারিবারিক নির্দেশনা যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে শিশু ও মায়ের জীবনে বিরাট কল্যাণ সাধিত হয়। আল্লাহ তায়ালা একমাত্র তার বিধিবিধান মেনে চলার মধ্যে ইহকাল ও পরকালে মানবজাতির সুখশান্তি ও সফলতা রেখেছেন।
আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ১৫ বার মাতৃদুগ্ধ-সংক্রান্ত ও মায়ের দুধপানের কথা বলেছেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মায়ের প্রথম দুধ অর্থাৎ শালদুধ শিশুদের পান করানো আবশ্যক। শালদুধ শিশুর জীবনের প্রথম টিকা। কেননা এতে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় এমন মূল্যবান উপাদান রয়েছে, যা শিশুকে বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করে থাকে। শালদুধ নবজাতকের পরিপূর্ণ পুষ্টির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। শালদুধে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ, শর্করা, স্নেহজাতীয় পদার্থ, খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন এবং নবজাতকের শরীরে রোগপ্রতিরোধ-ক্ষমতা বৃদ্ধিকারক উপাদান। জন্মের পরপর শালদুধ খেলে শিশুর শরীরে রোগপ্রতিরোধ-শক্তি বাড়ে এবং একই সঙ্গে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টিও লাভ করে।
মায়ের যত্নের ওপর শিশুর সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে। এজন্য প্রতিটি শিশুর জন্য জন্মের পর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ দিতে হবে। এতে মা ও শিশু উভয়ই সমান উপকৃত হবেন। বুকের দুধ একটি সুষম খাদ্য। এর কোনো বিকল্প নেই। পূর্ণ দুই বছর শিশুকে তার মা দুধ পান করাবেন। প্রয়োজনে আরও ছয় মাস সময় বাড়ানো যেতে পারে। শিশুকে বুকের দুধ দিলে মায়ের স্তনে ক্যানসার হয় না এবং সাধারণত গর্ভনিরোধ হয়। নবজাত সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ফলে মায়ের অল্প সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ ঝুঁকি থাকে না। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভধারণ করে। এরপর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।’ (সূরা লুকমান : ১৪)। অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও দুধ ছাড়াতে লাগে ৩০ মাস।’ (সূরা আল-আহকাফ : ২৫)।
মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য স্রষ্টার পক্ষ থেকে এক মহান নিয়ামত। মায়ের দুধ বিশ্বস্ত ও নিরাপদ এবং শিশু তা সহজেই হজম করতে পারে। স্তন্যপানে মা ও শিশুর মধ্যে একটি গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং শিশু নিজেকে অধিক নিরাপদ মনে করে। আর দুধের মাধ্যমে মায়ের আচার-আচরণ ও স্বভাবের আদান-প্রদান হয়। আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে হজরত মূসা (আ.)-এর শৈশবকালীন অবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে এরশাদ করেছেন, ‘মূসা-জননীর অন্তরে আমি ইঙ্গিতে নির্দেশ করলাম যে, তুমি শিশুটিকে দুগ্ধদান করতে থাকো।’ (সূরা আল-কাসাস : ৭)।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, শিশুর জন্মের প্রথম ঘণ্টায় মায়ের দুধ পান করালে ৫২ হাজার শিশুর প্রাণ রক্ষা করতে পারে। দেশে প্রতি বছর শিশু জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার নবজাতক মারা যায়। জন্মের পর বুকের দুধ না খাওয়ার কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি শিশু মারা যায়। সুতরাং সমাজের প্রতিটি নারীই তার সন্তানকে দুধপান করাতে হবে এবং অন্য নারীকে এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করে জাগিয়ে তুলতে হবে।
মায়ের দুধের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে নবজাত শিশুর সুস্থ ও সবল হয়ে বেড়ে ওঠার বীজমন্ত্র। দুর্যোগ মোকাবিলায় মায়ের দুধ সর্বশ্রেষ্ঠ খাদ্য ও পানীয়। প্রথম ছয় মাস মায়ের দুধই শিশুর খাদ্য ও পানীয়ের চাহিদা মেটায়। মায়ের দুধের অমৃতস্বাদের মধ্য দিয়ে শিশুর শিরায় শিরায়, প্রতিটি রক্তবিন্দুতে যা সঞ্চারিত হয়ে যায়। মায়ের দুধ তখন নবজাতকের কাছে শুধুই খাদ্যপানীয় নয়; প্রাথমিক অবলম্বন, নিরাপত্তার প্রথম নিশ্চয়তা, বিশ্বসংসারের সঙ্গে প্রথম যোগসূত্রও। দিনে দিনে শিশু যখন বাড়তে থাকে, মাতৃদুগ্ধ তাকে দেয় পর্যাপ্ত জীবনীশক্তি, বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ। মায়ের দুধ পানে শিশুদের স্মরণশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, চোখের জ্যোতি, আচার-ব্যবহার, সামাজিকতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার সুন্দর বহিঃপ্রকাশ হয়। যে নবজাতকের মা শিশুকে দুধ পান করান তার জন্য মাহে রমজানের রোজা পালন করার বাধ্যবাধকতা পর্যন্ত শিথিল করে দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মুসাফিরের ওপর থেকে চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজের অর্ধেক রহিত করে দিয়েছেন এবং মুসাফির, স্তন্যদানকারিণী ও গর্ভবতী মহিলা থেকে রমজানের রোজা পালন করার বাধ্যবাধকতাও শিথিল করে দিয়েছেন।’ (তিরমিযী, আবু দাউদ ও নাসাঈ)।
যেসব শিশু গুঁড়ো দুধ খায়, তারা প্রায়ই অসুস্থ হয় এবং তাদের মৃত্যুহারও বেশি। পক্ষান্তরে মায়ের দুধ খাওয়ালে শিশুমৃত্যু হার অনেক কমে যাবে। তবে এর সুফল পেতে মা ও পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সব গর্ভবতী মাকে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর বুকের দুধ দেয়ার আগ্রহ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। গর্ভবতী মায়ের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে, যেন তার সন্তান পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ পায়। এজন্য মায়ের মানসিক প্রস্তুতিও প্রয়োজন। চিকিৎসক ও পরিবার এ বিষয়ে মাকে সহযোগিতা করবেন। বুকের দুধ শিশুকে দিলে মাও সুস্থ থাকে। মাতৃদুগ্ধের গুরুত্বের প্রতি লক্ষ করলে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালের প্রথম দিকে যেহেতু মায়ের দুধ পানরত শিশুরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আর্থিক অনুদান পেত না, সেহেতু মায়েরা শিশুদের জন্য অনুদান পাওয়ার আশায় তাড়াতাড়ি বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিত। এ অবস্থা লক্ষ করে হজরত ওমর (রা.) শিশুদের বুকের দুধ দানে মায়েদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে জন্মের পর থেকে এ আর্থিক অনুদান চালু করেন।
নবজাতককে মায়ের দুধ খাওয়ানো প্রসঙ্গে রাজধানীর হাজীপাড়াস্থ প্যানাসিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল হক সাগর বলেন, দেশের প্রতিটি শিশুকে জন্মের প্রথম দুইবছর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশুর নানা সুবিধা রয়েছে। তার মধ্যে- শিশুকে বার বার দুধ খাওয়ালে মা ও শিশুর মধ্যে মমতার বন্ধন সৃষ্টি হবে। নিয়মিত ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মাকে জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো পদ্ধতি নিতে হয় না। মায়ের দুধে খাদ্য উপাদান আমিষ, শর্করা, স্নেহ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকে, যা শিশুর শারীরিক গঠন ও সামাজিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মায়ের দুধে ল্যাকটাবুমিন ও ল্যাকটো গ্লোবিউলিন নামক দুটি উপাদান থাকে, যা শিশু অতি সহজে হজম করতে পারে।
আল কুরআন ও নবী (সা.)-এর সুন্নাহর দৃষ্টিতে মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্মগত অধিকার। সে অধিকার যাতে কোনো কারণে খর্ব না হয়, এ ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। অভিভাবকের ওপর দায়িত্ব হচ্ছে মায়ের দুধ প্রদানকে সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও সহায়তা করা। ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিশুদের এ অধিকারের ব্যাপারে মায়েদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। মাতৃদুগ্ধ যাতে শিশুরা নিয়মিত পায়, সেজন্য মায়েদের সচেতন করতে হবে। সব গর্ভবতী মাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সুফল সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। শিশুকে সঠিক পদ্ধতিতে দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে মাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসলামসম্মত প্রাকৃতিক বিধান মেনে চললে মা ও শিশু উভয়ই নানারকমের শারীরিক জটিলতা থেকে রক্ষা পাবে। তাই এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদনের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা নয়। মা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে তার নবজাত সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে এবং উপভোগ করে পরিপূর্ণ মাতৃত্বের সাধ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এ বিষয়ে দায়িত্ব নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সবার উচিত সবাই মিলে সব মাকে তার নিজ নিজ সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন করা। কারণ মায়ের দুধই হচ্ছে নবজাতকের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ খাবার।
লেখক : সাংবাদিক।

বাংলা সাহিত্যে রোজা
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬

আল মাহমুদের গল্পে প্রেম ও প্রকৃতি
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫

প্রেরণার বাতিঘর : আল মাহমুদ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪

বাবারা এমনই হয়
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৩