প্রাকৃতিক নিসর্গের কোলে লাল পাহাড়ের লাউ চাপড়া
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৮
॥ আলম শামস ॥
আমার অনেক শখের মাঝে বেড়ানো বা ভ্রমণ করা অন্যতম প্রধান শখ। চলমান বাস্তবতায় সময় বের করা খুব দুষ্কর। তারপরও হাতে একটু সময় পেলেই বেরিয়ে পড়ি ভ্রমণে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাহাড়িকা সবখানেই আমার ভালো লাগে। তবে সবচেয়ে ভালো লাগে পাহাড় ও সমুদ্র। তাই তো সুযোগ পেলেই ছুটে চলি প্রাকৃতিক নিসর্গের কোলে। গত কয়েকদিন আগে বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছিলাম ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী জামালপুর জেলার নয়ন জুড়ানো লাল পাহাড়ের লাউ চাপড়া। জায়গাটির নান্দনিকতা, কোমল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা শতভাগ। দেহমনে এক অন্য রকম প্রশান্তি এনে দেয়। লাউ চাপড়ায় রয়েছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো পাহাড়িকা। জামালপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ টাওয়ার। যেখান থেকে গভীর বনসমৃদ্ধ গারো পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজের ঢেউ। আরও রয়েছে গারো আদিবাসীদের গ্রাম দিগলাকোনা। গ্রামের মাতব্বরের নাম প্রীতি সন সারমা। অতিথিপরায়ণ মাতব্বর সাহেবের দেয়া জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে একটি আবাসিক হোস্টেল। যার নাম সাল গিত্তাল, এর অর্থ হচ্ছে নতুন সূর্য/নবদিন। খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্মের সত্তরজন গারো শিশু সেখানে লেখাপড়া করে, যাদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। হোস্টেল ইনচার্জ রেখা দিদির সঙ্গে কথা বলে জানা হলো কত কষ্ট করে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সাল গিত্তাল হোস্টেলটিকে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এত কষ্টের পরও নিয়মানুবর্তিতায় পরিচালনা করতে পেরে রেখা দিদির চোখে-মুখে তৃপ্তির হাসি। শিশুদেরও যথেষ্ট উৎফুল্ল মনে হলো। শিশুদের স্নেহ-মমতায় এমনভাবে নিজেকে জড়িয়েছে, কখন যে নিজের বিয়ের বয়স পার হয়েছে টেরই পায়নি সে! দীর্ঘ আলাপচারিতা ও কফি পর্ব শেষ করে বিদায় নিলাম আমাদের রিসোর্টের দিকে। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে জোনাকি পোকার আলো সম্বল করে মেঠো পথে হেঁটে চললাম। রিসোর্টে এসে বারবিকিউর আয়োজন হলো। সাদা মনের আক্তারও ভাবে থাকা এমরানের রেসিপিতে পাহাড়ি মোরগের বারবিকিউ মজা করে খাওয়া হলো। পাহাড়ের পাদদেশের রাত যে এত সুন্দর তা পূর্ণ উপলব্ধি করা গেল দৈবক্রমে জেনারেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায়। বারবিকিউ শেষে আবারও ছুটলাম সুউচ্চ টাওয়ারের চূড়ায় ওঠার জন্য। উদ্দেশ্য পাহাড়ের বুকে রাতের নীরবতা উপভোগ করব। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টর্চের আলোও ক্ষীণ। টাওয়ারে ওঠার গেট লক, তাই গ্রিল বেয়ে প্রবেশ করতে হলো। লম্বা ও ভারী দেহের জন্য কিছুটা কষ্ট হলো, তবুও আনন্দ পেলাম। চূড়ায় বসে নির্মল বাতাসে সারা দিনের সব ক্লান্তি নিমিষেই মলিন হলো। কখন যে ঘড়ির কাঁটা রাত ২টা ছুঁই ছুঁই হলো টেরই পাইনি। হঠাৎ শীতল হওয়ায় আমাদের টনক নড়লো। এবার রিসোর্টে ফেরার পালা। স্মৃতি হয়ে রইল অমাবস্যা আঁধার রাতে পাহাড়ের আঙ্গিনায় এক অন্যরকম নীরবতা।
যেভাবে যাওয়া যায় : লাউ চাপড়া জামালপুর জেলায় হলেও শেরপুর দিয়ে যাওয়া সহজ। ঢাকার মহাখালী থেকে শেরপুরগামী বাস, সেখান থেকে যেকোনো যানবাহনে লাউ চাপড়া যাওয়া যায়। খরচ পড়বে দুদিনের জন্য জনপ্রতি প্রায় আড়াই হাজার টাকা। লাউ চাপড়া সড়ক উন্নয়ন হলে মায়াময় নির্মল বাতাসের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগম বাড়বে। সেইসঙ্গে উন্নতি হবে স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের আর্থিক সচ্ছলতা।
যা যা দেখা যাবে : পাশেই শেরপুর জেলার বিনোদন কেন্দ্র গজনি অবকাশ ও মধুটিলা ইকো পার্ক। নিজস্ব যানবাহন না থাকলে ভাড়ায় খাটা মোটরসাইকেল অথবা অটো। ভাড়া দরদাম করে নেয়া ভালো। রাতে থাকার জন্য শহরে রয়েছে হোটেল সম্পদসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল। সময় সুযোগ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও। লেখক : সাংবাদিক।
E-mail : [email protected]