মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি উপনিবেশবাদ নাকি ভূরাজনীতি?


২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৫২

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
মধ্যপ্রাচ্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভূরাজনৈতিকভাবে অতি সংবেদনশীল এক অঞ্চল। দশকের পর দশক ধরে চলা দ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এ অঞ্চলকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি তাদের বৈশ্বিক নিরাপত্তা নীতি ও জ্বালানি স্বার্থের অন্যতম প্রধান উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উৎপত্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সাথে সম্পৃক্ত, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা কৌশলগত গুরুত্বের কারণে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের পর নির্ভরশীল হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঠাণ্ডা যুদ্ধের আগমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহ দেয় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এবং অন্যান্য স্থানে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করার জন্য।
অন্যদিকে ইরান-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য যেন পরিণত হয়েছে এক বিস্ফোরণভূমিতে, যেখানে আগুন জ্বলছে শুধু ভূখণ্ডে নয়- জ্বলছে ইতিহাস, রাজনীতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও। আর এ সংকট-নির্মাণের মূল কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটি।
বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, ইরাক, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি শুধু যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্র নয়; বরং প্রশিক্ষণ, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাঘাঁটির যাত্রা
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ১৯৫৮ সালে প্রথম মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয় মধ্যপ্রাচ্যে। সে সময় লেবানন সংকটে বৈরুতে প্রায় ১৫ হাজার মেরিনসেনা পাঠানো হয়েছিল। ১৯৯০ সালের গাল্ফ যুদ্ধ একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের হাজার হাজার সেনা সৌদি আরব এবং অঞ্চলের অন্যান্য মিত্রদের কাছে পাঠায়। তবে যুদ্ধ শেষ হলে অনেকেই চলে যায়, আর কিছু কিছু সেনা থাকে চলমান আগ্রাসন প্রশমন এবং তেলের বাজারের সরবরাহ নিশ্চিত করার নামে। এরপর ক্রমশ অঞ্চলটির অন্যান্য দেশে সামরিক ঘাঁটি গাড়তে থাকে মার্কিন সেনারা। রয়টার্স, আল-জাজিরা এবং সেন্টকমের তথ্যানুযায়ী ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রায় ১৯টি ঘাঁটিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। অঞ্চলজুড়ে বৃহৎ, স্থায়ী এবং ছোট উভয় ধরনের ঘাঁটি বিদ্যমান। সবচেয়ে বেশি মার্কিন সেনা থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এব সৌদি আরব।
আল-উদিইদ বিমানঘাঁটি : কাতার
প্রায় ১০ হাজার সেনা নিয়ন্ত্রণকারী কাতারে অবস্থিত আল-উদিইদ বিমানঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি। ৬০ একর এলাকাজুড়ে এই ঘাঁটি স্থাপিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ঘাঁটি। এখানে অন্তত ১০০ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ড্রোন, বোম্বারসহ উন্নত যুদ্ধযান সক্রিয় থাকে। মার্কিন বিমানবাহিনীর ৩৭৯তম এয়ার এক্সপিডিশনারি উইংও এ ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় এ ঘাঁটি কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের কাজ করে। এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ফরওয়ার্ড সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় এই ঘাঁটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন এবং গত ৫ জুন ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর প্রকাশিত ছবিতে ‘সি-১৩০ হারকিউলিস ট্রান্সপোর্ট’ (একটি বিশেষ সামরিক পরিবহন বিমান) ও ‘রেকোননাইসেন্স প্লেন’ (বিশেষ সামরিক বিমান, যা আকাশপথে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়)-সহ ৪০টি বিমান দেখা গিয়েছিল। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পরে সেখানে মাত্র তিনটি বিমান দেখা গিয়েছিল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি ওয়াশিংটন আল উদিইদের রানওয়ে থেকে কয়েক ডজন বিমান প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানের সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করার জন্যই সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এখানে একটি নতুন সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সেল খোলা হয়েছে।
নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি, এনএসএ : বাহরাইন
বাহরাইনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি, এনএসএ (বাহরাইন) বর্তমান মার্কিন নৌঘাঁটিটি সাবেক ব্রিটিশ নৌঘাঁটি। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর যার নিরাপত্তা দায়িত্ব পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং কেনিয়ার দক্ষিণে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল অঞ্চলজুড়ে। প্রায় নয় হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এ ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’ ফ্যাসিলিটিতে। মার্কিন নৌবাহিনীর বেশ কয়েকটি জাহাজ এখানে রয়েছে। এ অঞ্চলের গভীর জলে ‘ইউএসএস কার্ল ভিনসন’-এর মতো ‘সুপারক্যারিয়ার’ জাহাজ এবং অন্যান্য বিমানবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারে। এর মধ্যে চারটি ‘মাইন ক্লিয়ারেন্স ভেসেল’ (মাইন বিধ্বংসী জাহাজ) এবং দুটি লজিস্টিক সাপোর্ট জাহাজও রয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন কোস্টগার্ডের ছয়টি ‘র‌্যাপিড রেসপন্স বোট’সহ একাধিক জলযান রয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ক্যাম্প আরিফজান, আল সালিম ও বুয়িহরিং : কুয়েত
ক্যাম্প আরিফজান কুয়েত সিটি থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ১৯৯৯ সালে নির্মিত একটি প্রধান মার্কিন সেনাঘাঁটি।
মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তার মধ্যে কুয়েত অন্যতম। ক্যাম্প আরিফজান মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হেডকোয়ার্টার। এটি মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর ‘অপারেশনাল’ এবং ‘লজিস্টিকাল হাব’ হিসাবে কাজ করে। বিভিন্ন অভিযানের সময় সরঞ্জাম সরবরাহ করার জন্য প্রচুর পরিমাণে উপাদান মজুদ রয়েছে এই ‘হাব’-এ।
অন্যদিকে কুয়েতের আলী আল-সালিম বিমানঘাঁটিতে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮৬তম ‘এয়ার এক্সপিডিশনারি উইং’। বার্তা সংস্থা এএফপি এই ঘাঁটিকে ‘ওই অঞ্চলে যৌথ ও জোট বাহিনীকে যুদ্ধ শক্তি মোতায়েনের কেন্দ্রীয় বিমানঘাঁটি এবং প্রবেশদ্বার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া কুয়েতে ‘এমকিউ-৯ রিপার’সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনও রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ক্যাম্প আরিফজান ও আলী আল সালিমসহ কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বড় ঘাঁটি রয়েছে। আলী আল সালিম ইরাক সীমান্তের কাছে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি। এখানে আরও আছে ক্যাম্প বুয়িহরিং যেটি ইরাক ও সিরিয়ায় মোতায়েন হওয়া সেনাদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আল-আসাদ ও ইরবিল : ইরাক
ইরাকে আছে আইন আল-আসাদ নামের ঘাঁটি। এটি পশ্চিম ইরাকের আনবার প্রদেশে অবস্থিত। আরেকটি কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত ইরবিল বিমানঘাঁটি। এখান থেকে মার্কিন সেনারা; বিশেষ করে উত্তর ইরাক ও সিরিয়ায় কুর্দি এবং ইরাকি বাহিনীকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। বর্তমানে ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে তবে ওয়াশিংটন তাদের ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করার জন্য বাগদাদ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরাকের ঘাঁটি ‘ইসলামিক স্টেট’কে রুখতে আন্তর্জাতিক জোটের অংশ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ ঘাঁটিগুলো এবং এই দেশের অন্যান্য ছোট-খাটো ঘাঁটিগুলো ইরানের-মিত্র গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যদিও মার্কিন নৌবাহিনীর নতুন ও বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ভূমধ্যসাগরে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। জানা গেছে, দ্রুত সেটি ইরানের দিকে যাত্রা করবে। ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘাত শুরু হলে এ রণতরী থেকে ঘাঁটিগুলোকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ওপর আগ্রাসনের সময় ইরাকের ৫০০টিরও বেশি ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার সেনা মোতায়েন ছিল।
আল-দাফরা বিমানঘাঁটি ও জাবাল আলী পোর্ট : ইউএই
আল-দাফরা বিমানঘাঁটি (ইউএই), একটি কৌশলগত ঘাঁটি, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং যুদ্ধ বিমান অভিযানে সহায়তায় কাজ করে। এ ঘাঁটিতে এফ-২২ র‌্যাপ্টার স্টিলথ ফাইটারের মতো উন্নত বিমান, ড্রোন এবং এডব্লিউএসিএসসহ বিভিন্ন নজরদারি বিমান রয়েছে। এ ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮০তম এয়ার এক্সপিডিশনারি উইং রয়েছে। এটি দশটি বিমান স্কোয়াড্রন নিয়ে গঠিত এমন এক বাহিনী যেখানে ‘এমকিউ -৯ রিপার্স’-এর মতো ড্রোনও আছে। আমিরাতে আরও আছে জাবাল আলী পোর্ট। যদিও এটি কোনো স্থায়ী ঘাঁটি নয়, তবে এটি মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ততম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
সুলতান বিমানঘাঁটি : সৌদি আরব
রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণে অবস্থিত সৌদি আরব রয়েছে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি। এখানে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং থাড মোতায়েন রয়েছে। ২০২৪-২৬ সালের তথ্যানুযায়ী, এখানে দুই হাজারের বেশি মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
মুয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটি : জর্ডান
জর্ডানের আজরাক অঞ্চলে অবস্থিত আছে মুয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটি। এটি আইএসবিরোধী অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ‘টাওয়ার ২২’ নামক একটি ছোট লজিস্টিক ঘাঁটিও জর্ডানে অবস্থিত।
তানফ ঘাঁটি : সিরিয়া
সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর সূত্রপাত ২০১১ সালে ওই দেশে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের সময় থেকে। সিরিয়াজুড়ে বিভিন্ন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছে যারা আইএসের পুনরুত্থান ঠেকাতে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে।
ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে গত ২০২৫ সালের মে মাসে সিরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তার সরকার সিরিয়ার নতুন ‘ডি ফ্যাক্টো’ নেতা আহমেদ শারার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছে। গত জুন মাসে ওয়াশিংটন ওই দেশে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা আট থেকে কমিয়ে একটিতে নামিয়ে আনার কথা ঘোষণা করে। আহমেদ শারার নেতৃত্বে ২০২৪ সালের শেষের দিকে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়।
তুরস্ক-ইনসির্লিক বিমানঘাঁটি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক যৌথভাবে পরিচালনা করে এ ঘাঁটি। এটি মার্কিন নেভাল অস্ত্রগুলোর কেন্দ্র। পশ্চিম এশিয়ায় ন্যাটো ও আইসিস বিরুদ্ধে অভিযানকে সমর্থন করে এ ঘাঁটি।
এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে কিছু মার্কিন সেনাঘাঁটি আছে। বড় কোনো অভিযানের সময়ে সেখানে কয়েকগুণ সেনা বাড়ানো হয়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এর মতে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক মার্কিন ঘাঁটি থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ট্রাম্প বা ইসরাইলের হুঙ্কারে ইরান বিচলিত হবে না। কোনো আক্রমণেই শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা যাবে না।’
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের শক্তি বৃদ্ধি
২০২৫ সালের মার্চে ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়াগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে অতিরিক্ত ছয়টি বি-২ বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে পেন্টাগন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দিলে এখান থেকে ইরানে দ্রুত হামলা চালাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ‘আমরা যে দিয়াগো গার্সিয়ায় বোমারু বিমান মোতায়েন করেছি, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটা ইরানের ওপর নির্ভর করছে।’
পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা দিয়াগো গার্সিয়ায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটালিয়ন প্যাট্রিয়টসহ অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে। প্রয়োজনীয় অন্যান্য উড়োজাহাজও সেখানে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি উড়োজাহাজবাহী যুদ্ধবিমান রয়েছে। প্রতিটিতে রয়েছে কয়েক হাজার সেনা ও বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান।
মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন সেনারা ঘন ঘন হামলার শিকার হয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩ গাঁজায় ইসরাইলি হামলার পর থেকে লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা পণ্যবাহী ও সামরিক জাহাজে হুথিরা ১৬০টিরও বেশি হামলা চালিয়েছে। গাজায় ইসরাইলের হামলা বন্ধের দাবিতে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে দাবি হুথিদের।
ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আবারও এ মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করলে বা হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় প্রতিশোধমূলক হামলা হবে বলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছে ইরান সরকার। ২০২০ সালে বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার জেরে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল ইরান।
ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে ইয়েমেনের হুথিদের ক্রমাগত হামলার পর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ, ওই অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি জোরদার করা হয়।
স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী জিবুতি এবং তুরস্কের বড় ঘাঁটিগুলোও ব্যবহার করে, যা অন্যান্য আঞ্চলিক কমান্ডের অংশ হলেও প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অভিযানের সময় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
কেন এ অঞ্চলে সেনা মোতায়েন?
মার্কিন সেনারা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করলেও মূলত তারা ইজরাইল ও মার্কিনীদের স্বার্থ রক্ষা এবং স্বার্থবিরোধীদের ওপর নজরদারি এবং আগ্রাসন চালানোর জন্য এখানে সেনাঘাঁটি করে। যেমন ট্রাম্প ডিসেম্বর ২০২৫ ইয়েমেনের হুতিদের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব বোমা হামলায় ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে। উল্লেখ্য, সিরিয়া বাদে প্রতিটি দেশের সরকারের অনুমতি রয়েছে মার্কিন ঘাঁটির বিষয়ে। ইরাক ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে, মার্কিন সেনারা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে অবস্থান করছে। আর কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি মিত্রদের আশ্বস্ত, প্রশিক্ষণ ও এ অঞ্চলে অপারেশনে প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়েছেন যে, ‘আমি ইরানের হাতে পারমাণবিক বোমা চাই না। পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখার জন্য তাদের চুক্তি করতে হবে। তারা যদি চুক্তি না করে, তাহলে আমরা ইরানে বোমা ফেলব। আমরা এমনভাবে বোমা হামলা চালাব, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।’
এমন এক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা গত ১৮ জানুয়ারি শনিবার ওমানের রাজধানী মাসকাটে বৈঠক শুরু করেছেন। এ বৈঠক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তির আলাপ শুরুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমাদের আশঙ্কা, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অন্য ১০টি দেশের মতো তারাও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা করতে চায়।
এদিকে ইরানে হামলা চালানোর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দেখা দেওয়ার পর সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি
মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য ওয়াশিংটনের মিত্ররা কখনো কখনো তাদের সেনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নেই।
প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের যত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তার প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারি, তেলক্ষেত্রের নিরাপত্তার নামে লুটপাট, ইসরাইলের জন্য ঢাল, নতুন ভূরাজনীতিতে চীন-রুশ বলয়, উপনিবেশবাদের নতুন রূপ এবং ইরানকে মোকাবিলা কেন্দ্র।
যুদ্ধ থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্য আর যুদ্ধ চায় না। রক্ত চায় না, গোলাবারুদের ঝলকানি চায় না, চায় শান্তি। হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের মাটি থেকে মার্কিন ঘাঁটি আবার উঠে গেলে তবেই এখানে শান্তির অঙ্কুর ফুটবে।
সূত্র : সৌদি গেজেট, আল-জাজিরা, রয়টার্স, US Central Command (CENTCOM), এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com