অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পরিমাণ কাক্সিক্ষত নয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৪
স্টাফ রিপোর্টার : সাভারে একটি পরিত্যক্ত ভবন থেকে বিভিন্ন সময় ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে একজন বৃদ্ধার পরিচয় পাওয়া গেলেও বাকিদের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। গত ১৯ জানুয়ারি সোমবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা প্রথমে নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেবের সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তার পায়ে গুলি করে। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলাকারীরা। এরপর লাঠি, রড, কাঠ- যা পেয়েছে, তাই দিয়ে পিটিয়ে ঘটনাস্থলে হত্যা করা হয় আব্দুল মোতালেবকে। অর্থাৎ সন্ত্রাসীদের হাত থেকে নিরাপদ নন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও খুনের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে যুক্ত হচ্ছে নির্বাচনী সহিংসতা। ফলে নির্বাচন সামনে রেখে মানুষের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করছে।
২০২৫ সালে দেশজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন হত্যার শিকার হয়েছেন, যা আগের ২ বছরের চাইতে বেশি। এর মধ্যে রাজনৈতিক হত্যা একশ’র বেশি। এ প্রেক্ষিতে নির্বাচনের পরিবেশ বিপন্নের শঙ্কা বিশ্লেষকদের। মাসওয়ারি নিহতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে আটজন, মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ২০ জন, এপ্রিলে ১০ জন, মে মাসে ৯ জন, জুন মাসে ১০ জন, জুলাইয়ে আটজন, আগস্টে ছয়জন, সেপ্টেম্বরে পাঁচজন, অক্টোবরে ছয়জন, নভেম্বরে আটজন এবং ডিসেম্বরে চারজন রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়াকে। আর ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে গুলি করে হত্যা করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে। সম্প্রতি রাজধানীতে গুলি করে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোছাব্বিরকে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এমন সব হত্যাকাণ্ড জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। আহত ৪ হাজার ৭৪৪ জন। পুলিশের তথ্য বলছে, গত বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৭৮৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৩২ আর ২০২৩ সালে খুনের ঘটনা ৩ হাজার ২৩টি। পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, নির্বাচন সামনে রেখে হত্যাসহ সব ধরনের সহিংসতা ও অপরাধ কমাতে তৎপর বাহিনী। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর পুলিশ কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণেই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। এসব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একটি মহল পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে পারে- বলছেন বিশ্লেষকরা। দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৩৫টি, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি। ডাকাতির মামলা হয়েছে ৭০২টি। আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। চুরির মামলা বেড়েছে ১২ শতাংশ (৯ হাজার ৬৭২টি)। অন্যদিকে অপহরণের মামলা বেড়েছে ৭১ শতাংশ (১ হাজার ১০১টি)। সব মিলিয়ে চার ধরনের অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৪১০টি, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। শুধু ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অবশ্য চুরি ও ছিনতাই বা দস্যুতার অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। সেই প্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে।
অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৪৬টি। এর আগেও অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা নগণ্য। এসব অস্ত্র কেন উদ্ধার হচ্ছে না, সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এজন্য সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভা গত ১৯ জানুয়ারি সোমবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে । সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত বছর ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় লুণ্ঠিত বিপুল অস্ত্র কেন উদ্ধার করা যাচ্ছে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। একাধিক বাহিনীর প্রতিনিধি বৈঠকে জানিয়েছেন, ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ লুট ও অবৈধ কয়েকটি অস্ত্র এবার পুকুরে পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছেও লুট হওয়া অস্ত্র আছে। এজন্য তারা অস্ত্রগুলো ভয়ে পুকুরে ফেলেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা খুবই কম। নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হারানো অস্ত্রসহ যে কোনো অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক লাখ সেনা সদস্যসহ মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে।