ঘণ্টায় ৫৬টির মৃত্যু হচ্ছে

গর্ভাবস্থায় মায়ের নানা রোগে অপরিণত শিশুর জন্ম হচ্ছে


২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৩

॥ হামিম উল কবির ॥
গর্ভাবস্থায় মায়ের নানা রোগে জন্ম হচ্ছে অপরিণত শিশুর। দেশে প্রতি ঘণ্টায় এ ধরনের ৫৬ শিশুর জন্ম হচ্ছে। সেই হিসাবে দিনে এক হাজার ৩৪০টি অপরিণত শিশুর জন্ম হচ্ছে। এ ধরনের শিশুর জন্ম কেবল জন্মকালীন ঝুঁকি নয়; দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সূচনা। মৃত্যু না হলে এসব শিশুর শ্বাসকষ্ট থেকে যায়। স্নায়বিক বিকাশে বিলম্ব ঘটে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে থাকে, কানে কম শোনার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শেখার সক্ষমতা কমে যায়। গবেষণা থেকে চিকিৎসকরা বলেছেন, শিশুটি বেঁচে গেলেও পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া মায়ের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান ও মানসিক চাপ অপরিণত শিশু জন্মে ভূমিকা রাখে। একটি অপরিণত শিশুর জন্ম শুধু একটি পরিবার নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘর্স্থায়ী স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। অপরিণত ও অকালীন শিশু জন্মের ক্ষেত্রে বিশ্বের ১০৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষে। বাংলাদেশে মোট জন্মের ১৬.২ শতাংশ অপরিণত শিশু জন্মে থাকে। নবজাতকের মোট ৩৫ শতাংশের মৃত্যু হয়ে থাকে অপরিণত শিশু হিসেবে জন্ম নেয়ার কারণে। গর্ভবতীকে সঠিক পুষ্টি দেয়া, উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং গর্ভের সময় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারলে অপরিণত শিশু জন্ম রোধ করা যায় অনেকটাই। কারণ ডায়াবেটিসকে বলা হয়, সকল রোগের মা।
অপরিণত শিশু জন্মের কারণ
বিশিষ্ট অবস্ট্রেটিকেল অ্যান্ড গাইনিকোলজিস্ট ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, গর্ভকালীন যেকোনো সংক্রমণ শিশুর ওপর প্রভাব পড়ে। এমনকি গর্ভকালীন সংক্রমণ সারিয়ে তুলতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকও শিশুর ওপর প্রভাব পড়ে। এ প্রভাবের কারণে অনেক সময় অপরিণত শিশুর জন্ম হয়ে থাকে। এছাড়া গর্ভকালীন মায়ের জরায়ুতে কোনো টিউমার থাকলে বা জরায়ু ছোট থাকলে অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে। মায়ের উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের অস্বাভাবিকতা, কিডনি সমস্যা, গর্ভাবস্থায় মায়ের ওজন বেড়ে গেলে; এমনকি অত্যধিক ওষুধ সেবন করলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে। চিকিৎসকরা বলেন, এসবই জানা কারণ এছাড়া অনেকগুলো অজানা কারণও রয়েছে, যেগুলো ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে হয়তো আরো গবেষণায় সঠিক কারণটা জানা যাবে।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী শিশু বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জন্ম নিলে সেই শিশুর নানাবিধ শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হয়ে থাকে। এর মধ্যে জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, স্বল্পতার ঝুঁকি অন্যতম। তিনি বলেন, অপরিণত নবজাতকের শরীরে তাপ কম থাকে। সে কারণে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কম থাকে। এদের মধ্যে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া বড় হলে এদের মধ্যে সেরিব্রাল প্যালসি (অস্বাভাবিক শিশু), মৃগীরোগ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর ঝুঁকি থাকে বেশি। মানসিক বিকাশও সঠিকভাবে হয় না এদের। ফলে লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে থাকে। এ শিশুরা অর্থনৈতিকভাবে কোনো অবদান রাখতে পারে না। বাংলাদেশে বছরে অপরিণত ও কম ওজন নিয়ে জন্মানো ২৪ হাজার ৯০০’র বেশি নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ধরনের নবজাতকের মধ্যে মেয়ের চেয়ে ছেলের সংখ্যা বেশি থাকে এবং অপরিত ছেলে নবজাতকদের মৃত্যু হারও বেশি।
অপরিণত শিশুর জন্মরোধের উপায়
সরকার নির্ধারিত বিয়ের বয়স মেনে চলা, কিশোরী মায়ের সন্তানও অপরিণত হয়ে থাকে। গর্ভকালীন মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। গর্ভকালীন মাকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ালে গর্ভজাত শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। গর্ভকালীন কমপক্ষে চারবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং ডাক্তার যেসব পরীক্ষা দেন, সেই পরীক্ষাগুলো করে ডাক্তারকে দেখানো এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা উচিত। এ সময় মাকে আয়রন রয়েছে এমন খাবার খাওয়াতে হয়। তাছাড়া আয়রন রয়েছে এমন ওষুধের সাথে ভিটামিন ডি দেয়া হয়। তাছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স জাতীয় সাপ্লিমেন্টও দিতে পারেন। কারণ গর্ভকালীন অনেক সমস্যা হয়ে থাকে মায়েদের। বিশেষ করে গর্ভকালীন মায়েদের উচ্চরক্তচাপ বেশি থাকে, আবার রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এসবই পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে। তাছাড়া নিয়মিত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। গর্ভকালীন যে প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) তৈরি হয়, তাতে প্রচুর গ্লুকোজ তৈরি করে শিশুর জন্য। সেই গ্লুকোজের কারণে মায়ের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। ডায়াবেটিস অনেক রোগের কারণ হয়ে থাকে। এছাড়া গর্ভকালীন মায়ের শান্ত জীবনযাপন খুবই প্রয়োজন। মায়ের মন শান্ত থাকলে তা গর্ভস্থ শিশুর ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে, সুস্থ শিশু জন্মাতে সহায়তা করে। এছাড়া গর্ভবতী হওয়ার আগে ও গর্ভকালীন প্রয়োজনীয় টিকাগুলো নিলে অনাগত শিশু সুস্থ হয়ে থাকে। অপরিণত শিশুর জন্মহার কমাতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত যথাযথ নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তদারকি বাড়াবে বলে ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন। অপরিণত শিশুরাও কম ওজন নিয়ে জন্মায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, জন্মের সময় আড়াই কেজি (২৫০০ গ্রাম) ওজনের কম হলে সেই শিশুকে লো বার্থ ওয়েট (এলবিডব্লিউ) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশে মোট জন্মের ২৩ শতাংশ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়। এ হার ভারতে ১৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪.৪ শতাংশ কিন্তু বাংলাদেশে ২৩ শতাংশ। বাংলাদেশে বছরে ৭ লাখ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায় এবং ৫ লাখ অপরিণত শিশুর জন্ম হয়ে থাকে। এ শিশুদের ৫ শতাংশ যথাযথ ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় না।
অপরিণত শিশু জন্মের পর করণীয়
অপরিণত শিশু জন্ম হয়ে গেলে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলে শিশু সুস্থ থাকে। নিউনেটালোজি ইউনিটের ডাক্তারের তত্ত্বাধানে নিউনেটালোজি আইসিইউ (এনআইসিইউ) রেখে চিকিৎসা নিলে শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। কারণ এ ধরনের শিশুর জন্মের পরপরই নানা ধরনের রোগ দেখা দেয়। সেখানে শিশুর রোগের লক্ষণ অনুযায়ী নিউনেটালোজিস্টরা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। বিশিষ্ট নিউনেটালোজিস্ট বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউনেটালোজিস্ট অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নান জানান, প্রথমেই চেষ্টা করতে হবে অপরিণত শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করা। তাছাড়া এ ধরনের শিশু জন্ম হয়ে গেলে এদের জীবন রক্ষায় মাতৃদেহের উষ্ণতায় নির্দিষ্ট সময় রেখে চিকিৎসা করা যায়। এ পদ্ধতিকে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) বলে। এ পদ্ধতিতে সব ধরনের চিকিৎসার পাশাপাশি শিশুকে মায়ের বুকের সাথে লাগিয়ে মায়ের বুকের উষ্ণতা দিতে হয়। এ পদ্ধতিতে শিশুকে মায়ের বুকের সাথে সারাক্ষণ জড়িয়ে রাখতে হয়। ডা. আব্দুল মান্নান বলেন, কেএমসি ছাড়াও হাসপাতালের স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ণ ইউনিটে (স্ক্যানু) সেবাও গুরুত্বপূর্ণ। কখন কোন সেবাটা শিশুর লাগবে তা নিউনেটালোজিস্ট বুঝবেন। এ পদ্ধতিতে অপরিণত ও স্বল্প ওজনের শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৬৮টি কেএমসি সুবিধাসংবলিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কেএমসি ইউনিটের সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও বেড়েছে। কারণ এ পদ্ধতিতে মায়েদের আস্থা বাড়ছে। একজন মা সেবা নিয়ে অন্যদের বলায় অন্যরাও তাদের অপরিণত ও কম ওজনের শিশু নিয়ে এসব কেন্দ্রে আসছেন। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো এ পর্যন্ত অপরিণত ও কম ওজনের শিশুদের ৫ শতাংশের কম এসব কেন্দ্রের চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ব্যাপারে অভিভাবক ও মায়েদের মধ্যে আরো বেশি সচেতনতা প্রয়োজন। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালে দেশে নবজাতকদের জন্য ৫৭টি কেন্দ্রে কেএমসি সুবিধা ছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪৬৮টিতে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে এক হাজার ৪৬২ মা তাদের শিশুদের নিয়ে এসেছিলেন কেএমসি সেবা নিতে। কিন্তু ২০২৪ সালে কেএমসি সেবা নিয়েছেন ১৯ হাজার ১৭৮ জন মা। তবে অপরিণত ও কম ওজনের নবজাতকদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ শিশু মানসম্পন্ন সেবা পেয়েছে বলে ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন।
শারীরিক সমস্যায় অপরিণত শিশুর জন্ম হচ্ছে এবং দেশে প্রতি ৫৬টি শিশুর মৃত্যু যে হচ্ছে, এটা বাস্তবতা। এ মন্দ বাস্তবতা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করছে। অপরিণত শিশুর জন্ম, মাতৃস্বাস্থ্যঝুঁকি, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের চাপ, পরিবেশদূষণ, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্রটি ফুটে উঠেছে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে সমস্যার ভয়াবহতা কোনোভাবেই কমবে না। এটা ভবিষ্যতের সুস্থ জাতি গড়ে ওঠার জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ মানবসম্পদ, জরুরি সেবা ও সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করণে সহায়ক এবং চিকিৎসা দিয়ে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধ করা যায়। অপরিণত শিশু যেমন সমাজে বোঝা, তেমনি অকাল মৃত্যু পরিবারে অশান্তি নেমে আসে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে একটি সুস্থ প্রজন্ম ও নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ তৈরি করা সম্ভব।