ভাবমর্যাদার সংকটে ভারত


১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১০

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
ভারত কি একটি গণতান্ত্রিক দেশ? একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ? প্রতিবেশীবান্ধব দেশ? বৃহৎ পুঁজির দেশ? সামরিক শক্তিতে বলীয়ান? কিংবা এরকম আরো কিছু? একযোগে এতগুলো প্রশ্নের উদয় হওয়ার অর্থ হলো দেশটি কি আদৌ একটি সফল রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হতে পারে?
ভারতের আকর্ষণ করার মতো কি কিছুই নেই? সাকুল্যে দুটি বা তিনটি দিক আছে। একটি হলো বিপুল জনসংখ্যা, যা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিতে একটি বড়োসড়ো ‘বাজার’ ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে রকমারি পণ্যের সওদাগিরি চলে। আরেকটি হলো বিপুলসংখ্যক ঐতিহাসিক স্থাপনা। সুলতানি, মোগল ও ইংরাজ স্থাপনা ছাড়াও আছে প্রাচীন সময়ের ডেকোরেটেড মন্দিরসমূহ। এছাড়া সামরিক দিক থেকে কিছু বাড়তি সুবিধা পেতে পারে তার পারমাণবিক বোমার জন্য।
ভারতের হাতে আছে পরমাণু বোমা। এ বোমা কাজে লাগানোর মতো মাত্র তিনটি দেশ। এগুলো হলো চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। তবে এরা সকলেই হলো একেবারে সংলগ্ন প্রতিবেশী। এরকম প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এ বোমার প্রয়োগ করা মানে নিজের ভূখণ্ডেও প্রতিক্রিয়া ও বিরূপ পরিস্থিতি টেনে আনা। কিন্তু এদিক থেকে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এর মধ্যে দুই প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তান উভয়ের কাছেই পারমাণবিক বোমা রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, ভারত তার কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারছে না। চীন, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ কারো সাথেই তার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়। কোনো না কোনো কারণে এসব দেশ ভারতের প্রতি অসন্তুষ্ট।
সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে ভারতের যে চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে, সেটি হলো হিন্দুত্ববাদীদের অন্যান্য জাতির ওপর নির্যাতন নিপীড়ন। মুসলমান নাগরিকরা তো বরাবরই অত্যাচার আর নিগ্রহের শিকার হয়ে আসছে। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিষ্টান ও দলিত শ্রেণিও এ নিপীড়নের খাতায় যোগ হয়েছে। এতে কেবল হিন্দু সাধারণ লোকজনই অংশ নেয়নি, সরাসরি প্রত্যক্ষভাবে ও নেপথ্যে থেকে ইন্ধন জুগিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। ব্যক্তি মানুষ তো বটেই, বর্ণ হিন্দুদের আক্রোশের শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে মসজিদ, মাদরাসা, খানকা প্রভৃতি। ইদানীং গির্জা বা চার্চও বাদ পড়ছে না। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বাংলা ভাষায় কথা বলা মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ ট্যাগ লাগিয়ে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আধুনিককালে এ সমস্ত ঘটনা দুনিয়াজুড়ে নিন্দাবাদ কুড়াচ্ছে। ভারত তার বৈচিত্র্যময় জনমিতি নিয়ে সকলের জন্য একটি নির্ভরতার জায়গা হতে পারতো। কিন্তু ভারত নিজেদের নাগরিকদের ওপর বিচিত্র উপায়ে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বের অগ্রসর মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ভীতির সৃষ্টি করে চলেছে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের সুষম অবস্থান বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাকা। কিন্তু ভারতের দাদাগিরি মনোভাব সেটি করতে পারছে না। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ‘মধুরতম’ সম্পর্কের কথা গৌরবের সঙ্গে উচ্চারণ করা হতো যে দেশটি নিয়ে, সেটি হলো বাংলাদেশ। কিন্তু সর্বশেষ মধুরতম দেশটিও ভারতের রাডারের বাইরে চলে গেছে। এটি বিশ্ববাসীর কাছে এক আলোচ্য বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভারতের সাবেক একজন কূটনীতিক তাঁর কূটনৈতিক পর্যালোচনা করেছেন এভাবে- ‘পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া চারটি নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে অপ্রতিরোধ্য করবে বলে যখন মনে হচ্ছিল, তখনই ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটলো। সেই পতন ঘটলো গণতন্ত্রের ঘাটতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর ছাত্র-বিক্ষোভের বিরুদ্ধে সহিংসতার ভারে। এর জন্য ভারত মোটেও প্রস্তুত ছিল না।’ বাংলাদেশে শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের বয়সও প্রায় দেড় বছর হতে চললো, কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারলো না। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশকে একটি দলের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল ভারত। কিন্তু সাধারণ ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলন সেই ‘নিশ্চিত’ অবস্থাকে প্রবলভাবে ‘অনিশ্চিত’ করে দিয়েছে।
আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে চিরবৈরিতার কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশ অন্তত তিনটি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং বহুসংখ্যক প্রক্সি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। দুই দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য দুই পক্ষই পরস্পরের প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ে চলেছে গত পৌনে এক শতাব্দীজুড়ে। বস্তুত কাশ্মীর সীমান্তে নিয়ন্ত্রণরেখা (যুদ্ধবিরতি রেখা) বরাবর দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় গুলিবিনিময় স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন এই সম্পর্ক বলতে গেলে সাপে-নেউলের মুখোমুখি অবস্থানের রূপ নিয়েছে।
নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক খবরাদির বয়স খুব বেশি নয়। তবে নেপালে রাজতন্ত্রের স্থান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বদলে যাওয়ার পর থেকে এ সম্পর্কের পারদ ব্যাপক ওঠানামা করতে থাকে। চীনাঘেঁষা বামপন্থী সরকার বনাম ভারতঘেঁষা নেপালি কংগ্রেসকে ঘিরেই প্রধানত এ ওঠানামার খেলা চলতে থাকে। গত ২০১৫ সালের নভেম্বরে একটি ঘটনা ভারত ও নেপালের মধ্যে শীতল উত্তেজনার স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে। ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে ‘অবজ্ঞা’ করার নীতি নিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে নেপালকেও আলাদাভাবে বিচার করতে ব্যর্থ হয়।
একদা যে ভুটান ভারতের আস্থাভাজন ও প্রায় অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত ছিল, সেই ভুটানও ভারতের সঙ্গে টানাপড়েনের সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে। হিমালয় রাজ্য ভুটান এবং ভারতের প্রজাতন্ত্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে ঘনিষ্ঠ এবং উভয় দেশই একটি ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নিয়ে নিশ্চিত ছিল। ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যে ভারত প্রভাবশালী। কিন্তু ১৯৭১ সালে এই সম্পর্কে চিড় ধরে। এর পেছনে অবশ্য চীনের অংশীদারত্ব রয়েছে। সেসময় বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারত, ভুটান ও চীনের সীমানা যেখানে মিশেছে, সেই ‘ডোকলাম’ উপত্যকায় অব্যাহত সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লি ও থিম্পুর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনদিকে গড়াচ্ছে, তা নিয়ে ভারতের মধ্যেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ভারত ও ভুটানের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ প্রায় ৭০ বছরের পুরনো, কিন্তু সেই সম্পর্কে চীনের ছায়া পড়ছে বলে সম্প্রতি ভারতেই অনেক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক মনে করছেন।
চীনের সমকক্ষ না হলেও পৃথিবীর দুই বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চীনের অবস্থান ভারতের জন্য বরাবরই অস্বস্তিকর হয়ে রয়েছে। একে ‘ঠেলাঠেলি’র সম্পর্ক বলা চলে। ১৯৬২-র চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের বড়রকম ‘মার খাওয়া’ থেকে আজ অবধি অরুণাচল ও লাদাখে অবিরাম পাল্টাপাল্টি দুনিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করে আসছে। এর আগে তিব্বত নিয়ে বিরোধ ভারত আর এগোতে দেয়নি। এ সুবৃহৎ ভূখণ্ডের ওপর চীনের দাবি ভারত হজম করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও তিব্বতের নেতা দালাইলামাকে দিল্লি আশ্রয় দিয়ে রেখে চীনের জন্য অস্বস্তি স্থায়ী করে রেখেছে। অন্যদিকে অরুণাচল রাজ্যের একটা বড় অংশকে তিব্বতের অংশ বলে চিহ্নিত করে চীন এর ওপর তাদের দাবি অব্যাহত রেখেছে।
ভারত মহাসাগরের আরেক সমুদ্র-প্রতিবেশী মালদ্বীপ নিয়েও স্বস্তিতে নেই ভারত। প্রায় সম্পূর্ণ মুসলিম জনঅধ্যুষিত মালদ্বীপে নির্বাচন হলো কিছুদিন আগেই। নির্বাচনের ফলাফলও ছিল ভারতের জন্য অপ্রত্যাশিত। সেখানেও প্রায় বাংলাদেশের মতো একই ভুল করেছিল ভারত। প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুইজ্জুর বিশাল জয়ের জন্য নয়াদিল্লি প্রস্তুত ছিল না। তাই তার সঙ্গে আগে থেকে কোনো সংযোগও গড়ে তোলেনি। ভারত তখন প্রেসিডেন্ট নাশিদকে জোট গড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে পরামর্শ দিতে দ্বিধা করেনি। তবে নাশিদ সেই পরামর্শ শোনেননি। পরে তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ হারাতে হয়। নভেম্বর ২০২৩-এ মালদ্বীপের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মুহাম্মদ মুইজ্জু দায়িত্ব নেয়ার পর, মালদ্বীপ ভারতনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ভারত ও মালদ্বীপ সরকারের প্রধানরা পরস্পরের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগ তুলে ‘অবমাননাকর মন্তব্যে’ জড়িয়ে পড়েন।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা লাভের পর বেশ কয়েকটি স্বাধীন রাজ্যকে জোরপূর্বক দখলে নিয়ে নেয় ভারত। অতঃপর শাসনক্ষমতায় আসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী চরম মনোভাবপন্ন রাজনীতি ও সামাজিক মতাদর্শ কেবল তার অভ্যন্তরেই নয়Ñ প্রতিবেশীদের ওপরেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া করেছে। গুজরাট দাঙ্গা, গো-হত্যা ইস্যু, অখণ্ড ভারত গড়ার স্বপ্ন ছাড়াও দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ও নির্বাচন ব্যবস্থায় সরাসরি হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার পালাবদলে নাক গলানোর চেষ্টা প্রভৃতি বিষয়াবলী প্রতিবেশীদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে- এটা গোপন কিছু নয়। আর সাধারণভাবে ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে আয়তন, জনসংখ্যা এবং আর্থ-সামরিক শক্তি দিয়ে বিচার করে একপ্রকার ‘অবজ্ঞা’ করার নীতি নিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই নীতিই তার জন্য বুমেরাং হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে।
বহির্বিশ্বে ভারতের অবস্থান
বহির্বিশ্বে ভারতের অবস্থান সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও ভারতের অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ ও বিচক্ষণ বলে মনে হচ্ছে না। একসময় বিশ্বমঞ্চে ভারতের একটা অবস্থান ছিল। কিন্তু এখন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভারতের প্রভাব পড়ছে না। যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখে, যা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়। এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবল টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে গেছে। ভারতের ওপর অতিমাত্রায় চড়া শুল্ক চাপিয়ে দেয়ার হুমকি আসছে। মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাত্র দুদিন পর দুটি মার্কিন সামরিক বিমানে ২২৮ ভারতীয়কে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে নারী, শিশু, নবজাতকও ছিল। এ ভারতীয়দের হাত-পা শিকলে বাঁধা অবস্থায় ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এটি দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করে।
অনেকে মনে করছেন, ভারত এখন নীতিকে বিসর্জন দিয়ে স্বল্পমেয়াদি লাভ খুঁজছে। ফলে দেশের বিদেশনীতি দুর্বল ও অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ছে। রাশিয়ান জ্বালানির ওপর ভারতের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং বিকল্প উৎস না থাকা তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়া থেকে তেল কিনলে ভারতকেও ‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’ বা পরোক্ষ শুল্কের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। এটি ভারতের জন্য বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ রাশিয়া বর্তমানে ভারতের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী। এর আগে কানাডায় ভারতীয় শিখ জনগোষ্ঠীর অবস্থান এবং নানা ঘটনায় ভারত-কানাডার সম্পর্ক জটিল অবস্থায় নিপতিত হয়।
দিল্লির আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ের একজন গবেষক মনে করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে সম্প্রতি দেশ দুটি সফর করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জটিল এ সংকট সমাধানে ভারত একেবারেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজেকে এতে যুক্ত করেছে। কিন্তু দূতিয়ালি করতে গিয়ে ভারত যে কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি তা বলাই বাহুল্য। বরং এতে ভারতের স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানে ইসরাইলি হামলার সময় ভারতের অবস্থান নিয়েও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। মধ্য এশিয়ার কোনো কোনো দেশের সঙ্গে ভারতের অবস্থানও নড়বড়ে অবস্থার সৃষ্টি করে।
একসময় ভারতকে মনে করা হতো একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে গণতন্ত্র, সম্পদ ও চীনকে টেক্কা দেয়ার সক্ষমতা যার আছে। কিন্তু মোদির ১০ বছরের নেতৃত্বে ভারতের এ ভাবমর্যাদা অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান দেখে এখন মনে হতে পারে, এটি ক্রমেই সেসব দেশের কাতারে যাচ্ছে, যারা সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব বিশ্বপ্রভাব অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে ভারত ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারত একরকম নরম ও আত্মসমর্পণমূলক পথ বেছে নেয়। নিজের সার্বভৌম স্বার্থ জোরালোভাবে তুলে ধরার বদলে তারা যেন ওয়াশিংটনকে খুশি রাখতেই বেশি আগ্রহ দেখায়।
ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপের বিরুদ্ধে মোদি সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল ও অনিশ্চিত। ভারত যেন পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে, বিশাল জনসংখ্যা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাহসিকতা প্রশ্নে তারা দ্বিধায় ভোগে।
একজন বিশ্লেষক বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ভারত নিজেকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে মনে করে বাস্তবতা বলে, সেরকম কিছু অতীতেও ছিল না, এখনো তা হতে পারেনি। ১৯৫০-এর দশক; এমনকি ১৯৯০-এর দশকের চেয়েও ভারত এখন অনেক বেশি ‘অসুবিধাজনক’ অবস্থানে আছে। ভারতের আগের পররাষ্ট্রনীতির ভুলত্রুটি ও পদক্ষেপ নিয়ে অতীতে নানা ধরনের সমালোচনা হতো। সেসব ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

সরদার আবদুর রহমান