ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং রুখতেই হবে
১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫
আধুনিক দুনিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারপ্রধান ও সরকার গঠন এবং আইনসঙ্গত বিরোধীদল গঠনের সর্বোত্তম পদ্ধতি বলে গণতন্ত্র বা জনগণের অংশগ্রহণে ভোটকে গণ্য করা হয়। বংশানুক্রমিক ধারা কিংবা যুদ্ধ করে শক্তির জোরে জনগণের শাসক এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করার যুগ শেষ হয়েছে। কিন্তু শক্তি এবং বুদ্ধির খেলার মারপ্যাঁচের দিন এখনো শেষ হয়নি, বরং আরো আধুনিক হয়েছে ও হচ্ছে। এখন আর ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জোর করে সিলমারা, প্রতিপক্ষকে ভয়-ডর দেখিয়ে নির্বাচনে ভোট দান করা থেকে বিরত রাখা কিংবা ভয়-ডর অথবা অর্থের লোভ দেখিয়ে বাক্স ভরার মতো নির্বাচনে কারচুপির বিষয়টিও বড় সেকেলে হয়ে গেছে। এখন চলছে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিন। সহজ কথায় এক্ষেত্রে বাংলা ভাষার আপ্তবাক্য, ‘ওপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট।’
মানে ওপরে সবকিছু ফিটফাট দেখাবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ করা হবে, কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যাবে তাতে জনমতের প্রতিফলন নেই। নির্বাচন পরিচালনার সাথে যুক্তরা যাকে চেয়েছেন, তিনিই বিজয়ী হয়েছে। বিষয়টিতে সূক্ষ্ম কারচুপি বলা হলেও আসলে তা নয়, বরং ব্যাপক ডাকাতি। এমন ডাকাতি প্রতিরোধ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার আন্তরিকতা ছাড়া প্রতিরোধ করা অসম্ভব। রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন দেশ ও জনগণের সেবার মানসিকতা। যা সরকার ও বিরোধীদল যে কোনো বেঞ্চ বসেই করা সম্ভব। জনগণকে অবাধে ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত পুলিশ, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, আনসার, স্বেচ্ছাসেবক ও সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং ভোটগ্রহণ ও গণনার কাজে নিয়োজিত প্রধান নির্বাচন রিটার্নিং, প্রিসাইডিং, পোলিং অফিসার ও এজেন্ট সবার মধ্যে গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সাহস, কর্তব্যনিষ্ঠা ও আন্তরিকতা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য অপরিহার্য।
এমন নির্বাচনের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হিসেবে দেখা হয় ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনে জনগণ যে ব্যালট বাক্সে ভোট দিয়েছে, তা গণনা করা হয়নি। গণনা করা হয়েছে প্রিসাইডিং অফিসারের রুমে আগে থেকে ভরে রাখা বাক্সগুলো। তাই ভোটগ্রহণের আগে বাক্সগুলো ভালোবাসে পোলিং এজেন্টদের পরীক্ষা করার সুযোগ দিতে হবে। ভোটগ্রহণের পর সংরক্ষণ ও গণনাও করতে হবে তাদের সামনে। ডিজিটাল ক্যামেরায় বাইরে মনিটরের ব্যবস্থা করতে হবে। আগে থেকে ছাপানো ব্যালটে কেউ একসাথে একাধিক ব্যালট লুকিয়ে বাক্সে ফেলছে কিনা, তাও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নির্বাচন পরিচালনা এবং ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় থাকবেন এমন কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ‘দলকানা’র অভিযোগ থাকলে, তাকেই আগে বিরত রাখতে হবে। পরে প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। কমিশনার ও কমিশনের অন্য সদস্যদের নিরপেক্ষ ও আইনানুগ কঠোরতা অপরিহার্য। কোনো প্রার্থী আচরণবিধি ভাঙলে এবং কারো বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ এলে যথাযথ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। দেড় দশকেরও বেশি সময় এদেশের জনগণ ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিলো। যারা তাদের ভোটাধিকার বঞ্চিত করেছিলো, তাদের পরিণতি কী হয়েছে। তাই বার বার ভুল নয়। আসুন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে সবাই মিলে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে জনগণকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতা নির্বাচিত করার সুয়োগ দিই।