রাজনীতির চালচিত্র : একদিকে ভাঙাগড়া অন্যদিকে নির্বাচনী জোয়ার


১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭

॥ জামশেদ মেহদী ॥
একদিকে যখন বাংলাদেশে নির্বাচনী জোয়ার বইতে শুরু করেছে; তখন অন্যদিকে রাজনীতির আরেক পাশে অস্থির সময়ের আলামত দেখা যাচ্ছে। গত ২৯ ডিসেম্বর সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নমিনেশন পেপার সাবমিট করার শেষ দিন ছিল। শেষ দিনের আগের দিন অর্থাৎ ২৮ ডিসেম্বর রোববার ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক দেখার দিন। জুলাই বিপ্লবের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনের ঐক্য গড়েছে। জামায়াতের জোটে আরো যোগদান করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের একসময়ের দক্ষিণ হস্ত কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদের এলডিপি। পরদিন অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর দেখা গেল জামায়াত জোটে যোগদান করেছে আরেকটি দল। সেটি হলো, আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টি। এ নিয়ে জামায়াত জোটে যোগদানকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা হলো ১১টি। এর কয়েকদিন আগে জামায়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা কিশোরগঞ্জ থেকে বিএনপির টিকিটে ৩ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান।
ঐ দিকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জুলাই যুদ্ধের অন্যতম নায়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কয়েকদিন আগেই উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগ করে তিনি নীরব ছিলেন। গত ২৯ ডিসেম্বর সোমবার খবরে প্রকাশ, আসিফ মাহমুদ এনসিপিতে যোগদান করেছেন। তবে তিনি নির্বাচন করবেন না। কিন্তু দলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করবেন। আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও পদত্যাগ করেছেন। তবে তিনি ইলেকশনও করছেন না, আবার এ ভাষ্য লেখার সময় পর্যন্ত কোনো দলে যোগদানও করেননি। অন্যদিকে বিএনপি শেষ মুহূর্তে তার পূর্ব ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়েছে। আন্দালিব রহমান পার্থ ঢাকা-১৭ আসনে ইলেকশন করবেন বলে বনানী ও গুলশান এলাকায় তার অনেক বড় বড় রঙিন পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২৮ ডিসেম্বর তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তিনি নিজেই ঐ আসন থেকে দাঁড়াবেন। পার্থকে ভোলা থেকে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। পার্থ বিষণ্নবদনে এ সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য হয়েছেন। বিএনপির অন্যতম শীর্ষনেতা স্বয়ং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকেও তার পূর্ব ঘোষিত আসন থেকে সরে গিয়ে অন্য এলাকা থেকে নির্বাচন করতে হচ্ছে। তার আসনে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে মরহুম আব্দুল্লাহ আল নোমানের পুত্র সাঈদ আল নোমানকে। এরকম আরো পরিবর্তন রয়েছে। তবে বিএনপিতে এবার এমন কতিপয় ব্যক্তি যোগদান করেছেন, তারা যে নেহাত নমিনেশনের লোভে যোগ দিয়েছেন, তার প্রমাণের অভাব নেই।
বাংলাদেশের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি মুসা বিন শমসেরের পুত্র ববি হাজ্জাজ একসময় জাতীয় পার্টিতে জয়েন করেছিলেন। এরপর তিনি এনডিএম নামে নিজেই একটি দল বানান। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপির টিকিট পেয়েছেন। শর্ত ছিল, দল বিলুপ্ত করে সদলবলে বিএনপিতে যোগ দিতে হবে। ববি হাজ্জাজ তাই করেছেন। রাশেদ খান নুরুল হক নূরের গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে নমিনেশন পাওয়ার জন্য বিএনপিতে জয়েন করেছেন। এহসানুল হক ১২ দলীয় জোট বিলোপ করে বিএনপিতে জয়েন করে বিএনপির টিকিট হাসিল করেছেন। সমমনা জোটের ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ একটি টিকিটের লোভে সমমনা জোট ভেঙে দিয়ে বিএনপিতে জয়েন করেছেন। শাহাদত হোসেন সেলিম অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি থেকে বের হয়ে এসে তার নেতৃত্বে আরেকটি এলডিপি গঠন করেন। এবার একটি টিকিট হাসিল করার জন্য তার দল এলডিপি বিলোপ করে সদলবলে বিএনপিতে জয়েন করেছে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এভাবেই শুরু হয়েছে দল ভাঙা-গড়ার খেলা।
চিত্রের অপর পিঠে রাজনীতির উচ্চস্তরে চলছে ডিপ্লোম্যাসি বা কূটনীতির খেলা। আওয়ামী জামানায় শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদ এবং ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং আমেরিকা। শেখ হাসিনা বিতাড়িত হয়েছেন। কিন্তু পশ্চিমের এ মহলটির একটি অংশ আবার আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য পর্দার অন্তরালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে দেনদরবার করছেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক এ মিশন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে একাধিক বৈঠক করেছেন। মার্কিন কংগ্রেসের ৫ জন কংগ্রেসম্যান একই উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টার বরাবরে চিঠি দিয়েছেন। এসবই করা হয়েছে ইনক্লুসিভ ইলেকশন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের নামে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ, এসব পশ্চিমা তদবিরে বরফ গলেনি। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য হলো, শেখ হাসিনা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধীদল ছাড়াই যে তামাশার নির্বাচন করেছেন, তখন এসব পশ্চিমা মহল স্বৈরাচারের সমালোচনা করলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা একবারও বলেননি। অথচ আজ গণতন্ত্রের নামে, স্বচ্ছতার নামে, মানবাধিকারের নামে আওয়ামী লীগের জন্য তাদের প্রাণ জারে জার!
এ ব্যাপারে সবচেয়ে সোচ্চার ভারত। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং আমেরিকা ইনক্লুসিভ ইলেকশনের নামে আওয়ামী লীগের পক্ষে ওকালতিতে নামত না। তবে ভারতের বার বার অনুরোধ এবং চাপে নেমেছে। ভারত সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নাই। কীভাবে তারা শেখ হাসিনার ৩টি নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে এক বিরাট জালিয়াতি ও প্রহসন হলেও প্রকাশ্যে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন করেছিল, সেগুলো মানুষ এত সহজে ভুলে যাননি। সেই ভারত এখন উঠতে বসতে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য এমন কিছু নেই, যা তারা করছে না।
এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশে পর্দার অন্তরালে আরো কিছু ঘটনা ঘটছে, যেগুলো খুব ডিস্টার্বিং। গত ২৯ ডিসেম্বর সোমবার একটি বাংলা দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে, তার শিরোনাম, ‘তালেবান সরকারের কর্মকর্তা ঢাকায়, নানা আলোচনা’। খবরে বলা হয়েছে, “তালেবান সরকারের মধ্যম সারির এক কর্মকর্তার ঢাকা সফর নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চরমে। নিঃশব্দে বাংলাদেশ সফর করছেন আফগানিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাস্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের মহাপরিচালক (ডিজি) মোল্লা জাওয়ান্দি। তার পুরো নাম মোল্লা নুর আহমদ নুর। গত সপ্তাহ থেকে রাজধানীর উপকণ্ঠে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তিনি। সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্র তালেবান সরকারের কর্মকর্তার ঢাকা সফরের বিষয়টি পত্রিকা বিশেষকে নিশ্চিত করেছে। ওই সফরের প্রস্তুতি বা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের কোনো পর্যায়ে কারো সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও নিশ্চিত করেছে সেগুনবাগিচা।
স্মরণ করা যায়, গেল অক্টোবরে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারত সফর করেন। তার সফর নিয়ে তখন কেবল দিল্লি নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। তালেবান সরকারের এশিয়াবিষয়ক নীতিনির্ধারণে মোল্লা জাওয়ান্দিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। সূত্রের দাবি, বাংলাদেশে ‘বিশেষ সফরে’ তিনি ঢাকার একাধিক রাজনৈতিক নেতার সাথে বৈঠক করছেন।”
আলোচ্য খবর সম্পর্কে কেউ কোনো মন্তব্য না করলেও তার এ অঘোষিত সফরের ওপর গুরুত্বপূর্ণ মহলসমূহ সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন।
এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী খোদা বক্সের পদত্যাগ এবং আতাউর রহমান বিক্রমপুরী নামক এক ব্যক্তির গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা ফিরে ৩০০ ফিটের জনসমাবেশে তারেক রহমান একবারের জন্যও আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার নাম নেননি। অনুরূপভাবে তিনি ভারতের নামও উচ্চারণ করেননি।
এসব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে।
Email:[email protected]