শীতের বিচিত্র শোভা


৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৫৭

॥ সাদমান হাফিজ শুভ ॥
হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে শীত আসে। শীত আসে হিম কুয়াশার চাদর গায়ে, হেমন্তের বুক ছুঁয়ে, নিঃশব্দ পায়ে। প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে পড়ে তার মৃদু-কোমল স্পর্শ। আকাশের নীল চাঁদোয়ায় জড়ো হতে থাকে অতিথি পাখিরা। ঘরে-ঘরে শুরু হয় লেপ-কাঁথা বের করার তোড়জোড়।
ভোরের শিশিরবিন্দু আঁকে নিখুঁত ছবি। ঘাসেরা যেন শিশিরের মুকুট পরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আর রোদের ঝলক পেতেই জ্বলে ওঠে রূপালি আলো। তাতে আঁচল বিছিয়ে অনন্য মাত্রা যোগ করে এক ঝাঁক শিউলি ফুল। গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, জিনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, সূর্যমুখী, ডেইজি, কসমসÑ সব মিলিয়ে শীতের রাজ্যে জমে ওঠে এক রঙিন মিছিল। আর গুনগুনিয়ে স্লোগান দিতে থাকে মৌমাছিরা। দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ফুলের মাঠ যেন এক টুকরো সৌন্দর্যের নগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। হালকা ঝাঁঝালো আর মিষ্টি ঘ্রাণে বাতাসও খুশিতে গড়াগড়ি খায় তাতে। ক্ষেত-খামারের দিকে তাকালেই ভেসে ওঠে কৃষকের যত্ন আর পরিশ্রমের ফল। ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, শিম, টমেটো, গাজর আর মটরশুঁটিতে ক্ষেত-খামারগুলো ভরে ওঠে সবুজে-সজীবতায়।
প্রতিটি সকাল নিয়ে আসে মিষ্টি-মিষ্টি আমেজের চিঠি। গাঁয়ের পথে ঝুলে থাকা খেজুর রসের হাঁড়িগুলো তখন কানায় কানায় ভরে যায়। বাতাসে ভেসে আসে ম-ম ঘ্রাণ। একটুখানি স্বাদ নিতে মুখিয়ে থাকে মানুষজন। শিশুরা কৌতূহলী মনে কুড়িয়ে নেয় বাহারি ফল- কামরাঙা, জলপাই ও বরই। শৈশবের পাতায় যোগ হয় ওদের কিছু মধুময় স্মৃতি। ভাপাপিঠা, পুলিপিঠা, নকশিপিঠা, পাটিসাপ্টা আর দুধ চিতইয়ের ঘ্রাণে উঠোন-বাড়ি হয়ে ওঠে উৎসবের মঞ্চ। মায়ের হাতের পিঠা খেয়ে খুশিতে গদগদ করে ওঠে মন। আহা! কী যে মজা। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই ভেসে আসে হুক্কাহুয়া সুর। জমে ওঠে চা-গল্পের নিবিড় আড্ডা। চায়ের উষ্ণ ছোঁয়া আর এক চিমটি হিমেল হাওয়া মিলেমিশে হয় একাকার। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাডমিন্টনের আসরে চলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
পৌষ-মাঘজুড়ে চলে শীতের দাপট। বিশেষ করে মাঘ মাসে। বলা হয়ে থাকে- মাঘের শীতে বাঘও কাঁপে! দিনের শুরুর ভাগে নামে কনকনে শীত। জড়োসড়ো হয়ে থাকে মানুষজন। কোথাও খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যায় শীতার্ত মানুষকে। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে থাকে মাঠ, ঘাট, পথ, প্রান্তর সর্বত্রই। ব্যস্ত সড়কে ঘিরে ধরে দুর্ঘটনার আতঙ্ক। বাড়তি সতর্কতার সাথে এগোতে হয় চালকদের। সুয্যিমামার লাজ বেড়ে যায় বহুগুণ। ঘন কুয়াশার আড়ালেই যেন তার আনন্দের ঠিকানা। কখনো টিপটিপ করে ছড়িয়ে দেয় লাজুক হাসি। একমুঠো উষ্ণতায় প্রাণেপ্রাণে জাগে আনন্দের শিহরণ।
এত রূপ, রস আর আনন্দের ফাঁকে লুকিয়ে থাকে নীরব কষ্ট। শীতের কাঁপুনি কৃষান-মজুরদের জীবন আরও কঠিন করে তোলে। পথশিশুদের দুঃখ যেন তখন চরমে। গায়ে ছেঁড়াফাটা জামা, অসুখ-বিসুখ নিয়েই কাটে ওদের দিন।
ওদের ফ্যালফ্যালে চোখে জমে থাকে একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার আকুতি।
শীত এলে নদী হারায় তার চঞ্চল চেহারা। জেগে ওঠে ধু-ধু বালুচর। কোথাও অযত্নে পড়ে থাকে দু-একটা ডিঙি নৌকা। শুধু কী নদী? মানুষের ত্বকও হয়ে আসে রুক্ষ, শুষ্ক ও খসখসে। এছাড়া আনাচে-কানাচে শুরু হয় পাতাঝরা উৎসব। শীতের শেষভাগে শিমুল, পলাশ, সেগুন, সোনাইল, কড়ই- সবই যেন ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কোকিলের কুহুতানে আসে ফাগুনের আগুনঝরা হাসি। কমতে থাকে শীতের দাপট। ফের হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে শীত পালিয়ে যায় কোনো এক অজানা গন্তব্যে।