পরামর্শ


৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৮

॥ তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী ॥

‘ধ্যাৎ! শুধু শুধু হাতে একটা বোঝা বাড়াবো কেন?! তোরা আজকালের ছেলেপুলেরা একটু বেশিই বকবক করো। কোথায় একটু সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার পড়ছিলাম, পড়াটাই ভণ্ডুল করে দিলি’, এভাবে অনবরত বকতে লাগলেন তামজিদের দাদা।
বুড়ো হলে মানুষের মেজাজ এমনিতেই খিটখিটে হয়ে যায়; বিশেষ করে পুরুষদের। তার ওপর যদি তামজিদের দাদার মতো আর্মি অফিসার হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
ধবধবে সাদা কাগজে কলমের কালো কালি ছিটকে পড়লে যেমন ছোপ ছোপ দাগের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি সকাল থেকেই সাদা আকাশের মাঝে কালো কালো মেঘগুলো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করছে। দু-এক পশলা বৃষ্টিও হলো। তা-ও ক্ষণিকের। কিন্তু চারদিকে একটা থমথমে ভাব, অর্থাৎ আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস।
দিনের আলোকে গ্রাস করতে ছুটে আসছে গভীর অন্ধকার। একটু পরেই মাগরিবের আজানের ধ্বনি বেজে উঠবে। তামজিদ আর তার দাদা বের হচ্ছে মসজিদ পানে। হঠাৎ তামজিদ বলে উঠলো, ‘দাদা, একটা ছাতা সাথে করে নিলে ভালো হয়। আকাশের যে অবস্থা, হুট করে বৃষ্টি নামতে পারে।’
এ কথা শুনেই তেলে বেগুনের জ্বলে উঠলেন তার দাদা।
অন্দরমহল থেকে দাদী বেরিয়ে এসে বললেন, ‘কী হলো? এমন চেঁচাচ্ছেন কেন? বাইরে যেভাবে কালো মেঘ ধরেছে, তা দেখে তো আমিও বলি, একটু ছাতাটা হাতে করে নিয়ে যান। নইলে হয়তো রাতটা মসজিদেই কাটিয়ে দিতে হবে’।
তার দাদা গোমরা মুখ করে বেশ বিরক্তির সাথে বললেন, ‘এই তোমাদের জ্বালায় আর পারি না! দাদি-নাতি মিলে আমার পিছে লেগেছো।’
পরে তামজিদের পীড়া-পীড়িতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললেন, ‘কই?, ছাতাটা দাও দিকি বাপু’, ছাতাটা হাতে নিয়ে দাদা-নাতি এগিয়ে চললো মসজিদের দিকে।
গাছপালায় ছাওয়া ইট-খোয়ারের এবড়োথেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে এসে পৌঁছালো মসজিদে। মাগরিবের আজান সুর তুলে উঠলো মসজিদের মিনার থেকে।
সালাতের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি নামলো কাচের টুকরোর মতো। সালাত শেষে অনেকেই ছাতা না আনায় মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে চোখ কপালে তুলে তামজিদের সাথে তার দাদাও দাঁড়িয়ে আছেন। তার দাদা হেসে বললেন, ‘এ-তো ক্ষণিকের বৃষ্টি। কিছুক্ষণ পরই কেটে যাবে।’ তামজিদ তো তার দাদার ছেলেমানুষি দেখে হেসে কুটিকুটি। কিন্তু বৃষ্টি থামার কোনো নাম গন্ধই নেই।
মসজিদের পাশের দোকানগুলোয় ঝুলে থাকা চিপসের প্যাকেটগুলো বাতাসের ঝাপটায় এদিক-ওদিক দুলছে। গাছের প্রতিটি পাতার ডগা বেয়ে অজস্র মুক্তার মতো বৃষ্টির ফোঁটা ঝরছে। শেষে আর থাকতে না পেরে ছাতা মেলে দাদা তার নাতিকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। দাদার মুখে টুঁ শব্দটিও নেই। লজ্জায় ভাঙা মুখখানা তাঁর রাঙা হয়ে গেছে, নাতির দিকে তাকাতেও পারছেন না। বৃষ্টি কিন্তু নির্ঝরের মতো অবিরল ধারায় গড়িয়েই পড়ছে। এক হাতে ছাতা আরেক হাতে নাতিকে নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে আসতে আসতে ভাবতে লাগলেন- সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল আমাদের নবী সা.-কে পর্যন্ত মহান আল্লাহ বিভিন্ন বিষয়ে তার চেয়ে জ্ঞানে, বয়সে বা মর্যাদায় নিম্নস্তরের সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতে বলেছেন। যেমন- সূরা আলে ইমরানের ১৫৯নং আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কাজে কর্মে তাদের (সাহাবীদের) সাথে পরামর্শ করুন’।
আর আমি কী এমন মহাপণ্ডিত বনে গেলাম যে, নিজের নাতির পরামর্শটুকুও কানে তুলতে চাচ্ছিলাম না!