শহীদ শরীফ ওসমান হাদি দেশকে কী দিয়ে গেলেন আর কী নিয়ে গেলেন


২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:৫০

শহীদ শরীফ ওসমান হাদি

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মাত্র ৩২ বছরের তরুণ যুবক, টগবগে রক্তঝরা নেতা, আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্রের জালে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি খেয়ে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। দিয়ে গেলেন দেশকে চলার পথের পাথেয় ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার বার্তা। তিনি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার সমাজকে ন্যায়ের পথে চলা, সমাজে ইনসাফ কায়েম করার আবেগঘন আহ্বান। কারো কাছে মাথা নোয়ানো নয়, শির উঁচু করে দেশকে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে গেলেন। পতিত স্বৈরাচারের পাহাড়সমতুল্য বৈষম্য দুর্নীতি আর চাঁদাবাজি থেকে দেশ গড়ার জন্য আকুল আবেদন করে গেলেন শহীদ ওসমান হাদি।
বাবা-মায়ের ৬ ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার ছোট। ঝালকাঠি জেলায় জন্মগ্রহণ করে মাদরাসায় পড়াশোনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এই যুবক। বাবা মাওলানা। বড় ভাই মাওলানা। যিনি সেদিন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখ লাখ লোকের সামনে প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিত শহীদ ওসমানের জানাজা নামাজে ইমামতি করলেন। আবেগঘন বক্তব্যে শহীদ হাদির চরিত্র-মাধুর্য তুলে ধরলেন। সৎ, যোগ্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজহীন এক তরুণের জীবনচরিত্র। তিনি নাকি মাত্র ৮ মাসের বাচ্চার বাপ, চলে গেলেন আল্লাহর ডাকে। তাকে বাবা বলে ডাক শোনার ভাগ্য হলো না। স্ত্রী পর্দানশীন এক মহিলা। আমরা আশা করি, তিনি জান্নাতের সর্বোত্তম মাকাম পাবেন এবং সেখানে ছেলে, স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজনের সাথে তার দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ। আর দেশের ১৮ কোটি মানুষের অন্তরে রেখে গেলেন ভালোবাসার এক অনুভূতি। বাংলাদেশের শহর-বন্দরে, মক্কা-মদীনাসহ গোটা দুনিয়ায় যেখানেই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের দেশদরিদ জনতা আছে, সেখানেই গায়েবানা জানাজা হয়েছে, দোয়া হয়েছে, মানুষের চোখে পানি ঝরেছে। আগামীতেও এ শহীদ যুবকের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
দেশে গত ৫৪ বছরে অনেক দল ক্ষমতায় এসেছে আবার স্বেচ্ছায় অথবা জনগণের চাপে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। দেশ থেকে পালানোর ঘটনা সাম্প্রতিক স্বৈরাচার হাসিনা। দেশটাকে বাপের তালুক হিসেবে দেশের টাকা-পয়সা ফতুর করে নিজেও পালাতে বাধ্য হয়েছে জনতার রোষে। গত ২০ ডিসেম্বর শনিবার মানিক মিয়া এভিনিউতে শহীদ হাদির জানাজায় প্রমাণ হয়েছে লাখ লাখ জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানে ভরপুর ছিল- এক হাদি চলে গেল, লাখ লাখ হাদি বাংলাদেশে রয়ে গেল। তাই বলব, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি চলে গেছেন আমাদের থেকে অনেক দূরে না ফেরার দেশে। কী তার বৈপ্লবিক আদর্শ। চরিত্র, ভয়ভীতিহীন গর্জন আমাদের মাঝে ঘুরবে হাজার বছর ধরে।
তার জানাজায় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য, আমরা তোমাকে বিদায় দিতে আসি নাই, তোমার আদর্শ লাখ লাখ লোকের প্রাণের মধ্যে স্মরণ করার জন্য তোমার লাশকে মাঝখানে রেখে আমরা ওয়াদা করি- আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কারো কাছে মাথানত করবে না। আমরা স্বাধীনভাবে দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো। কারো চোখরাঙানিতে আমরা ভীত হবো না। সবার সাথে আমরা ভালো সম্পর্ক রাখবো, কারো প্রভুত্ব মেনে নেব না। এটাই শহীদ শরীফ ওসমান হাদির আদর্শ, যা তিনি আমাদের জন্য রেখে গেল। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। তার পরিবারের ধৈর্যধারণের তাওফিক কামনা করছি। দেশ ছেড়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও শহীদ ওসমান হাদির হত্যার ব্যাপারে কথা উঠছে। সঠিক বিচার এবং খুনিদের খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবও বিচার চেয়েছেন। এসবই শহীদ হাদির কর্মফলের স্বীকৃতি ও মহান আল্লাহর রহমত।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের উত্তরে দেওয়াতে শহীদ হাদীর প্রতি গভীর নজরানা পেশ করা হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি কী নিয়ে গেলেন মহান আল্লাহর কাছে। তিনি তার এই ৩২ বছরের ছোট জীবনে তার বক্তব্য, জ্ঞান-গরিমা, দেশের জন্য ভালোবাসা দিয়ে লাখকোটি মানুসের ভালোবাসা নিয়ে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। তিনি তার বক্তব্যে বার বার বলেছেন, তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। দেশ-বিদেশের টেলিফোন নাম্বার থেকে হুমকি দিচ্ছে। তিনি এও বলেছিলেন, ‘আমি যদি শহীদ হয়ে যাই, তবে তোমরা আমার এই ছেলেটার দায়িত্ব নিও। কত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন শহীদ ওসমান হাদি। তিনি দেশকে দিয়ে গেছে, অনেক বেশি আর নিয়ে গেছে, মানুষের ভালোবাসা। কাল কিয়ামতে অবশ্যই আমাদের সাথে তার দেখা হবে বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য পাওনা জান্নাতুল ফেরদাউস, ইনশাআল্লাহ। মানুষ হিসেবে এটাই কিন্তু আমাদের শ্রেষ্ঠ চাওয়া ও পাওয়া।
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে সাধারণ জনগণ তেমন কিছুই পায়নি। শুধুমাত্র পতাকা আমরা পেয়েছি। বৈষম্য দূর হয়নি। দুর্নীতি দূর হয়নি। চাঁদাবাজি দূর হয়নি মানুষে মানুষে ভালোবাসার ছায়া তৈরি হয়নি। ছোটদের স্নেহ, বড়দের শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি হয়নি। মারামারি ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগেই আছে। মানুষের প্রতি দয়ামায়ার পরিবেশ ত্যাগ করে মানুষকে কীভাবে ঠকানো যায়, তার পরিবেশ চলছে। আমরা এর প্রতিকার করতে চাই।
জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন সৎ, যোগ্য মানুষ তৈরির কারখানা খুলে স্কুল-কলেজ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানুষ গড়ার ব্যবস্থা করেছে। ফলে গ্রাম থেকে শহর-বন্দরে গ্রামের মেম্বার থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, এমপি, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের লোক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কাছে আছে। দেশ-বিদেশে দেশের হয়ে কাজ করার লোকও জামায়াতের কাছে আছে। শুধুমাত্র নিজের আখের গোছানো বা বুলেটপ্রুফ গাড়ি-বাড়িতে থেকে দেশের নেতা হওয়া যায় না। আমাদের উদাহরণ নবী-রাসূল, ৪ খলিফার রাষ্ট্রীয় জীবন। খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে তারা দেশ চালাতেন। রাতে ঘুরতেন কেউ না খেয়ে আছে কিনা। তাদের জীবনের মালিক যেহেতু ছিলেন মহান আল্লাহ আবার তার নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল মহান আল্লাহ পাকের। আততায়ীর হাতে জীবন দেয়ার রেওয়াজ আগেও ছিল, এখনো আছে। তাই বলে জনতার সেবা করবেন বুলেটপ্রুফ বাড়ি-গাড়ি নিয়ে, তা আমাদের মতো এ গরিব দেশে মানায় না। আবার কার দয়ার ওপর ভরসা করে আপনি আপনার নিজ দেশ চালাবেন, তাও আমাদের জনগণ পছন্দ করবে না।
এদিক থেকে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন পূর্বেই ৩০০ সিটে তাদের সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত লোক সংসদে প্রার্থী দিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে ইসলামের বাণী পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। জনগণের মধ্যে সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে। রিকশাওয়ালা, ফেরি করে পান বিক্রেতা, সেলুনের কর্মচারী থেকে দেশের আলেম সমাজ, ব্যবসায়ী সমাজ, আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ সব শ্রেণির মানুষ তাদের নেতা বানাতে চায় সৎ লোককে। যারা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে। দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু, জাকসু, চাকসু, রাকসুতে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের সৎ নেতা বানাতে গিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের বেছে নিয়েছে। ইতোমধ্যেই তারা ছাত্র-ছাত্রীদের বিপুল ভোটে জিতে সততার সাথে কাজ করে প্রশংসায় ভাসছে। আমরা এমন নেতৃত্বই চাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ইতোমধ্যেই মাদক ব্যবসা দূর করেছে। শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছে। তাই তো দেশের প্রশাসন ঘুরে দাঁড়িয়েছে যে এমন সততার নেতা পেলে দেশও ভালোভাবে চলবে। তাই আগামী নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত নেতা বানানোর প্রক্রিয়া চলছে।
জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যেই দেশের ৮ দলকে তাদের সাথে ভোটের বাক্স একটা করার উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করা যায়, খুব শিগগির ৩০০ আসনে তারা ভোটে মাঠে ঐক্যবদ্ধভাবে জোর প্রচেষ্টা চালাবে এবং সামগ্রিকভাবে ভোটে জিতে সরকার গঠন করবে, ইনশাআল্লাহ।
ভোটের শিডিউল ঘোষণার পরদিন শহীদ হাদি খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোটকে বাধাগ্রস্ত করার পাঁয়তারা করছে দেশীয় ও বিদেশি চক্র। আমাদের বুঝতে হবে এক ওসমান হাদিকে গুলি করে মারার ফল কী হয়েছে। তার জানাজায় যে লোক হয়েছে, তা শুধু বাংলাদেশেই নয়, দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান, আমলা, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ জানাজায় হাজির হয়ে জানান দিয়েছেন যে, এ দেশের মানুষ আর কারো আধিপত্য মানতে রাজি নয়। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমরা বাঁচতে চাই। শহীদ ওসমান হাদি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন- পরাধীন নয়, নিজ পায়েই আমরা দাঁড়িয়ে দেশ চালাতে চাই। কথিত বড় দলের নেতারা পাশের দেশের কৃপায় ক্ষমতায় যেতে চায়। হাদির জানাজায় লোকসমাগমে তাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তারা আবোল-তাবোল বকছে। আওয়ামী বয়ানে অসংলগ্ন কথা বলছেন, জনগণ তা আর খাবে না।
আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখেই আমাদের গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন চাই। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের ভূমিকা আরো জোরালো হতে হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে। জগণ আপনাদের সাথে আছে। নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্ত হাতে নির্বাচনের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্রের পাহারা দেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সর্বদলীয় ভোটকেন্দ্র পাহারা কমিটি করা যেতে পারে। থানা-জেলার প্রতিনিধিদেরও সততার সাথে কাজ করার দিকনির্দেশনা দিতে হবে। আইনের ব্যাঘাত হলে তৎক্ষণাৎ চাকরিচ্যুত করতে হবে।
আমরা শহীদ ওসমান হাদির দেখানো পথেই দেশকে দিতে চাই, নিতে চাই কম। আমরা আশরাফুল মাখলুকাত। জনতার সেবা করইে দুনিয়ায় শান্তিতে থাকতে চাই। আখিরাতে সীমাহীন শান্তির আশাতেই ইহলোক ত্যাগ করতে চাই। এভাবেই শহীদ হাদির জীবন সার্থক হবে বলে আমরা মনে করি।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।