কবির চোখে গণভোট
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৩৩
শহীদ সিরাজী একজন রাজনীতি সচেতন কবি। তিনি কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও গল্প লিখেছেন। তার লেখায় থাকে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এবার তিনি কলম ধরেছেন ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোট নিয়ে। কবি শহীদ সিরাজী, নিবন্ধটি পত্রস্থ করা হলো।- বি.স
দরজায় করা নাড়ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর নির্বাচন হতে চলেছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্ত লাভার স্রোত বেয়ে এসেছিল দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এরপর গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এটি বিপ্লবী সরকারও বটে। এজেন্ডা ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করে তার আইনি ভিত্তি প্রদান, পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার সরকারর খুনিদের দৃশ্যমান বিচার ও গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
গণভোট কী?
এ ব্যাপারে উইকিপিডিয়া বলছে, ‘গণভোট হলো একটি প্রস্তাব, যা আইন বা রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিনিধির পরিবর্তে ভোটারদের সরাসরি ভোট। এটি বাধ্যতামূলক হতে পারে, যার ফলে একটি নতুন নীতি গ্রহণ করা হয় অথবা পরামর্শমূলক হতে পারে, যা একটি বৃহৎ মতামত জরিপের মতো কাজ করে।’
যে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে তার শুরু ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে; সুইস ক্যান্টন অব গ্রুবুনডেনে থেকে। ১৭৯০ থেকে শুরু করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে অসংখ্য বার গণভোট হয়েছে।
মূলত গণভোট একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনো এক প্রস্তাবের ওপর ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ভোটাররা তাদের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে সরাসরি ভোট দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমত যাচাই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এ গণভোট।
বাংলাদেশে গণভোট
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ পর্যন্ত মোট তিনবার গণভোট হয়েছে।
১ম গণভোট : এটি হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। সেসময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা যাচাই ইস্যুতে। জনগণ রাষ্ট্রপতি এবং তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি ৯৮.৯% আস্থা রেখে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করেন।
২য় গণভোট : এ গণভোট হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য ছিল এ গণভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৪.৫%।
৩য় গণভোট : ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ৫ম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। তখন ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৫.২ %, যেখানে ৮৪.৩৮% ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেন।
যে প্রেক্ষিতে দেশে ২০২৬-এর গণভোট
এ গণভোটের প্রেক্ষাপট আমাদের জানা। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। যাকে বিপ্লবী সরকারও বলা হয়। তারা জাতীয় সংস্কার কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘদিন ধরে আলাপ আলোচনার করেছিল। তার আলোকে প্রধান উপদেষ্টাও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা নিয়ে তৈরি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছেন। তার ভিত্তিতে এখন জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
গণভোট অনুষ্ঠানের আরও একটি কারণ
শেষ মুহূর্তে এসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ চূড়ান্তকরণে দেখা দিয়েছে বিপরীত মত। ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পরও কয়েকটি সংস্কারের সুপারিশের অল্পকিছু বিষয়ে ভিন্নমত প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে, এসব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এখন তা বাস্তবায়নের উপায় কী? এজন্যই এখন গণভোট জরুরী হয়ে পড়েছে।
গণভোট ২০২৬
অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের দাবি ছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করা। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এটি অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে থাকবে চারটি বিষয়ে। একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণ মতামত জানাবেন।
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রের সংবিধান কার্যকরী নেই। সাংবিধানিক সরকারও নেই। রয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ের বিপ্লবী সরকার। এ বিপ্লবী সরকারকে বৈধতা দেয়া ছাড়া সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পথ নেই। এ বৈধতা না দেয়া হলে সাংবাদ সাংবিধানিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে। বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল এ ব্যাপারে একমত নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়নের রূপরেখা অনুমোদন করেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘জুলাই সনদ’ও আইনি ভিত্তি পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় সকলে গ্রহণ করেছে তবে কেউ কেউ তলে তলে বিরোধিতা করার চেষ্টা করছে। এ কারণে ভবিষ্যৎ সংস্কার কখনো বাধাগ্রস্ত হয় কিনা- এ প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। এটি খুবই সংবেদনশীল অবস্থা। সংস্কার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়া অনেকটাই নির্ভর করছে গণভোটের ফলাফলের ওপর।
গণভোট: হ্যাঁ বনাম না
এখন প্রশ্ন- যে গণভোট হতে চলেছে সেখানে ‘হ্যাঁ’ এর পরিবর্তে ‘না’ জয়ী হলে কী হবে?
১. এ কথা চূড়ান্ত সত্য ‘জুলাই সনদ’ দেশে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। পতিত স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করার একমাত্র পথ। যদি ‘না’ ভোট জয়ী হয়; তাহলে ছাত্র-জনতার রক্ত বৃথা যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে।
২. ‘না’ ভোট জয়ী হলে ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল ‘জুলাই সনদ’ মেনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না।
৩. নির্বাচিত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার ওপরই সংস্কার নির্ভর করবে।
৪. যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের দলের ম্যানিফেস্টোর আলোকে দেশ পরিচালনা করবে। যেমন বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা নিয়ে কাজ করবে; যা জামায়াতসহ অন্য দলগুলোর চাওয়ার সাথে মিলবে না।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাস না হলে গণভোট পাস হবে না। তার মানে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে।’ অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ার সেখানেই ইতি ঘটবে।
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে কী হবে?
যদি ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তাহলে বিজয় হবে জনতার, বিজয় হবে গণতন্ত্রের, বিজয় হবে গণবিপ্লবের। এ বিজয়ে অর্জিত হবে আরো অনেক প্রাপ্তি, যেমন-
১. জুলাই জাতীয় সনদের একমত হওয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হবে। ২. সংসদ নির্বাচনে জয়ী এমপিরাই এ কাজ করবেন। ৩. সংসদের অধিবেশন শুরুর ১৮০ দিন পর্যন্ত তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এর সদস্য হিসেবে পরিচিত হবেন। ৪. জুলাই সনদে একমত হওয়া বিষয়গুলোর আলোকে তারা সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনবেন।
মোটকথা, গণভোটের ‘হ্যাঁ’ জয়ের মাধ্যমে আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অন্যান্য ২০২৪’-এর শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ হবে। ২০২৪-এর গণবিপ্লব সংবিধানের সংযুক্ত হয়ে আইনি ভিত্তি লাভ করবে। এ গণবিপ্লবের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সকল কার্যক্রমও বৈধতা লাভ করবে। তাছাড়া সংস্কার হবে রাষ্ট্রের বিবিধ বিধিব্যবস্থা। পতিত স্বৈরাচারের বিচারও সম্পূর্ণ হবে, দেশ থেকে চিরতরে ফ্যাসিবাদের কবর রচিত হবে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে।
সুতরাং সকল ছাত্র-জনতা মিলে গণবিপ্লবের মাধ্যমে যেভাবে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল স্বৈরাচারকে, তেমনিভাবে দেশের সকল দেশপ্রেমিক নাগরিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করতে হবে। আর যেন কোনো খুনি হাসিনা সরকারের মতো স্বৈরাচার ফিরে আসতে না পারে, দেশকে যেন চাঁদাবাজ-লুটেরা, দখলদার, সন্ত্রাস, খুনি, ধর্ষণকারী মুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।