জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের ঐক্যই ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:০২
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
ফ্যাসিস্টদের পালানোর পরও ষড়যন্ত্রের জাল এখনো কার্যকর। যার প্রমাণ হলো বহু আকাক্সিক্ষত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর পৈশাচিকভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা। হাদি বর্তমানে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। ডাক্তাররা তাকে খুবই ক্রিটিক্যাল বলে মন্তব্য করেছেন। আমরা এ হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করি এবং সুষ্ঠু চিকিৎসা ও দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে ষড়যন্ত্রের মূলোৎপাটন করার দাবি করছি।
এ হামলা শুধু হাদির ওপর নয়, গোটা দেশের ওপর হামলা। নির্বাচনের ওপর হামলা। এ হামলাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দেশের স্বার্থে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। ছোট-খাটো মতভেদ ভুলে দেশের স্বার্থেই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। একসাথে ফ্যাসিস্টদের রুখতে হবে। দেশ বাঁচাতে হবে, দেশ সবার। আওয়ামী দুর্বৃত্তরা পালালেও তাদের দোসররা বসে নেই। তাদের জন্য আসে পাশের দেশের পরামর্শ এবং দেশ থেকে লুট করে নিয়ে যাওয়া টাকা দিয়ে দেশে অরাজকতা এবং নির্বাচনে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য জোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
টার্গেট করে নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র দেশে ঢুকছে এবং নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে প্রার্থীদের হত্যার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যই সব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে; সাথে সাথে প্রার্থীদের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবে নির্বাচন ব্যাহত করা যাবে না। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। দেশকে অনিশ্চয়তায় ফেলা যাবে না।
গত ১৭ বছর বছর দেশের জনগণ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেনি। এবারই প্রথম জুলাই বিপ্লবের পর জুলাই সনদ এবং এর আলোকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন প্রায়ই সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যালট পেপার দুই ধরনের ব্যবস্থা হয়েছে। জুলাই সনদের জন্য গণভোট রঙিন ব্যালট পেপার হবে। হ্যাঁ ভোট দিতে হবে, প্রচার চালাতে হবে জনগণের মধ্যে- যাতে হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হয়। জুলাই বিপ্লবের অংশীদার কেউই হ্যাঁ ভোট থেকে দূরে থাকবে না। সাথে সাথে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে তাদের মার্কায় ভোট দিতে হবে। দেশ যখন নির্বাচিত সরকার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখনই ওসমান হাদির ওপর পৈশাচিকভাবে গুলি করে হত্যার টার্গেট নেয় আওয়ামী ঘরানার ফয়সাল ও তার দোসররা। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, জুলাই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও দলকেও তারা টার্গেট করেছে গুপ্ত হত্যার মাধ্যমে তাদের দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়ার বা পঙ্গু করে দেয়ার।
যেহেতু ফ্যাসিস্ট হাসিনার ফাঁসির রায় হয়ে গেছে, আরও লোকের ফাঁসির রায়ের অপেক্ষায়। মিডিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জুলাই বিপ্লবের বিরোধীদের কার্যক্রম প্রকাশ হচ্ছে, তাই তারা বিচার কাজে বাধা সৃষ্টি করা, ভয় দেখানো এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যই ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রত্যক্ষ মদদে হত্যার রাজনীতি করে নতুন করে ফাঁদ পাতার ব্যবস্থা শুরু করেছে। ওসমান হাদির ওপর হামলা করে টেস্টকেস হিসেবে দাঁড় করেছে এবং তারা কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। আবার পালিয়ে যেতেও সক্ষম হয়েছে। যদিও আমাদের পুলিশ বাহিনী গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় গুলির আলামত দেখে আসামিদের ধরা যাবে বলে মনে হয়। আর যদি পাশের দাদাদের বাড়িতে চলে গিয়ে থাকে, তবে কূটনীতিকভাবে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে আমাদের দেশে থাকা ভারতের দূতকে ডেকে প্রতিবাদ করেছে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিলে ভারত খুব বেশিদূর এগোতে পারবে না।
আপনাদের মনে থাকার কথা, প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপে স্বল্পসংখ্যক মানুষ। ছোট দেশ তারপরও তাদের নির্বাচনের আগে মুহাম্মদ মইজ্জু প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ভারতের সৈন্য তাড়ানোর কথা বলে তাদের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এক মাসের মধ্যে ভারতের সৈন্য বিদায় করে দিয়েছে। আসলে সাহসের সাথে জনগণকে নিয়ে পরিকল্পনা করলে জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় যেকোনো বিদেশি চক্রান্ত রুখে দেয়া সম্ভব। আমাদের লোকবল আছে; শতকরা বিরানব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ, তাই মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে ন্যায়নীতির ওপর থাকলে অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সহযোগিতা করবেন কোনো সন্দেহ নেই।
যে আল্লাহ মহান জুলাই বিপ্লব সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন, সেই আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। শুধু দরকার ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ এগিয়ে নেয়া এবং দেশের স্বার্থে দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে একযোগে সবাই ময়দানে নামলে কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না। ইতোমধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা জামায়াত, বিএনপি, এনসিপিসহ আরো সংশ্লিষ্ট লোকদের ডেকেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। অন্যান্য দলও একত্রিত হয়ে এবং আলাদাভাবে ওসমান হাদির ঘটনায় হুঁশিয়ারি দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই ওসমান হাদিকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। তার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তারপরও ডাক্তাররা আশা করছেন, উন্নত চিকিৎসা দিলে দ্রুত সেরে উঠবেন তিনি।
দেশের মানুষ অনেকটাই দলকানা হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত চিন্তায় কোনো কাজ করতে চায় না বা রিক্স নিতে চায় না। জুলাই বিপ্লব ঘটানোর পর আর বসে থাকার সুযোগ নেই। দল ও মতের পার্থক্য ভুলে সবাই দেশের স্বার্থে ঐকমত্য ঘোষণা করে দেশের ভেতরের ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী এবং বাইরের শক্তিকে চিহ্নিত করে মরণ কামড় দিতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, জুলাই সনদের আলোকে দেশকে ১০০ বছরের বড় পরিকল্পনায় এগোতে হবে। আমাদের দুনিয়ার সবার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, কোনো প্রভুত্ব মেনে নিতে পারবো না।
আমাদের দেশের মানুষ সহজ-সরল, কিন্তু আবেগী। জনগণকে বুঝাতে পারলে তারা দেশের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, গত ৫৪ বছর আমরা কোনো দেশদরদি সরকার পাইনি। যখন যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা ব্যক্তি, দল ও নিজের স্বার্থেই কাজ করেছে। সাধারণ জনগণের উন্নতি-অগ্রগতির দিকে নজর দেয়নি। গত ১৬ বছরে ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি বাহিনী ও তার দলের লোকদের এমন সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল যে, হাসিনা ও তার দোসররা দেশকে দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। দেশের সব খাতে দলীয় ক্যাডার দিয়ে সবাই দলের জন্য কাজ করে দেশকে দেউলিয়া বানিয়ে ফেলেছিল।
ছাত্র-জনতা ক্ষোভ আর চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফ্যাসিবাদ তাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এখন দেশ গড়ার পালা। যেহেতু দীর্ঘদিন যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা আগের ফ্যাসিবাদ ভুলতে পারছে না। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার পাঁয়তারা করছে। জুলাই বিপ্লবের পরপরই একদল ক্ষমতায় গেছে বলে প্রচার করে চাঁদাবাজি, দখলবাজি করে বাজারঘাট দখল করে জনগণের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। জনগণ আবার ফ্যাসিবাদের গন্ধ পাচ্ছে। আমরা এর প্রতিকার চাই। কোনো ফ্যাসিবাদের গন্ধযুক্ত লোককে ভোট দেওয়া যাবে না। সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত লোককে ভোট দিয়ে নেতা বানাতে হবে। অন্যায়কে অন্যায়ই বলতে হবে। এদিক থেকে জামায়াতে ইসলামীর আমীরের ঘোষণা ফ্যাসিস্ট তাড়িয়েছি, দুর্নীতিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করবো। জামায়াতের নেতৃত্বে ৮ দল এক হয়ে জামায়াতে আমীরের ডাকে সাড়া দিয়ে মাঠে-ময়দানে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণও তাদের প্রতি বিপুল সাড়া দিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভাগীয় শহরগুলোয় জনসভা হয়েছে। বিপুল জনতার ঢল দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছে যে, আমরা আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ বানাতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।
যারা ক্ষমতায় চলেই গেছে বলে ধারণা করে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের সব কায়দা-কানুন আয়ত্ত করে ফেলেছিল, জামায়াত ও ৮ দলের কর্মকাণ্ড তাদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। বলতে পারেন তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। অনেকটা আবোল-তাবোল বলছে। জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতা, সুধীসমাজ ও জামায়াত-শিবির ৮ দল ও বুদ্ধিজীবী মহল এক থাকলে আগামী নির্বাচনে তারা বিপুল ভোটে জিতে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন করে দুনিয়ার বুকে একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে জায়গা দখল করতে সক্ষম হবে। ছাত্র-জনতা এবং দেশদরদিদের সমর্থনেই ইসলামী ছাত্রশিবির ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুতে বিপুল ভোটে জিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশে এখন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই একমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের নির্বাচিত বৈধ সংগঠন। তারা ইতোমধ্যে তাদের কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছে সৎ, মেধাবী, দুর্নীতিমুক্ত লোকের হাতেই দেশ ও জনগণ নিরাপদ।
দেশে-বিদেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। আমাকে অনেক বড় মাপের লোকেরা বলেছেন, অনেক নাস্তিকরাও আপনাদের ভোট দেবে দেশের স্বার্থে। আমি তাদের আমার অভিজ্ঞতা জানালে তারা আরো আশাবাদী হলো যে, আসলে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে দেশ চললে মানুষের অধিকার রক্ষা পাবে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই তাদের পাওনা বুঝে পাবে। গত ৫৪ বছরে কোনো হিন্দু পরিবার জামায়াতের লোকদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মেয়েদের বেইজ্জতি করেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিবিরের ছেলেরা কোনো মেয়ের আঁচল ধরে টান দেয়নি। তাই দেশের সব মানুষ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা জামায়াত-শিবিরের কাছেই নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
আমরা কথিত বড় দলের আচরণে আশ্বস্ত হতে পারছি না যে, তারা শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়ার আদর্শে আছে কিনা? তারা ডান-বাম দেশের জন্য কল্যাণকামী লোকদের নিয়ে দেশ চালিয়েছেন। এখনকার নেতারা আওয়ামীদের বাতাস পেয়েছে। ভারতকে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ভাবছে। মনে রাখতে হবে, আমরা আমাদের দেশের জন্যই রাজনীতি করি। কোনো দেশের ফলোয়ার আমরা নই। আমাদের কোনো বাপ-দাদার দেশও নেই যে, সেখানে পালিয়ে যাব।
তাই আসুন, আর ভেদাভেদ নয়, জুলাই বিপ্লবের অংশীদাররা একসাথে একমতে দেশের জন্য কাজ করি। আগামী জুলাই সনদের জন্য গণভোট আর জাতীয় নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত নেতা বাছাই করি। দেশ ভালো চলবে, আমরা ভালো থাকবো। আগামীর প্রজন্ম আমাদের জন্য দোয়া করবে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]