শীতের দিনে খেজুর রসের পিঠা
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:৫৪
॥ আব্দুস সাত্তার সুমন ॥
শীতকাল মানেই গ্রামে অন্যরকম এক ঋতু। সকালের কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্যের আলো মাটির ওপর পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তুলির আঁচড়ে একখানি ছবি এঁকে দিয়েছে। নদীর ধারে কাশবন নুয়ে পড়ে, আর উঠোনজুড়ে গরম গরম পিঠার গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে সবার মন।
খোকা এক ছোট্ট ছেলে, আজ ভোরবেলা থেকেই খুশিতে লাফাচ্ছে। আজ তার নানুর বাড়িতে ‘পিঠা উৎসব’। খোকা শহর থেকে এসেছে গ্রামে, সঙ্গে তার ছোট বোন লাবু। তাদের মা বলছে, আজ কিন্তু তোমরা সাহায্য করবে পিঠা বানাতে, বুঝলে?
খোকা মাথা নাড়ে, কিন্তু মনে মনে ভাবে পিঠা বানানো মানে নিশ্চয়ই খুব মজার কাজ!
পিঠার আয়োজন
নানুর উঠোনজুড়ে ব্যস্ততা। একপাশে পাটের চাটাই, তার ওপর চালের গুঁড়া, অন্যপাশে গরম গরম খেজুরের রস ফোটানো হচ্ছে বড় হাঁড়িতে। রসের বাষ্পে চারদিক ভরে গেছে মিষ্টি গন্ধে। নানু হাসতে হাসতে বললেন,
এই যে, শীতের সোনার ধন খেজুরের রস! এর চাইতে মিষ্টি কিছু পৃথিবীতে আছে নাকি?
খোকা অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে থাকে। সে আগে কখনো দেখেনি গাছে কলসি ঝুলিয়ে রস তোলা হয়। কাকু বললেন, রাতভর গাছে কলসি থাকে, ভোরে গিয়ে আমরা নিয়ে আসি। এটাই খেজুরের রস।
খোকা জিজ্ঞেস করে, এই রস দিয়েই কি পিঠা বানাবেন?
নানু হাসলেন, হ্যাঁ রে, এই রস দিয়েই বানাবো খেজুরের পিঠা তোর প্রিয় হবে দেখিস!
পিঠার গন্ধে জেগে ওঠে গ্রাম
চুলার ধারে নানু আর মা বসে গেলেন। মাটির চুলায় জ্বলে শুকনো খড়কুটো। তার ওপরে বসানো তাওয়া।
চালের গুঁড়ার মণ্ডে মিশে গেল খেজুরের রস, নারিকেল, গুড়, একটু ঘি। নানু পিঠা ঢেলে বললেন, দেখো খোকা, এটা বলে ভাপা পিঠা, আবার এটা চিতই পিঠা, আর এইটা হবে খেজুরের পিঠা। এটা শীতের বিশেষ পিঠা।
খোকা তাকিয়ে দেখে পিঠাগুলো যেন ফুলের মতো ফুটে উঠছে তাওয়ার ওপর। গরম ভাপে ফুসফুস শব্দ হচ্ছে। লাবু পাশে বসে হাততালি দিচ্ছে, নানু, আমি একটা পিঠা খাই!
নানু একটুখানি ঠাণ্ডা করে হাতে তুলে দিলেন লাবুকে বললেন, সাবধানে খা, গরম।
লাবু কামড়ে খেয়ে বলল, আহা, এর ভিতর নারিকেল আর রস! কী মজা নানু!
পিঠার গল্পে ইতিহাস
খোকা পিঠা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, নানু, এত পিঠার নাম কে দিল?
নানু হেসে বললেন, নানুভাই, এগুলো আমাদের দেশের ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় আলাদা আলাদা পিঠা, কোথাও দুধপিঠা, কোথাও রসচাপা, কোথাও পাটিসাপ্টা, আবার কোথাও শীতল পিঠা, কোথাও আবার দুধ চিতই। প্রত্যেকটা পিঠাই আমাদের মাটির গল্প বলে।
খোকা বিস্ময়ে বলে, তাহলে পিঠাও ইতিহাস বহন করে?
হ্যাঁ রে খোকা, নানু মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, পিঠা মানেই ঐতিহ্য, পিঠা মানেই ভালোবাসা। যেমন- শীত এলেই আমরা সবাই একসাথে বসি, হাসি, খাই এ মিলনের নামই তো উৎসব।
খোকার খেজুররসের পিঠা বানানো
দুপুরের দিকে খোকা বলল,
নানু, আমিও বানাবো একটা খেজুরের পিঠা!
সবাই হেসে ওঠে। নানু বললেন,
ঠিক আছে, তবে আগে হাত ধুয়ে এসো।
খোকা খুব যত্ন করে মণ্ড নিয়ে ছোট একটা গোল পিঠা বানায়। নারিকেল পুর ভরে দিয়ে নানু তাকে সাহায্য করেন পিঠাটা তাওয়ায় রাখতে। কিছুক্ষণ পর পিঠা ফুলে ওঠে। খোকা চেঁচিয়ে ওঠে, নানু, এটা আমার পিঠা! নাম দিবো খোকার খেজুরের পিঠা!
সবাই হেসে ওঠে।
খোকা পিঠাটা মুখে দিতেই চোখ বন্ধ করে বলে,
এ পিঠার মতো মিষ্টি কোনো স্মৃতি আমি কখনো ভুলব না!
বিকেলের রোদে মিষ্টি স্মৃতি
বিকেলে উঠোনে সবাই বসে, কেউ চা খাচ্ছে, কেউ পিঠা। দূরে গরু ডাকছে, বাতাসে খেজুরের রসের ঘ্রাণ।
খোকা পিঠা খেতে খেতে ভাবে, শীতের এ দিনে, খেজুরের পিঠার মতো আনন্দও কি কোথাও পাওয়া যায়?
লাবু পাশে বসে বলল,
ভাইয়া, পরের বছর আবার আসবো, ঠিক আছে?
খোকা মাথা নেড়ে বলল, অবশ্যই! আমরা আবার পিঠা বানাবো, আবার হাসব, আবার গ্রাম মাতাবো।
সূর্য আস্ত যেতে যেতে নানু বললেন, দেখো খোকা, শীতের দিনে পিঠা বানানো শুধু খাওয়ার আনন্দ নয়, এটা পরিবারকে এক করে রাখার উৎসব।
খোকা নানুর কোলে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, নানু, শীতের দিনে খেজুরের পিঠা মানেই তো ভালোবাসার স্বাদ।
কিছু কথা:
সেদিন রাতে চাঁদের আলোয় গ্রামটা যেন মিষ্টি রসের ঘ্রাণে ভরে গেল। খোকা ঘুমিয়ে পড়ল, স্বপ্নে দেখল,
তাওয়ার ওপর ফুটছে পিঠা,
আকাশে ভাসছে ধোঁয়ার রেখা,
আর নানুর মুখে হাসি,
যেন বাংলাদেশজুড়ে গেয়ে উঠেছে-
শীতের দিনে খেজুরের পিঠা,
দারুণ স্বাদের বড্ডমিঠা।