তৃতীয় শক্তির উত্থান আটকে গেছে


৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:০৭

॥ জামশেদ মেহদী॥
গত ২৮ নভেম্বর শুক্রবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ বিফলে গেছে। এনসিপি, এবি পার্টি (আমার বাংলাদেশ পার্টি), গণঅধিকার পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ) এবং জাসদের একটি অংশ মিলে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের খবর দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোয় খুব জোরেশোরে প্রচারিত হচ্ছিলো। এমন খবরও বেরিয়েছিল যে, রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ হলে এ ৫ দলের সমাবেশের মধ্য দিয়ে নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করবে। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীকে আবু সাঈদ হল ভাড়া করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীও তার দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ ২৮ নভেম্বর শুক্রবার শহীদ আবু সাঈদ হলে ঐ ধরনের কোনো সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়নি।
খবরে প্রকাশ, জোট গঠন নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং বড় দুই দলের কোনো দলের সাথে জোট বেঁধে নির্বাচন করা হবে সেই নিয়ে এনসিপির মধ্যে নাকি তীব্র মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। খবরে প্রকাশ, গত ২৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের আলোচনায় আপ বাংলাদেশকে জোটে নিতে দলের একাংশ রাজি হয়নি। ফলে আপ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বৈঠকে পাস করা যায়নি এবং আপাতত জোট আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে।
এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, ‘গত ২৭ নভেম্বর রাতের বৈঠকে এনসিপির কয়েকজন নেতা আপ বাংলাদেশকে নিয়ে জোট করতে চাননি। শেষে এনসিপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আপ বাংলাদেশকে নিয়ে জোট করবে না। এখন জোট সম্ভাবনার অন্য দল যদি বলে, তারা আপ বাংলাদেশ ছাড়া জোট করবে না, তাহলে তো জোট অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এজন্য আলোচনা চলছে। আপাতত আজকে (২৮ নভেম্বর) বৈঠক হচ্ছে না।’
ইউনাইটেড পিপলস (আপ) বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, ‘জোট গঠন প্রক্রিয়া পিছিয়েছে। আলাপ-আলোচনা চলছে। কনফর্ম হলে জানাতে পারবো।’
এনসিপি আপ বাংলাদেশকে নিয়ে জোট করতে চায় না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কিছু জানানো হয়নি এনসিপির পক্ষ থেকে।’
এবি পার্টির সহ-দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু বলেন, ‘বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। আমরা পরবর্তীতে জানিয়ে দেবো। এটা হঠাৎ করে মাঝরাতে স্থগিত হয়েছে। আমাদের শরিক যারা, তাদের ভেতরে ডিসকাশনের কিছু বিষয় আছে। এনসিপির অনেক জুনিয়র নেতা আছেন, বোঝার জায়গা আছে, এ জায়গা থেকে আমরা একটু দেরি করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এনসিপি আপ বাংলাদেশকে নিতে চাচ্ছে না। তাদের নিজেদের মধ্যে কোন্দল আছে। জোট হবে, তবে একটু দেরি হচ্ছে।’
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, আপ বাংলাদেশকে জোটে নেওয়া নিয়ে দলের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেকোনো রাজনৈতিক জোট হয় রাজনৈতিক দল নিয়ে। কোনো প্ল্যাটফর্ম সাধারণত রাজনৈতিক জোটে থাকে না। আপ বাংলাদেশ একটি প্ল্যাটফর্ম, রাজনৈতিক দল নয়। তাই তাদের নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার রক্ষা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণে যারা আগ্রহী, তাদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। এ জোটে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য গুরুত্ব পাবে নাকি এবারের নির্বাচনী বোঝাপড়া গুরুত্ব পাবে, সেটা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি। ফলে কয়েকবার সময় পিছিয়েও আমরা ঘোষণা পর্যায়ে উপনীত হতে পারিনি। একটি দল আরও একটু সময় চেয়ে নিয়েছে। আরেকটি দলের যুক্ত হবার বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। আমরা এখনো হাল ছাড়িনি।’
জোট গঠন পেছানোর নেপথ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন ছাত্র উপদেষ্টারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে এনসিপির একটি সূত্র দাবি করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনসিপি নেতা বলেন, দুজন ছাত্র উপদেষ্টা চান, বিএনপির সঙ্গে এনসিপি জোটে যাক। কিন্তু এনসিপির নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশ এটা চায় না। এ বিষয়টিও জোট নিয়ে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
এ ধরনের আরো অনেক কারণ বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সবকিছুর সারমর্ম হলো এই যে, তৃতীয় একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ আটকে আছে। যদিও বলা হচ্ছে যে, শিগগিরই মতভেদ দূর করে জোট আত্মপ্রকাশ করবে, তারপরও এ ধরনের আশাবাদে আস্থা রাখা যায় না। কারণ নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। তফসিল ঘোষণার আর মাত্র সর্বোচ্চ ১০ দিন বাকি আছে। এর আগেই শুধু জোট গঠন নয়, প্রার্থী নির্বাচনও সম্পন্ন করতে হবে। এতকিছু করার সময় সম্ভাব্য তৃতীয় জোটের আছে কিনা, সেটি ভাববার বিষয়।
আসলে তৃতীয় জোট বা তৃতীয় শক্তি গঠনের চিন্তাধারা বা উদ্যোগ নতুন নয়। গত শতবর্ষের ইতিহাস বলে, এ উপমহাদেশে; বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে রাজনীতি চলেছে সাধারণত বাইনারি ভিত্তিতে বা দ্বিদলীয় ভিত্তিতে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে ব্রিটিশ আমলেও রাজনীতি ছিলো বাইনারি বা দ্বিদলীয়। তখনকার দ্বিদলীয় ভিত্তি আসলে ছিলো দুই সম্প্রদায় বা দুই জাতির ভিত্তিতে। ব্যাপক ভিত্তিতে বলা যায়, এ দুটি জাতি বা সম্প্রদায় ছিলো প্রধানত হিন্দু এবং মুসলমান। হিন্দুদের দল ছিলো কংগ্রেস। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালে বোম্বেতে। তখন কংগ্রেসের প্রধান নেতা ছিলেন দাদা ভাই নওরোজি। পক্ষান্তরে তার ২১ বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সালে। যদিও মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি ছিলেন তৃতীয় আগা খান, তবে মুসলিম লীগ গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিলো ঢাকার নবাব পরিবারের। আরো বিশেষ করে বলতে গেলে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর। যতই দিন যেতে থাকে, ততই দেখা যায় যে, কংগ্রেস অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা চাইলেও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো অখণ্ড ভারতে হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষা। কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের সাথে সদ্ভাব রেখে চলে এবং মুসলমানদের দাবিয়ে রেখে হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। এর অবধারিত পরিণতিতে ১৯০৬ সালে ঢাকায় যে মুসলিম লীগের জন্ম হয়, সেই মুসলিম লীগ মুসলমানদের স্বার্থকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। এসবের পরিণতিতে ভারত বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হয় স্বাধীন পাকিস্তান এবং ভারত।
পাকিস্তান হওয়ার পর প্রধান রাজনৈতিক দল ছিলো মুসলিম লীগ। কিন্তু ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ কেটে দিয়ে আওয়ামী লীগ নামে এটিকে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আবার শুরু হয় বাইনারি বা দ্বিদলীয় রাজনীতি। মুসলিম লীগ ৪৭-পূর্ব রাজনীতি জারি রাখে। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান) বাঙালিদের স্বার্থের আওয়াজ তোলে। ৪৭-এর আগে ছিলো হিন্দু বনাম মুসলমান রাজনীতি। ৪৭-এর পর শুরু হয় মুসলমান বনাম বাঙালি রাজনীতি। এ রাজনীতির চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটলে আবার রাজনীতি নতুন এক মোড় নেয়। জামায়াতে ইসলামীসহ যেসব দলকে শেখ মুজিব নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন নতুন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সেই সাথে জিয়াউর রহমান তার নিজস্ব দল গড়ে তোলেন, যার নাম হয় বিএনপি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আদর্শিক লড়াই হয় আওয়ামী লীগের বাঙালিত্ব বনাম জিয়া এবং ইসলামী দলসমূহের ইসলামী মূল্যবোধ ও সেই ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে।
আওয়ামী লীগ তার রাজনীতিতে আরেকটি নতুন উপাদান যোগ করে। সেটি হলো মাত্রাতিরিক্ত ভারতনির্ভরতা। ভারতনির্ভরতা বললে ভুল বলা হবে, তারা বাংলাদেশকে ভারতের একটি করদরাজ্যে পরিণত করে। এর বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই চলে জামায়াত এবং বিএনপিসহ অন্যান্য ইসলামী দলের।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের প্রো-ইন্ডিয়ান শাসনের বিরুদ্ধে যে জুলাই বিপ্লব ঘটে, তার অন্যতম প্রধান দুটি স্লোগান ছিল, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
এখনো সেই লড়াই চলছে। এখনকার লড়াইয়ের সেন্টার স্টেজে আছে ভারতীয় প্রভুত্ব মেনে নেওয়া বনাম ভারতীয় গোলামির শৃঙ্খল ছিন্ন করা। আগামী দিনেও লড়াইয়ের সেন্টার স্টেজে থাকবে ভারতীয় প্রভুত্ব।
তৃতীয় জোট বলুন, আর তৃতীয় শক্তি বলুন, কোনোটাই কামিয়াব হবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই শক্তি বা দল জনগণের সামনে একটি আদর্শ বা পলিটিক্স হাজির করতে না পারে। সেই ভারত বিভক্তির আগে থেকেই প্রথমে ভারতে, পরে পাকিস্তানে এবং তার পরে বাংলাদেশে কমিউনিস্টরা তৃতীয় শক্তির চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা কামিয়াব হয়নি। কারণ জনগণের চাহিদা এবং অনুক্ত ভাষা তারা বুঝতে পারেনি।
এখনো তৃতীয় শক্তি বা জোট যাই বলুন না কেন, তাকে হতে হবে সম্পূর্ণভাবে একটি আদর্শনির্ভর। আর সেই আদর্শ হতে হবে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং কোটি কোটি মানুষের মনের আকাক্সক্ষার ধারক। এদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান (সর্বশেষ আদমশুমারি মোতাবেক)। তারা ১৯৭১ সালে ভারতের গোলামি করার জন্য পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসেনি। এ দুটি বিষয়কে যে দল ধারণ করবে এবং তার ভিত্তিতে যারা যত উচ্চকণ্ঠ হবে জনগন তাদের পেছনেই কাতারবন্দী হবে।
এনসিপিসহ যারা তৃতীয় জোট গঠন করতে চান, তাদের এ বিষয়টি খেয়াল করতে হবে। অন্যথায় তাদের রাজনীতি বা জোট কোনো দিন সফল হবে না।