রাজনৈতিক বয়ান ও বাস্তবতা
২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮
॥ রিদওয়ান বিন ওয়ালি উল্লাহ ॥
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চেতনা ব্যবসী ছিল আওয়ামী লীগ। অথচ তাদের প্রণয়নকৃত রাজাকারের তালিকায় তাদের দলের লোকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আবার এ চেতনা ব্যবসার লাইসেন্স দেখিয়ে ১৬ বছর বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মুখে মুখে ৭১-এর চেতনার ফেনা তুলে ১৫ বছরে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করে দেশের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলতে ২৮ লাখ ৪১ হাজার ৫৩০ কোটি ৩৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা। যেখানে পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেলে খরচ হয়েছে মাত্র ৬৫ হাজার কোটি টাকার মতো। ১৫ বছরে ভোট চুরি ও ডাকাতি করে দেশের সামাজিক অবস্থাকে বিষিয়ে তুলেছিল। জঙ্গি নাটক করে দেশের সংস্কৃতি ও সম্পদ ধ্বংস করেছে। প্রহসন করে জামায়াত নেতাদের হত্যা, বিডিআর বিদ্রোহের নামে আর্মি অফিসার ও বিডিআর জওয়ান হত্যা, হেফাজতের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গণহত্যা, গুম, খুন, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠা করে দেশবাসীকে অসহায় করে রেখেছিল। আগস্ট বিপ্লবে কোনো যুদ্ধ নয়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত প্রায় ২০০০ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। হেলিকপ্টার থেকে নিরাপদ শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধাকে হত্যা করেছে। লাশ পুড়িয়ে ফেলেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার বারটা বাজিয়েছে। শুধু মুজিববর্ষ উদযাপনে মোট ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ধ্বংস করেছে। গণপ্রত্যাখ্যাত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভুয়া, রাতের ও আমি-ডামির নির্বাচনে অপচয় করেছে রাষ্ট্রের ২৬৫ (দশম), ৭০০ (একাদশ), ২২৭৭ (দ্বাদশ) কোটি অর্থাৎ ৩২৪২ কোটি টাকা (বিবিসি বাংলা, ৩ জানুয়ারি, ২০২৪)।
অথচ যাদের চেতনা নেই বলে অভিযোগ করে, সেই দলে দুর্নীতি শুধু শূন্যের কোটায়ই নয়, বরং তাদের দুজন মন্ত্রী ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়ে ১ পয়সার দুর্নীতিও করেননি। ইসলামী ব্যাংককে এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাংক বানিয়েছে। আরো নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের সাথে পরিচালনা করে দেশের সেবা করে যাচ্ছে। ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতা বলে, ৭১ নিয়ে মুখে ফেনা তোলা মানেই সে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও মানুষের অধিকার হরণকারী। যেন ‘চেতনার সাইনবোর্ড’ অন্যায় ঢাকার ঢাল। আর যারা চেতনা নিয়ে খই ফোটায় না, তারাই শতভাগ দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। যে লোকটা সর্বোচ্চ ক্ষমতা পেয়ে দেশের ১ পয়সাও তসরুপ না করে বরং দেশের সম্পদ রক্ষায় আমানতদারের ভূমিকা পালন করেছে, তাকে চেতনাহীন বলা মানে নিজেকে হয় পাগল না হয় ধান্ধাবাজ হিসেবে পরিচয় দেয়া। নিজের দেশকে ১০০ ভাগ উন করা ছাড়া ১০০ ভাগ দুর্নীতি মুক্ত থাকা সম্ভব নয়।
২৪-এর ৫ আগস্টের বিপ্লবোত্তর প্রতিষ্ঠিত নতুন দলের নেতাদের কাছে দেশপ্রেমিক নাগরিক সেই পুরনো বয়ান প্রত্যাশা করেনি। প্রতিষ্ঠার পরপর তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ও তাদের মুখে পুরনো চেতনা ব্যবসার বয়ান শুনে সন্দেহ দিন দিন বেড়েই চলেছে যে, তারাও কী আগের পতিত শক্তির মতোই দুর্নীতি ঢাকার ঢাল হিসেবেই এটাকে ব্যবহার করছে? রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কী তাদের বাস্তবভিত্তিক দেশের সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নিজেদের নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের প্রমাণ দেয়ার কোনো ইস্যু নেই। কিংবা সামর্থ্য বা যোগ্যতা নেই।
৭১ সালে কিছু দল মনে করেছে যে, ইন্ডিয়া ব্যাকড স্বাধীনতা আমাদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা পূরণ করতে দেবে না। কিন্তু তাই বলে সে তো যুদ্ধাপরাধী হয়ে যায় না। আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের কোনো প্রমাণ মেলেনি। যে কয়টা বিচার হয়েছে, সবগুলো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আর রাজাকারের সংখ্যায় তো আওয়ামী লীগ চ্যাম্পিয়ন। দ্বিতীয় অবস্থানে বিএনপি। স্বাধীনতার পরে ৫৩ বছরের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশ ভারতের ভৃত্য হয়েই ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান মেনেই রাজনীতি করছে। কখনোই বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর অপচেষ্টা করেনি এবং তাদের গঠনতন্ত্রেও কোথাও পাকিস্তান পন্থার লেশমাত্রও নেই। বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ কিংবা দুর্নীতির কোনো মামলা হয়নি। এমনকি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা ক্ষেত্রসহ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়ে তারা নিজেদের সাচ্চা দেশপ্রেমিক প্রমাণ করেছে। অথচ তাদেরকে পাকিস্তানপন্থি বলছে এমন লোকেরা যারা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণের মামলা রয়েছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, স্বাচ্চা দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়া কোনো ব্যক্তিকে ৭১-এর চেতনাবিরোধী কিংবা পাকিস্তানপন্থি বলে গালি দেয়া মানে এসব কথা বলে নিজের দুর্নীতি ঢাকার ব্যবস্থা করা।
মীর কাসেম আলী নিশ্চিত গ্রেফতার জেনেও লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। অথচ তাকে আওয়ামী লীগ ‘স্বাধীনতবিরোধী’ ভিত্তিহীন ট্যাগ দিয়ে জুডিশিয়াল কিলিং (হত্যা) করেছে। আর হাসিনা বাংলাদেশপন্থি দাবি করেও ইন্ডিয়া পালিয়ে গেছে। এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে?
আওয়ামী বয়ানের সাথে দেশের উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা থাকে। দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা সমস্যার সমাধানে টিভি টকশো, কর্মশালা, গোলটেবিল বৈঠক, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সায়েন্স ফেস্ট, বিজনেস ফেস্ট, সীমান্ত, প্রতীরক্ষা ব্যবস্থা, ফুটপাত থেকে সচিবালয় পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধকরণ এমন নানা আয়োজনের সুযোগ আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- কিছুসংখ্যক ক্ষমতা লোভী জাতীয় ইস্যু বাদ দিয়ে ফালতু বয়ান নিয়ে ব্যস্ত। যেখানে দেশের কোনো কল্যাণ নেই।
বাংলাদেশের নাগরিকদের ইতিহাস ভালোভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এ অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হয়ে আজও চর্চা হচ্ছে। যার ফলে এ অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যা এখন শতকরা ৯২ জন। তাই এখানে মধ্যপন্থার রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় ইসলামী রাজনীতিই বেশি যুৎসই হবে। ৫ আগস্ট বিপ্লবোত্তর মানুষ রাজনীতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। ৫৩ বছরে বড় দলগুলোকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেখেছে। অন্যদিকে জামায়াতকে দুর্নীতিমুক্ত দেখে মানুষ ভাবছে, সবাইকে দেখা শেষ। এবার জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখার পালা। জনগণের মধ্যে এ ইতিবাচক ও সংস্কারমূলক পরিবর্তন দেখে স্বার্থান্বেষীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাখ্যাত পুরনো ইস্যু নিয়ে জামায়াতকে ঘায়েল করতে পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। ইসলামী শক্তিগুলোর ঐক্য শক্তিতে ভীত হয়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে নানা প্ল্যাটফর্ম থেকে বয়ান তুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে।
প্রতিকারের উপায়- ১. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে ঘায়েল না করে নৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করার সংস্কৃতি চালু করা। ২. নৈতিকতার মাধ্যমে দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়া। ৩. বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি চর্চা করা। ৪. গুম, খুন, হত্যা ও চাঁদাবাজি এবং অপরাজনীতির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ৫. ইসলামী দলগুলোর পক্ষ থেকে অনৈসলামিক দলের নেতাগণকে তাফসির, হাদীসগ্রন্থ ও ইসলামী সাহিত্য উপহার প্রদান। ৭. সকল দলের মধ্যে পরস্পর সংশোধনের রাস্তা খোলা রাখা। ৯২% মুসলমানের দেশ হিসেবে সকল রাজনীতিবিদকে এ অঞ্চলে ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা আবশ্যক। ৯. ৪৭-৭১-২৪ এর স্পিরিটকে সমুন্নত রেখে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা। ১০. দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমন্বিত কাজ করা।
লেখক: এম.ফিল, ইবি ও শিক্ষক, শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ।