ভূমিকম্প আতঙ্কে দেশবাসী
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৪৮
৯৫ ভাগ ভবনের নেই অনুমোদন
নেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের এখনো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
দেশে গত ২১ নভেম্বর শুক্রবার সকাল থেকে ২২ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩২ ঘণ্টার ব্যবধানে চারবার ভূমিকম্পে দেশজুড়ে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক। স্মরণকালের ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে সবার মনে নতুন করে উৎকণ্ঠা ভর করেছে। রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্পের বড় ধাক্কা সামলানোর মতো সক্ষমতা বা প্রস্তুতি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। উন্নয়নের বুলি আওড়িয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবার প্রমাণ পেতে শুরু করেছে দেশবাসী।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) হিসাবে জানা যায়, রাজধানীতে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। ঢাকার নিকটবর্তী মধুপুর ফল্টে (টাঙ্গাইল) যদি ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে ঢাকা শহরের কয়েক লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে। এর অন্যতম কারণ অধিকাংশ ভবন তৈরির ক্ষেত্রে জাতীয় ভবন নির্মাণ কোড অনুসরণ করা হয়নি। বেশিরভাগ ভবন নির্মাণে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
এর মধ্যে গত শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। দেশে গত শনিবার সাড়ে সাত ঘণ্টায় তিনবার ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে সকালে একবার ও সন্ধ্যায় পরপর দুবার ভূকম্পন অনুভূত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর এক সেকেন্ড পর সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে দ্বিতীয়বার ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে এটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। প্রথমটির উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডায়, দ্বিতীয়টির উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১১ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।
৯৫ ভাগ ভবনের নেই অনুমোদন, ভয়াবহ ঝুঁকিতে ঢাকা : ঢাকার ৯৫ ভাগ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অননুমোদিত নকশার বাইরে। রাজধানীর মাস্টারপ্ল্যান ড্যাপের তথ্যমতে, বিগত আওয়ামী লীগের ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৯০ হাজার স্থাপনা গড়ে ওঠে। ওইসময় রাজউক থেকে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়। সে হিসাবে অনুমোদন ছাড়াই ৯৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে বিভিন্ন সময় সতর্ক করে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকার কাছে ফরিদপুরে গত ১৫ বছরে দুবার ৪-এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে বলে নথিবদ্ধ করেছে ভূমিকম্প শনাক্তকারী সংস্থা আর্থকোয়েক ট্র্যাক। গত ১৫-২০ বছরের মধ্যে ঢাকার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জে হওয়া ৫.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্পকে। এছাড়া ১৮২২ ও ১৯১৮ সালে ঢাকার অদূরে মধুপুর ফল্টে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার আঘাত হানা ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছের নরসিংদীর মাধবদীতে। তাই সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকা ব্যাপক ঝুঁকির মাঝে আছে।
জানা যায়, সিলেটেও যদি ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ঢাকায় ৪০ হাজার ৯৩৫ থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ভবন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর যদি ঢাকার কাছাকাছি হয়, তাহলে কী ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে, তা আঁচ করা যায়।
বার বার আলোচনা- নেই কোনো প্রস্তুতি
দেশের ভেতরেই ঘন ঘন কম্পন দিচ্ছে বড় ভূমিকম্পের বার্তা। কিন্তু যতবারই ভূমিকম্পের কাঁপুনি হয়, তখন চলে আলোচনা। সপ্তাহ না ঘুরতেই থেমে যায় সবকিছু। ভূমিকম্পের বড় ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা রাজধানী ঢাকার নেইÑ এটাও বলা হচ্ছে। ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভূমিকম্পে ক্ষতির ঝুঁকিও বেশি। তাই বড় কোনো ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে ঢাকা। পড়তে পারে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে। তাই যত দ্রুত সম্ভব জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবারের ভূমিকম্পে এত বড় ঝাঁকুনির পর এখন ঢাকা শহরের প্রতিটা অধিবাসী অনুভব করতে পারছে বিপদ অতি নিকটে। ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা শহরে জনসাধারণের আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও খোলা জায়গার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ যখন হুড়াহুড়ি করে বের হয়ে একটু নিরাপদ বা খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন অধিকাংশ এলাকায় সেই খোলা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।
আওয়ামী উন্নয়ন বুলি হয়েছে বুমেরাং
দেশের বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে শুধু বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, যা পুরো এডিপির ৪১.৩ শতাংশ ছিল। এর আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় করেছে দুই লাখ ২৯ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। এত বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ের পরও সড়ক ও বন্দরের মান ছিল ভয়াবহ খারাপ। দৃশ্যমান উন্নয়নের নামে লুটপাট করেছে তৎকালীন সরকার। পর্যাপ্ত সমীক্ষা ছাড়াই ব্যক্তি ও স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দিতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয় এ সময়। অনেক প্রকল্প এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নানা পরিবেশ বিপর্যয়ের তৈরি করেছে। এর বড় উদাহরণ কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা সেতুতে রেললাইন প্রকল্প।
অন্যদিকে রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলাধার। রাজধানীর অন্যতম জলাধার হাতিরঝিল ও পার্ক পান্থকুঞ্জের ওপর দিয়ে নির্মাণ হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি সংযোগ সড়ক (র্যাম্প)। চলমান সংযোগ সড়ক নির্মাণ উদ্যোগের শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন করছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য পলাশী পর্যন্ত চলমান সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ হাতিরঝিল প্রকল্পের সার্বিক লক্ষ্য ও উপযোগিতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এ প্রক্রিয়া এখনই থামানো উচিত। তা না হলে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্ক নষ্ট করার পাশাপাশি পলাশী পর্যন্ত বিদ্যমান রাস্তার উপযোগিতাও নষ্ট হবে। এ এলাকার মানুষজনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সামগ্রিক পরিবেশ বিনষ্ট করার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় যানজট বাড়াবে। মেগা প্রকল্পের বিনিয়োগ ফেরত আনা ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দেয়ার এ আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকার পরিবেশকে আরো ঝুঁকিতে ফেলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন নগর সংস্থাসহ নাগরিকরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবেশ ধ্বংস করে বিগত সরকারের নেয়া জনবিরোধী ও পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে বলে মনে করছেন নগরবিদরা।
এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত সড়কপথের মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এছাড়া ৩১টি র্যাম্পসহ ২৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ওভারপাসসহ মোট ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটারজুড়ে এ পথ নির্মাণ হচ্ছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্প পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। কারওয়ান বাজার থেকে পলাশী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে, তা হাতিরঝিল প্রকল্পকে নষ্ট করছে। হাতিরঝিলে এক্সপ্রেসওয়ের একের পর এক পিলার প্রকল্প এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলাধারের পানিপ্রবাহ ও সার্বিক উপযোগিতা ধ্বংস করছে। পৃথিবীর উন্নত ও আধুনিক শহরগুলো নগর এলাকায় ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক পরিবহন সমস্যা সমাধানের কৌশল থেকে সরে এসেছে। অথচ বাংলাদেশ এখন পরিবহন সমস্যার সমাধান কৌশল হিসেবে নগর এলাকায় ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক পরিকল্পনা করে যাচ্ছে, যা ব্যক্তিগত গাড়িকে উৎসাহিত করে। এভাবে নানাভাবে উন্নয়নের নামে লুটপাট আর ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় করেছে আওয়ামী লীগ।
এদিকে ভূমিকম্পের মতো যন্ত্রপাতি কেনায়ও ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেয় আওয়ামী লীগ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ভূমিকম্প ও দুর্যোগ অনুসন্ধান সরঞ্জাম ৩য় প্রকল্প, দরপত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির ছায়া, ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতার অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের হাতে কোটি টাকার টেন্ডার, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রশ্নবিদ্ধ দরপত্র যোগ্য দরদাতা বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পটা বড় ভূমিকম্প আসার আগে যে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তার অন্যতম। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রায় যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে ৭ মাত্রার হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যাবে, ভেঙে যাবে বহু ভবন, প্রচুর হতাহত হবে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ভূমিকম্প হলে ঢাকায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হবে।
বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানান, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বার বার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন, ঢাকা ও আশপাশের ভবনগুলো ন্যূনতম মান বজায় না রেখেই তৈরি হয়েছে, হচ্ছে। এ কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও মারাত্মক। যদিও ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে এরই মধ্যে মাটির গুণগতমান পরীক্ষা করে একটি রিস্ক সেনসিটিভ ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। ভূমিকম্প সহনীয় ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরীক্ষার জন্য ‘আরবান সেফটি অ্যান্ড রেজিলেন্স ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্প বার্তা দিচ্ছে যে আমাদের এখানে বড় আকারে ভূমিকম্প আসছে। যেটা অনেক দিন ধরে আমরা বলছিলাম। কিন্তু শুক্রবারের ভূমিকম্পে এত বড় ঝাঁকুনির পর এখন ঢাকা শহরের প্রতিটা অধিবাসী অনুভব করতে পারছে বিপদ নিকটে। ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা শহরে জনসাধারণের আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও খোলা জায়গার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ যখন হুড়াহুড়ি করে বের হয়ে একটু নিরাপদ বা খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন অধিকাংশ এলাকায় সেই খোলা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।
নেই প্রস্তুতি, সমাধান কীসে
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিভিন্ন সময় ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন আলোচনা আসে, কিন্তু ফলাফলে অগ্রগতি সামান্য। আওয়ামী লীগের বিগত ২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’
তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিন।
করণীয় নিয়ে এ বিভিন্ন নগরপরিকল্পনাবিদরা বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। জরুরি ভিত্তিতে কঠোরভাবে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ) গঠন করে দ্রুত বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নাঞ্চলে নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। জলাধার, বেসিন এলাকা বা পানিধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্থান ভরাট করে কোনো সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নই অনুমোদন করা যাবে না। পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা প্রকাশ ও উচ্ছেদের পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত সব বিপজ্জনক ভবন দ্রুত খালি করতে হবে।