জ্বলছে সুদান, বিপর্যস্ত মানবতা


২০ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৫৭

রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে মুসলিম বিশ্বকে
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
যখন বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সংঘাতের অন্তহীন লীলাখেলা চলছে, সেই কোলাহলের অন্তরালে সুদান এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক এবং মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল জনপদের আবাসস্থল। দেশটিতে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (সাফ) এবং র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে চলছে গৃহযুদ্ধ আর জ্বলছে মানবতা। সুদানি জনগণ বর্তমানে এক ‘আদর্শহীনতার শূন্যগর্ভ’ (State of anomie) দশায় নিপতিত, যা বিশ্ব ব্যবস্থার নিরিখে অত্যন্ত অকার্যকর। সর্বোপরি একটি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুপস্থিতিতে সম্পদশালী সুদান জ্বলছে আর মানবতা বিপর্যস্ত।
সুদানের জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক অবস্থান
সুদান ২৫ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে বড় দেশ। বর্তমানে ৪৫ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার দেশ সুদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ জন্মহার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারায় অবদান রেখেছে। সুদানের সরকারি ভাষা আরবি। প্রায় ৭০ শতাংশ জনসংখ্যা আরবি ভাষায় কথা বলতে পারে, যা দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে কাজ করে।
সুদানের রাজধানী খার্তুম, যা দেশের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত, যেখানে হোয়াইট নীল এবং ব্লু নীল নদী মিলিত হয়। সুদানে প্রায় ২০০-এরও বেশি পিরামিড রয়েছে, বেশিরভাগই মেরো অঞ্চলে। সুদানে নীল নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৫৪৫ কিলোমিটার, যেখানে মিশরে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার। সবচেয়ে বিখ্যাত পিরামিডগুলো মেরো অঞ্চলে অবস্থিত। এ নুবিয়ান পিরামিডগুলো ৪ হাজার ৬০০ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল।
সুদান প্রাচীন সভ্যতা এবং মানবজাতির আবাসস্থল
সুদানকে প্রাথমিক সভ্যতার কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে মনে করা হয় যা ৫০০০ বছরেরও বেশি সময়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে প্রাচীন নুবিয়া গঠিত হয়েছিল, যা তার সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত। নুবীয়ানরা, আধুনিক সুদানিদের পূর্বপুরুষ। তারা শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি করেছিল, যেটি ৮০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। তারা মিশরীয়দের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। এমনকি তারা শর্তসাপেক্ষে মিশর বিজয়ের পর ২৫তম ফারাওদের রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। ৭ম শতাব্দীতে আরব ব্যবসায়ী এবং বিজেতাদের এ অঞ্চলে প্রবেশের মাধ্যমে সুদান ইসলামী অঞ্চলে পরিণত হয়। তখন থেকেই ইসলাম প্রধান ধর্ম, যা দেশের সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক সুদানের ইতিহাস
সাম্প্রতিককালে সুদানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা শুরু হয় ১৮০০-এর দশকের প্রথম দিকে মিশরের রাজধানী এলাকা থেকে ছোট ছোট রাজ্যের একত্রীকরণের মাধ্যমে। এ সময়ে যদিও মিশর শুধুমাত্র উত্তরাঞ্চলের অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, দক্ষিণে উপজাতিদের স্বাধীন অঞ্চল গঠিত হয়। ১৮৮১ সালে মোহাম্মদ ইবনে আবদাল্লাকে মাহদি নামেও পরিচিত করা হয়। তিনি উম্মে পার্টি তৈরি করে পশ্চিম ও কেন্দ্রীয় সুদানকে ঐক্যবদ্ধ করার অভিযান শুরু করেন। ১৮৮৫ সালে মাহদি বিদ্রোহ করেন কিন্তু ১৮৯৮ সালে মিশর ও গ্রেট ব্রিটেন পুনরায় যৌথ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। ১৯৫৩ সালে, গ্রেট ব্রিটেন ও মিশর সুদানকে স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা দিয়েছিল এবং এটি স্বাধীনতার পথে নিয়ে গিয়েছিল। ১ জানুয়ারি ১৯৫৬ সালে, সুদান পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, একবার স্বাধীনতা লাভের পর সুদানের নেতারা একটি ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা উত্তর ও দক্ষিণ এলাকার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ শুরু করে গৃহযুদ্ধ ১৯৭২ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ১৯৭০, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে সুদান সরকারে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন সাধিত হয়। ২০০০ সালের প্রথম দিকে যদিও সুদান এবং সুদান সরকারের পিপলস্ লিবারেশন মুভমেন্ট/আর্মি (এসপিএলএম/এ) বেশ কয়েকটি চুক্তি নিয়ে এসেছিল, যা দক্ষিণ সুদানকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্নর দিকে অগ্রসর করে।
সুদানের বর্তমান অবস্থা
২০১৯ সালে ওমর আল-বশীরের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদের পর যিনি ৩০ বছরেরও বেশি সময় দেশ পরিচালনা করেছিলেন, তার উৎখাত ঘটে। নতুন সামরিক কাউন্সিল ক্ষমতা হাতে নিয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে নাগরিক শাসনের দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়া এখনো অধরা।
সাম্প্রতিককালে সুদানে অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল-বুরহান, যিনি সুদানের সেনাপ্রধান একইসঙ্গে ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট। আরেকজন হলেন আরএসএফ নেতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো। তিনি ‘হামেদতি’ নামে বেশি পরিচিত। দুজনের মধ্যে আরএসএফের শক্তিশালী এক লাখ সদস্যকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ দ্বন্দ্বের জেরে টানা কয়েকদিনের ব্যাপক উত্তেজনার মধ্যে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। কোন পক্ষ প্রথম গুলি ছুড়েছিল, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। এর জেরে দেশব্যাপী আরএসএফ সেনাদের মোতায়েন করা হয়। যেটিকে সেনাবাহিনী নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে খুব দ্রুত দুই পক্ষের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সশস্ত্র লড়াই সুদানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে আরএসএফ রাজধানী খার্তুমরে বেশিরভাগ অংশ দখল করে ফেলে। টানা দুই বছর লড়াইয়ের পর সেনাবাহিনী ২০২৫ সালের মার্চে আবারও খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।
স্বর্ণের খনিই সংঘর্ষের সূত্রপাত
২০১১ সালে সুদান বিভক্তির পর দক্ষিণ সুদানে তেলের খনির প্রায় ৭৫ শতাংশ চলে যায় ফলে সুদানের অর্থনীতিতে মারাত্মক ধাক্কা লাগে। আল-ফাশির অঞ্চল বর্তমান আরএসএফের অধীনে। সাফ এবং আরএসএফের নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে এ অঞ্চল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সুদানের অর্থনীতির জন্য আরেকটি ধাক্কার অপেক্ষা করছে। কারণ সুদানে স্বর্ণের খনির সিংহভাগ আল-ফাশির অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান আরএসএফ এ খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করছে এমন অভিযোগ রয়েছে। আল-ফাশির অঞ্চলের নেতৃত্বের হাতে স্বর্ণের খনি থাকবে। আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং স্বর্ণের খনি দখলকে কেন্দ্র করেই চলেছে গৃহযুদ্ধ।
এছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞের মতামত বর্তমান বিশ্বের সকল ঘটনা পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক পরিচালিত। আর পশ্চিমা বিশ্বের সকল পলিসি স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিসিস দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং মুসলিম ভূখণ্ড সুদানে চলমান সাফ এবং আরএসএফের মধ্যকার গৃহযুদ্ধও স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিসিস দ্বারা প্রভাবিত।
স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিসিসে দেখিয়েছেন মুসলিম জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৭০ সাল নাগাদ ইসলামী সভ্যতা বিশ্ব শাসন করবে। আর সেই ইসলামফোবিয়া আশঙ্কা থেকেই যেকোনো উপায়ে বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাস করা পশ্চিমাদের পলিসি প্রতিযোগিতা। হোক সেটি মুসলিম জন অধ্যুষিত এলাকায় স্বর্ণের খনি দখল আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বা ধর্ম বিশ্বাস, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আধিপত্য বা সীমানা নিয়ে যুদ্ধ, গণতন্ত্রের নামে সংঘাত, বোম্বিং, পরিবার পরিকল্পনা নীতি বা পারস্পরিক সাংঘর্ষিক কোন নীতি, সেদিকে লক্ষ করার সময় তাদের নেই। এর প্রতিফল হিসেবে হয়তো আমরা ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে মুসলিম জনঅধ্যুষিত এলাকায় বেশি সংঘাত দেখতে পাই; যেমন কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে তুর্কিয়ে-কুর্দিস্তান, নেতৃত্বের লড়াই নিয়ে ইরাক-ইরান ও ইয়ামেন-সৌদি আরব, আদর্শ নিয়ে তালেবান-নর্দান অ্যালায়েন্স, গণতন্ত্রের নামে বাংলাদেশের আন্তঃরাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দল, স্বর্ণের খনি দখল আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে সুদানে গৃহযুদ্ধ ও এর বাইরে নয়।
তবে উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের জনক এডওয়ার্ড সাঈদ হান্টিংটনের জবাব দিয়েছিলেন তার ‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’ বইয়ে। তিনি হান্টিংটনের এ তত্ত্বকে বর্ণবাদী বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন এবং হিটলার যেমনভাবে ইহুদিদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন, হান্টিংটনও তেমনিভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি শ্রেণিকে দাঁড় করাতে চাচ্ছেন বলে মতামত দিয়েছেন।
আরেক বিখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কি এ তত্ত্ব নিয়ে বলেছেন, এটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ফাঁকা স্থানকেই পূরণ করার উদ্দেশ্য নিয়েই তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাদের নাম দিয়ে যেকোনো ধরনের নৃশংসতা চালানো যায়।
আরএসএফ
আরএসএফ গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে। তারা দারফুরের বিদ্রোহীদের কঠোর হস্তে দমন করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে আজমীদের নির্যাতন, গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ বাহিনী ইয়েমেন এবং লিবিয়ায়ও সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আরএসএফ প্রধান সুদানের কিছু সোনার খনির নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানকার সোনা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সুদান সেনাবাহিনীর অভিযোগ, আরএসএফকে সহায়তা করে আরব আমিরাত। আমিরাতের বিরুদ্ধে মুসলিম ভূখণ্ড সুদানে ড্রোন হামলারও অভিযোগ আসছে। যদিও আমিরাত এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এছাড়া পশ্চিম লিবিয়ার শক্তিশালী মানুষখ্যাত জেনারেল খলিফা হাফতারও আরএসএফকে সহায়তা করে বলে অভিযোগ সুদানের সেনাবাহিনীর। তাদের দাবি, আরএসএফকে অস্ত্র; এমনকি সেনা দিয়েও সহায়তা করেন খলিফা হাফতার।
২০২৫ সালের জুনের শুরুতে আরএসএফ লিবিয়া এবং মিশর সীমান্তবর্তী সুদানের বিশাল সীমান্ত এলাকা দখল করে, যা তাদের জন্য বড় জয় ছিল। এরপর তারা অক্টোবরের শেষ দিকে দখল করে আল-ফাশির। যার অর্থ দারফুরের বেশিরভাগ এবং এর পার্শ্ববর্তী কোরদোফান অঞ্চল আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আরএসএফ এসব জায়গায় বিদ্রোহী সরকার গঠন করেছে। অর্থাৎ সুদান আবারও দ্বিখণ্ডিত হওয়ার রাস্তায়।
সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল
সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে সুদানের উত্তর এবং পূর্বাঞ্চল। সুদানের সেনাবাহিনীর মূল সহায়ক হলো মিসর। সুদানের সঙ্গে মিসরের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। কারণ দেশটির সঙ্গে মিশরের আছে বিশাল সীমান্ত। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে আছে নীল নদ। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল বুরহান লোহিত সাগরের পোর্ট সুদানকে তার হেডকোয়ার্টার বানিয়েছেন। আরএসএফ যখন মার্চে রাজধানী খার্তুম এবং রিপাবলিকান প্যালেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল তখন এর প্রতিশোধ নিতে পোর্ট সুদানে তারা ড্রোন হামলা চালায়।
ওই সময় সেনাপ্রধান জেনারেল বুরহান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘খার্তুম এখন স্বাধীন।’ কিন্তু তার এ বিজয় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। শহরটি আরএসএফ প্রায় জ্বালিয়ে দিয়েছিল। হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো বিমান হামলার কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যেটি দুই পক্ষের লড়াইয়ের কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, সেটি অক্টোবরের মাঝামাঝিতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আরএসএফ বিমানবন্দরের আশপাশে ড্রোন হামলা চালানোয় এটি চালুর সময় কয়েকবার পেছাতে হয়েছে।
আল-ফাশিরে গণহত্যা
১৮ মাসের বেশি সময় ধরে দারফুরের সবচেয়ে বড় শহর আল-ফাশির অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল আরএসএফ। ১৮ মাসের অবরোধের পর আরএসএফ আল-ফাশির দখল করতে সমর্থ হয়। কিন্তু তাদের অবরোধের কারণে শত শত মানুষ সেখানে মারা যান, খাবারের অভাবে পড়েন। আরএসএফ সম্প্রতি আল-ফাশিরে শহরে চারপাশে ‘মাটির দেওয়াল’ বানানো শুরু করে, যেন সেখানকার মানুষ শহরে আটকা পড়ে যান এবং কোনো খাবার প্রবেশ না করে। এছাড়া শহরটির পাশের জমজম শরণার্থী ক্যাম্প হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়।
দারফুরের মানুষ মনে করেন আরএসএফ এবং তাদের সহযোগীরা জাতিগতভাবে বৈচিত্র্য এ অঞ্চলটিকে শুধুমাত্র আরবদের অঞ্চলে পরিণত করতে যুদ্ধ চালিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, আরএসএফ দারফুরের মাসালিত এবং অন্যান্য আজমী গোষ্ঠীকে লক্ষ করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল মাসালিত জাতিকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যেটি গণহত্যা।
আইসিসি মামলা
আরএসএফকে সহায়তা এবং গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মামলা করেছিল সুদান। কিন্তু আইসিসি এ মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তারা বলে, সেখানে আইসিসির কোনো বিচারাধিকার নেই। আমিরাত এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, ‘সুদানের সংঘাতে তাদের কোনো অবদান নেই।’ এছাড়া আরএসএফও গণহত্যার দায় অস্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে ‘দারফুরের জাতিগত দ্বন্দ্বে’ তারা জড়িত নয়। কিন্তু জাতিসংঘের তদন্তকারীরা অনেকের সঙ্গে কথা বলে এর প্রমাণ পেয়েছেন। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, আরএসএফের সদস্যরা আজমী নারীদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে এবং তাদের হুমকি দিয়েছে ‘আরব’ শিশুর জন্ম দিতে তাদের বাধ্য করা হবে। আল-ফাশিরে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রয়েছে। যাদের অনেকেই আজমী। আর তাদের ওপরই আরএসএফ ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে।
অট
আফ্রিকান ইউনিয়নের (অট) ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, যেমন জেদ্দায় বার বার ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা সত্ত্বেও কোনো পক্ষই একটি একচ্ছত্র কেন্দ্রীয় সরকার মানতে সম্মত নয়। ফলস্বরূপ সুদানের অন্যতম বৃহৎ সঙ্কট দাঁড়িয়েছে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অভাব, যেটি এ অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত।
সুদানে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের ভূমিকা
সুদানের এক দুঃসময়ে ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন ব্রিগেডিয়ার ওমর হাসান আল-বশীরের নেতৃত্বে সামরিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী সরকার ক্ষমতায় আসে। পূর্ববর্তী সাদেক আল-মাহদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার ফলে সুদান ক্রমশ দারিদ্রপীড়িত পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। দক্ষিণের খ্রিষ্টান বিদ্রোহের কারণে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার চরম হুমকির সম্মুখীন হয়। জর্জ গারাঙ-এর নেতৃত্বে দক্ষিণের খ্রিষ্টান বিদ্রোহ খ্রিষ্টীয় বিশ্বের সার্বিক সহায়তায় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমীনের চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন। কাজেই ওমর হাসান আল বশীর সহযোগিতা চাইলে ইখওয়ান নেতা ড. হাসান তুরাবীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্ট সহযোগিতা দানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিপ্লবী সরকারের অংশগ্রহণ করে।
এ সরকারের মাধ্যমে প্রথমেই রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার সমস্যার সমাধান করা হয়। গঠন করা হয় ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সুদানি জনগণের বাহিনী ‘পিপলস ডিফেন্স’। তারা সুদানি সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। তাদের সাথে যোগ দেয় আফঘান মুজাহিদরা। ফলে দক্ষিণের খ্রিষ্টান বিদ্রোহ পরাজয় বরণ করে এবং জেনারেল জর্জ গারাঙ সাঙ্গ-পাঙ্গসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে পলায়ন করে। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা সমস্যা সমাধানের পর সুদান সরকার খাদ্যসমস্যা ও অর্থনৈতিক সমস্যার ও অসাধারণ সমাধান করে।
ঐক্য প্রচেষ্টায় ওআইসি
জেদ্দা (ইউএনএ)-মুসলিম বিশ্বের জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) নির্বাহী কমিটি সুদানের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে, এর ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে- এমনভাবে- যাতে বাইরের হস্তক্ষেপ এড়ানো যায়।
সৌদি আরবের আমন্ত্রণে, বর্তমান ইসলামিক সামিটের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান, স্থায়ী প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কার্যনির্বাহী কমিটির একটি অসাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়, সৌদি আরবের সদর দফতরে।
কার্যনির্বাহী কমিটি সুদান প্রজাতন্ত্র থেকে নাগরিকদের এবং কূটনৈতিক মিশনগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার এবং সমস্ত প্রয়োজনীয়তা প্রদানের ক্ষেত্রে সৌদি আরর রাজ্যের দুর্দান্ত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে এবং এ বিষয়ে প্রচেষ্টাকারী অন্যান্য দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করেছে। এটি তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রচেষ্টারও প্রশংসা করেছে।
জাতিসংঘের ভূমিকা
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর ২০২৪ সালের হিসাব অনুসারে, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করেছে, যা এ বসুন্ধরার বুকে বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ শরণার্সথী সঙ্কট। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সতর্ক করেছে যে, ১ কোটি ৮০ লক্ষাধিক মানুষ তীব্র অন্নাভাব ও বুভুক্ষায় পতিত।
সুদানের গৃহযুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধ ও সহিংসতা বন্ধে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের দোহায় বিশ্ব সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। গুতেরেস বলেন, সুদানের উত্তর দারফুরের আল-ফাশির এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো ক্ষুধা, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আরএসএফের আল-ফাশির দখলের পর থেকে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। তাদের অবরোধের ফলে লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ আটকা পড়েছে। অপুষ্টি, রোগ ও সহিংসতায় মানুষ মারা যাচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অস্ত্রবিরতি সমর্থন করার বিষয়ে আলোচনায় বসেছে সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ)। (নভেম্বর ৫, ২০২৫; বাংলাদেশ প্রতিদিন)।
জাতিসংঘের The United Nations Office for the Coordination of Humanitarian Affairs (OCHA) জানিয়েছে যে সাফ এবং আরএসএফ উভয়পক্ষের দ্বারা আল-ফাশিরে মানবিক (সাহায্য) ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত মানবিক সংকটকে আরো ভয়াবহ করে তুলছে।
বিশ্বমানবতা রক্ষায় মুসলিম ভূখণ্ড সুদানের গণহত্যা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। সেটি স্বর্ণের খনি দখল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বা ইসলামফোবিয়ার সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের প্রভাব- যে কারণেই সংঘটিত হোক না কেন, এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বকে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের ন্যায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। আরব আমিরাত কে প্রমাণ করতে হবে স্বর্ণের জন্য সুদানের মুসলিমদের গনহত্যায় তার কোন দায় নেই। যদি দায় থাকে মুসলিম বিশ্বকে ইখওয়ানুল মুসলিমিন হিসাবে আরব আমিরাতকে ভ্রাতৃঘাতী গণহত্যায় ইসলামী হুকুম অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করে মুসলিম ভূখণ্ড সুদানকে একটি সরকারের আওতায় আনার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বকে সতর্ক থাকতে হবে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রই যেন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি না করতে পারে।
সূত্র : Aljayeer, CIA, State Department, BBC
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]