রাজনীতির ‘দুষ্টগ্রহ’ জাপা ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন?


২০ নভেম্বর ২০২৫ ২১:১৩

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে অনৈতিক ও অপসংস্কৃতির আবর্তে নিপতিত করার যে প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগের হাত ধরে প্রবর্তিত হয়, তার অন্যতম সহযোগী ছিল জেনারেল এরশাদের হাতে গড়ে ওঠা জাতীয় পার্টি (জাপা)। চলমান একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মাঝপথে বাধাগ্রস্ত করা এবং অগণতান্ত্রিক পন্থায় একে দীর্ঘসময় ধরে আঁকড়ে থাকার রীতির প্রচলন করে এ দলটি। এজন্য এ দলকে রাজনীতি বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের রাজনীতির দুষ্টগ্রহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এরশাদের সেই ‘দশটা হোন্ডা বিশটা গুণ্ডা ইলেকশন ঠাণ্ডা’ নীতি পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা ব্যবহার করেন সফলভাবে এবং অব্যাহতভাবে। যেজন্য জাপা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে উঠে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবে মূল অপশক্তি আওয়ামী লীগ ভেসে গেল। কিন্তু রাজনীতির ‘দুষ্টগ্রহ’ জাপা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল কেন? এমনকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সঙ্গে জাপার রাজনীতিও নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি একসময় উচ্চকিত হলেও পরবর্তীকালে সেই উচ্চারণের মাত্রা স্তিমিত হয়ে যায়।
এরশাদের গণতন্ত্র উচ্ছেদ প্রকল্প
দেশ যখন মূলত একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছিল, সেসময় জেনারেল এরশাদ তার অবৈধ অভ্যুত্থানকর্ম সম্পাদন করে দেশকে অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার আবর্তে ঠেলে দেন। বলা যেতে পারে এটি ছিল এরশাদের গণতন্ত্র উচ্ছেদ করার সূচনা পর্ব। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশে সামরিক আইন জারি করেন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। এ সময় মন্ত্রিসভা বাতিল করা হয়, সংসদ ভেঙে দেয়া হয় এবং সংবিধান স্থগিত করা হয়। কিছুদিন পর সুযোগ বুঝে এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদও দখলে নেন।
যাহোক, পদ থেকে এরশাদ তাঁর আমলে ১৯৮৪ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ১৯৮৫ সালে গণভোট, ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৮৮ সালে আরেকটি সংসদ নির্বাচনসহ অনেকগুলো নির্বাচন আয়োজন করেন। কিন্তু এ নির্বাচনগুলো তার সরকারের জন্য বৈধতার চেতনা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর এরশাদের বিরুদ্ধে বিরোধীদলগুলো সম্মিলিতভাবে আন্দোলন চালিয়ে যায়। এর পরিণতিতে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর পতন হয়। কিন্তু এরশাদের পতন ঘটলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধার মাধ্যমে রাজনীতিতে টিকে থাকতে সমর্থ হয় জাতীয় পার্টি।
মহাজোটের শরিক জাপা
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আ’লীগকে দীর্ঘসময় ক্ষমতা ধরে রাখতে ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে গঠিত হয় মহাজোট। এ মহাজোটের শরিকরা দীর্ঘসময় সরকারি দলের কখনো মন্ত্রিত্ব উপভোগ করেছে, কখনো সংসদ সদস্য পদ নিয়ে এবং সংসদের বিভিন্ন কমিটিতে থাকার সুবাদে সরকারের প্রতিটি অপকর্মে কোনো না কোনোভাবে দায়ভুক্ত থেকেছে। সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে গণতান্ত্রিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া ধ্বংস করার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপন্নতার দায়ও তাদের ওপর অনিবার্যভাবে বর্তেছে। সে কারণে এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, পতিত আওয়ামী সরকারের প্রতিটি অপকর্মের দায় আছে এ জাতীয় পার্টির।
ডামি বিরোধীদল জাপা
আ’লীগকে তার মুরুব্বিরা কেবল ক্ষমতার দখল নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা বিরোধীদল বলে যে শক্তির কথা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভাবা হয়, সেটিও দখলে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, জাপা ছিল রিমোট কন্ট্রোলের একটি প্ল্যাটফর্মমাত্র। অন্য দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এটি সময়মতো কাজে লাগানো হয়। বিশেষত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বলয়ের পক্ষে শক্তি জোগানোর মাধ্যমে আড়ালে একটি দেশের স্বার্থ রক্ষাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। জনগণের ভোট বিভক্ত করে ওই দেশের পছন্দনীয় দলটিকে নির্বাচনে সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে বার বার। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট বিশ্লেষণ করলেই এটা বোঝা যায়। জাতীয় পার্টিকে নানাবিধ উপঢৌকন দেয়ার পাশাপাশি তাদের অন্ধকার সব প্রামাণ্য দলিল হাতে রেখে আ’লীগের অভিভাবক দেশটি জাপাকে ব্যবহার করে এসেছে। একটি ডামি বিরোধীদলের প্রয়োজনও তাদের দিয়ে মিটিয়ে নেয়া হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করা
দেশের নির্বাচন ও ভোট ব্যবস্থা ধ্বংসের অন্যতম সহযোগীও এই জাপা। এরশাদের সেই ‘দশটা হোন্ডা বিশটা গুণ্ডা ইলেকশন ঠাণ্ডা’ করার ‘মহান’ বাণীকে ধারণ করেই মহাজোট তার নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে এসেছে। বিশেষ কর ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে জাপাকে গৃহপালিত বিরোধীদল হিসেবে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া করতে গিয়ে মনোনয়নপত্র পূরণ ও তা জমা দেয়া নিয়ে এক ঘৃণ্য পন্থা ও অপকৌশল অবলম্বন করা হয়, যা দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে।
সুজাতা সিংয়ের ষড়যন্ত্র
২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কিছু টানাপড়েন সৃষ্টি হলে তা নিরসন করতে ছুটে আসেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের এ সফরকালে অযাচিতভাবে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপমূলক বাক্য উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায় ভারত। মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদের উত্থান তারা দেখতে চায় না।’ ঢাকা সফরের প্রথম দিনে সুজাতা সিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি এখন সবচেয়ে আলোচিত বলে উল্লেখ করা হয় গণমাধ্যমে। সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পরই এরশাদ দাবি করেন, সুজাতা সিং তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুরোধ করেছেন। এরশাদের ভাষায়, সুজাতা বলেছেন, ‘জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না গেলে জামায়াত-শিবিরসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান হবে, তারা ক্ষমতায় আসবে।’ এরশাদ বলেন, ‘যদি জামায়াতের উত্থান হয়, তাহলে এর দায় সরকারের। জামায়াতের উত্থান হোক, এটা আমিও চাই না।’ এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জামায়াতকে নিয়ে সুজাতা সিংয়ের এ মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান জামায়াতের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভারতের নিকট থেকে আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করি। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশ সফরে এসে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল নির্বাচিত হলে জামায়াত-শিবিরসহ মৌলবাদী শক্তির উত্থান হবে’ মর্মে যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে বাংলাদেশের জনগণ বিস্মিত হয়েছে।” বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘জামায়াত-ছাত্রশিবির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। জামায়াতের ইতিবাচক ভূমিকায় জামায়াতের জনসমর্থন ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জামায়াতের আহ্বানে সাড়া দেয়ার অধিকার দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই রয়েছে। এক্ষেত্রে জামায়াতের উত্থান ঠেকানোর জন্য ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, পছন্দ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের শামিল।’
রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক আচরণ
২০২৩ সালের আগস্টে তিনদিনব্যাপী ভারত সফর করেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সেখান থেকে দেশে ফিরে এসে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এ সফরে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তবে ‘ভারতের অনুমতি ছাড়া’ এসব বিষয়ে বিস্তারিত তিনি বলতে পারবেন না বলে জানান। জিএম কাদের বলেন, ‘আমি ভারত সরকারের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আমার খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। সেই আলাপ কার সঙ্গে হয়েছে এবং কী বিষয়ে হয়েছে, সেটি বিস্তারিত কিছু বলতে পারবো না। তারা যদি প্রকাশ করতে চান, করবেন। কিন্তু তাদের অনুমতি ছাড়া আমি কিছু বলতে পারব না।’ তার এ বক্তব্যে দেশে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করবেন আবার কী বিষয়ে আলোচনা হলো, তা প্রকাশে ভারতের অনুমতি নিতে হবে! এটি কি রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়? বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে জিএম কাদের বলেন, ‘আমার একটা জিনিস ভালো লেগেছে যে জাতীয় পার্টি সম্পর্কে তাদের ধারণা ভালো। জাতীয় পার্টিকে তারা সম্ভাবনাময় দল মনে করে। তারা এটাও প্রত্যাশা করেছেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে ভারতের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আগেও ছিল এবং সামনেও থাকবে।’
দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার নয় কেন
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সিঙ্গাপুর, লন্ডন, সিডনিতে বিপুল অর্থ পাচার করেছেনÑ এমন তথ্য পেয়েছে বলে জানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত মার্চ মাসে (২০২৫) এ তথ্য জানানো হলেও এখন পর্যন্ত তাঁকে আইনের আওতায় আনার তথ্য পাওয়া যায়নি। দুদকের সে সময় দেয়া তথ্যমতে, জালিয়াতি করে জাতীয় পার্টির পদ গ্রহণ এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতে জড়িয়ে বিপুল পরিমাণে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। দুদকের গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জানা গেছে, জিএম কাদের ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মনোনয়নে ১৮.১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। এ অর্থ গ্রহণের মূল সুবিধাভোগী তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের। চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে দলীয় পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তার স্থলে জিএম কাদেরের স্ত্রী শরিফা কাদের সংসদ সদস্য হন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে পদ বাণিজ্য ও অর্থ পাচারেরও তথ্য পেয়েছে দুদক। তার বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর, লন্ডন, সিডনিতে অর্থ-সম্পদ পাচার ও দেশে বিপুল পরিমাণে সম্পদ গড়ার তথ্য পেয়েছে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
উসকানিমূলক বক্তব্য
আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত অনুচর জাপা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধেও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ২৩ অক্টোবর তিনি ‘অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে’ বলে উসকানি দেন। ফ্যাসিবাদের দোসর একটি দলের প্রধানের মুখ থেকে জাতি এ ধরনের বক্তব্য আশা করে না। জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমান সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নামে অনৈক্য কমিশন তৈরি করেছে। তারা (কমিশন) দেশের অর্ধেক লোককে বাদ দিয়ে ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছেন। আমি মনে করি, এটা একটা বড় ধরনের ষড়যন্ত্র দেশের বিরুদ্ধে। দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র। আমি হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, দেশের মানুষ এগুলোকে ক্ষমা করবে না।’ তিনি বলেন, ‘তারা আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েছে। এটার আমি কোনো অর্থ দেখি না। আওয়ামী লীগকে আপনি দল হিসেবে বাদ দিতে পারেন না। আপনি যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিতে চান, তাহলে মামলা করে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে বিচার ছাড়া, নির্বাহী আদেশে, বিচার ছাড়া।’ এ বক্তব্য দিয়ে তিনি প্রকারান্তরে নিষিদ্ধ ফ্যাসিবাদের পক্ষেই দালালী করেছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
রাজনীতিসংশ্লিষ্ট চরিত্র ধ্বংস
জাতীয় পার্টি; বিশেষত তার জনক এরশাদ দেশের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলোকে ধ্বংসের সূচনা করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ কয়েকগুণ মাত্রায় ব্যবহার করে। এরশাদের শাসনকালের এক সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নে একজন লেখক উল্লেখ করেন, “এরশাদের পৌনে ৯ বছরের শাসন আমল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে অভিহিত ও চিহ্নিত নানা কারণে। ১৯৮২ সালে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এরশাদ তাঁর নিজের ভাবমূর্তি গড়ার এবং পরবর্তীতে নিজের ও নিজ রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশনসহ সকল প্রচারমাধ্যমকে গোয়েবলসীয় কায়দায় অপব্যবহার করেন লাগামহীনভাবে; বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের মে মাসে তৃতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচনকালে এবং ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে চতুর্থ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর এরশাদ রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশনকে সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক দলীয় প্রচারে অপব্যবহার করেন একচ্ছত্র। প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংবাদ সম্প্রচারকালে ক্রমানুসারে এরশাদ সাহেব, তার পর রওশন এরশাদ ও তার সরকারের মন্ত্রীদের এবং নানা উপলক্ষে তাদের এমনভাবে এতক্ষণ ধরে দেখানো হয়, যার ফলে জনগণ ব্যঙ্গ করে সে সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’ হিসেবে অভিহিত করে। প্রতি শুক্রবার এরশাদ সাহেব বিশেষ হেলিকপ্টারে ও সঙ্গে বিমানবাহিনীর আরও কয়েকটি হেলিকপ্টারে রাষ্ট্রপতির বিশেষ দেহরক্ষী (নিরাপত্তা) বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে জুমার নামাজের উছিলায় যেতেন আটরশির ‘ভণ্ড’ পীরের আড্ডাখানায়। সে কাজে এরশাদ সাহেব তাঁর পৌনে ৯ বছরের শাসন আমলে বেহিসেবি অজস্র রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদাদির অপচয় করেন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও খামখেয়ালিভাবে।
এরশাদ নিজে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ ও দলের প্রায় সকল সদস্য; বিশেষ করে তাঁর পত্নী রওশন এরশাদ এবং রওশন এরশাদের বোন ও নিকট আত্মীয়-স্বজনরা নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ লুটপাটে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন। সেসব কাজে তারা বহু দুর্নীতিবাজ আমলা, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেন। সে সুযোগে এরশাদ সাহেবের পৌনে ৯ বছরের শাসন আমলে সেসব দুর্নীতিবাজ আমলা, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও অসদুপায়ে টাকার পাহাড় বানান। এরশাদের চারিত্রিক দুর্বলতার সুযোগ ব্যবহার করে অনেক সুন্দরী মহিলা শিল্পী, টেলিভিশনের সংবাদ পাঠিকা ও ঘোষিকা এবং তথাকথিত সমাজসেবী ও রাজনৈতিক কর্মী সুন্দরী মহিলারাও দুনীতি ও অসদুপায়ে প্রচুর অর্থ-সম্পদাদির মালিকে পরিণত হন। এককথায় বলা যায় যে, এরশাদের শাসন আমলে তার নারীঘটিত কায়কারবারে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা পৌরাণিক বৃন্দাবনের কাহিনীকে স্মরণ করিয়ে দিতো। সবচেয়ে নিন্দনীয় যে কাজটি এরশাদ করেন তা ছিল অঢেল টাকা-পয়সা বিতরণ, সুযোগ-সুবিধা প্রদান, দুনীতি ও নানা অন্যায়-বিবেকহীন কাজে প্রশ্রয়দানের মাধ্যমে ছাত্রসমাজের নৈতিক চরিত্র লেখাপড়া ও জ্ঞান অর্জনের মনমানসিকতা সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করা হয়। নানা অজুহাতে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব শিক্ষায়তন বন্ধ ঘোষণা দিয়ে একনাগাড়ে সেসব বন্ধ রেখে তার শাসন আমলে এরশাদ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও পঙ্গু করে ফেলেন। একই সঙ্গে ছাত্রসমাজের মধ্যে সশস্ত্র ও মাস্তান-সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এরশাদ শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিনষ্ট করেন দারুণভাবে। সুযোগ-সুবিধা-সম্পদাদির অপব্যবহারের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁর নিজের এবং রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির সেসব সভা-সমাবেশ আয়োজনে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদাদিই নয়, তিনি সর্বস্তরের প্রশাসনকে ব্যবহার করেছেন বেপরোয়াভাবে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, সুদীর্ঘ পৌনে ৯ বছর শাসন আমলে এরশাদ দেশের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে নানাভাবে কলুষিত করেছেন।” এরশাদের রেখে যাওয়া দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ তার কয়েকগুণ উসুল ও হাসিল করে নেয়। যে কারণে পলায়নের শেষ সময় পর্যন্ত জাপা ছিল আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সহযোগী।