আদেশ জারির পথে সরকার
১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:২৩
॥ ফারাহ মাসুম ॥
রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার জন্য টানা সাত দিন সময় প্রদান ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের তারিখ অথবা প্রশাসনিক আদেশ জারি করার কথা ভাবছে। সরকারের বিভিন্ন সূত্র বলছে, রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠনের উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও ‘জাতীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বিলম্ব করা যাবে না।’ কারণ জুলাই সনদই বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈধতার মূল ভিত্তি। গণভোট প্রতিহত চেষ্টায় রাজনৈতিক অচলাবস্থা আশঙ্কা করে এসব সূত্র বলছে, ‘এখন আর পিছু হটার সুযোগ নেই।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ঐকমত্যের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও গত এক সপ্তাহে বিএনপি, জামায়াত ও জুলাই সনদভুক্ত আটটি দলের মধ্যে কোনো ঐকমত্য গঠিত হয়নি। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই ‘জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ নামে একটি নির্বাহী আদেশ প্রকাশ করা হতে পারে।
এ আদেশের মাধ্যমে তিনটি মৌলিক কাঠামো কার্যকর হতে পারে বলে নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পুনর্গঠন কমিশন (এনআরসি) গঠন; দুর্নীতি ও সম্পদ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং নির্বাচন কাঠামো ও গণভোট প্রস্তুতি কমিশন (ইআরপি কমিশন) প্রতিষ্ঠা।
জুলাই সনদই সাংবিধানিক রূপরেখা : আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই সনদ কোনো দলের কর্মসূচি নয়, এটি জাতির সঙ্গে করা একটি প্রতিশ্রুতি। জুলাই সনদ বিলম্বিত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তাদের মতে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮(ক) অনুযায়ী সরকারের দেশের ‘অন্তর্বর্তীকালীন পুনর্গঠন’ কার্যক্রম পরিচালনায় সম্পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে।
এ অবস্থায় বিরোধ সত্ত্বেও সরকার কি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এ প্রশ্নর জবাবে বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য না হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রশাসনিক আদেশ জারি করতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি যুক্তি আছে-
(ক) ৭ দিনের আলাপ-আলোচনার সময়সীমা শেষ হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠিত হয়নি; সরকারকে এখন ‘অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে নিজের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার কথা ভাবতে হচ্ছে।
(খ) প্রধানমন্ত্রী না থাকায় ‘প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ক্যাবিনেট’ জুলাই চার্টারের ধারা ৩(খ) অনুযায়ী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অর্থাৎ রাজনৈতিক ঐকমত্য না হলেও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ শুরু করা যেতে পারে।
(গ) আন্তর্জাতিকভাবে (বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমারা) গণতান্ত্রিক রূপান্তর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, অর্থাৎ সরকার চাপের মধ্যেই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে কী থাকতে পারে? : বিশ্লেষক সূত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে যে খসড়া-ধারণাগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তিনটি স্তর থাকবে বলে ধারণা করা যায়- প্রথমত, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যার আওতায় থাকতে পারে ‘জাতীয় পুনর্গঠন কমিশন’ (এনআরসি) গঠন; ‘দুর্নীতি ও সম্পদ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন এবং সরকারি নিয়োগ, ভূমি, শিক্ষা, ও ব্যাংক খাতে সিন্ডিকেট সংস্কার অভিযান শুরুর ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক রূপরেখা ঘোষণা। এর আওতায় ট্রানজিশনাল লোকাল কাউন্সিল পুনর্গঠন; গণভোটের জন্য নতুন নির্বাচন কাঠামো অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং নিবন্ধিত দলগুলোর নীতিমালা যাচাই কমিটি (যাতে জঙ্গি, ফ্যাসিস্ট বা বিদেশনির্ভর দল বাদ দেওয়া যায়)।
তৃতীয়ত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ। এর আওতায় জাতীয় সম্পদ ও ব্যাংক সংস্কার পরিকল্পনা; রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতি-২০২৫ (সাম্য ও কর্মমুখী শিক্ষা) এবং ডিজিটাল গোপনীয়তা ও নাগরিক তথ্য সুরক্ষা আইন।
প্রশ্ন হলো- গণভোট প্রতিহত করার প্রচেষ্টা হলে কী ঘটতে পারে? এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকদের মতে, এখানে তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্য দেখা যেতে পারে।
প্রথমত, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। কোনো দল যদি বলে, ‘এটি একতরফা সরকারি রোডম্যাপ’, তাহলে তারা হয়তো গণভোট বর্জন বা বাধা দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে। এতে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়বে, কিন্তু সরকার নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে এগোতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা অচলাবস্থা। কিছু প্রশাসনিক মহল (বিশেষত জেলা পর্যায়ে) যদি সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়নে অনিচ্ছা দেখায়, তখন ‘মাঠ প্রশাসন আইন’-এর আওতায় সেনা বা র্যাবের সহায়তায় নির্বাচন তত্ত্বাবধান কর্তৃপক্ষ সক্রিয় করা হতে পারে।
তৃতীয়ত, বিদেশি হস্তক্ষেপ বা প্রোপাগান্ডা প্রচেষ্টা হিসেবে ভারত বা কিছু পশ্চিমা সংস্থা গণভোটকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বা অনিশ্চিত প্রক্রিয়া’ আখ্যা দিতে পারে; ফলে বিদেশি গণমাধ্যমে বৈধতা বিতর্ক দেখা দিতে পারে। সরকার এ ধরনের প্রচারণা মোকাবিলায় ‘কৌশলগত যোগাযোগ সেল’ সক্রিয় করতে পারে।
যদি সরকার আদেশ জারি করে, তবে এটি হবে ‘সংস্কার বাস্তবায়ন পর্যায়-১’- মূলত প্রশাসনিক স্তরে কার্যক্রম শুরু, আর রাজনৈতিক কাঠামো হবে পরে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী সরকার হয় গণভোটের তারিখ নির্ধারণ করবে, না হলে ‘জনগণের গণভোট অধ্যাদেশ’ পাস করবে নির্বাহী ক্ষমতায়। সংঘাত হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে, তবে জনসমর্থন থাকলে সরকার তার বৈধতা ধরে রাখতে পারবে।
বিএনপির আপত্তি
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে বিএনপি শুরু থেকে নানাভাবে আপত্তি জানিয়ে আসছে। প্রথমে তারা গণভোটের বিরোধিতা করে বলেছে, সংস্কারের কাজ এ সরকারের নয়, এটি নির্বাচিত সরকার এসে করবে। পরে অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির চাপে গণভোটের বিষয়ে সম্মত হয়। এরপর শর্ত দেয় সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট একই দিন হতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট সাধারণ নির্বাচন একই দিন হওয়ার কোনো রেকর্ড না থাকলেও বিএনপি বার বার সেই দাবি করতে থাকে।
আবার সেইসাথে বলে যে, ঐকমত্য কমিশন যাই সনদে বলুক না কেন, বিএনপি যেগুলোয় ভিন্নমত জানিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিএনপি নেবে না। এরপর আবার কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই বলে মত দিলে বিএনপির কোনো কোনো নেতাও সংবিধান অনুসারে গণভোটের বিধান নেই বলে উল্লেখ করতে থাকেন। তখন রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে থাকে- কেন বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তি দেয়ার রাস্তা থেকে দলটি সরে আসতে চাইছে।
অবশ্য বিএনপির মূল নেতৃত্ব এখনো গণভোটের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেনি। তবে তাদের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ নির্বাচনের আগে জুলাই অভ্যুত্থানের আইনি ভিত্তি দেয়া হলে সাধারণ নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সরকার সাধারণ নির্বাচনের তারিখ নিশ্চিত করে এর স্বল্পসময় আগে গণভোটের তারিখ ঠিক করে ভারসাম্যের কথা চিন্তাও করতে পারে, যাতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এড়ানো যেতে পারে।
গণভোট প্রতিহত অপচেষ্টা নিয়ে বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, ‘বিরোধীরা যদি এ আদেশকে একতরফা বলে গণভোট প্রতিহতের পথে যায়, তাহলে দেশে নতুন রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সরকারের জন্য এখন আর পিছু হটার জায়গা নেই। কারণ এটাই তাদের বৈধতার ভিত্তি।’
অন্যদিকে অন্য এক বিশ্লেষক বলেন, ‘জুলাই সনদকে ঘিরে দেশি-বিদেশি শক্তির প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক ও পশ্চিমা সংস্থা ইতোমধ্যে গণভোট প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে। সরকারকে তাই কূটনৈতিক কৌশল ও তথ্যযুদ্ধ উভয় দিকেই শক্ত হতে হবে।’
এ অবস্থায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসন সমন্বয় সেলের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনগুলোকে বিশেষ নির্দেশ পাঠানো হতে পারে- যাতে আদেশ জারির পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত মাঠে নামতে পারে। সরকার গণভোটের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রারম্ভিক সময়কে লক্ষ রাখছে।
নীরব সংঘাতের সূচনা?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হতে পারে মূলত দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের ঘোষিত অঙ্গীকার পূরণের প্রথম ধাপ। কিন্তু ঐকমত্যের অভাবেই এটি এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘সরকার যদি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে, তাহলে এটি হবে দ্বিতীয় দফা জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতা। কিন্তু বিরোধীরা গণভোট প্রতিহতের পথে গেলে সামনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জ হতে পারে।’
সার্বিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি হলে এটি হবে বাংলাদেশের রূপান্তরকালীন ইতিহাসে নতুন অধ্যায়। একদিকে এটি হবে জাতীয় পুনর্গঠনের সূচনা অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাব্য বিস্ফোরণও হতে পারে। এতে জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে পতিত রাজনৈতিক শক্তির কোনো নীলনকশা কাজে আসবে না। সবকিছু বিবেচনায় সরকারের সামনে এখন একমাত্র বিকল্প হলো অগ্রসর হওয়া, তবে একই সাথে সংলাপের পথও খোলা রাখা।