সম্পাদকীয়

৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনাবিরোধীদের জনগণ ক্ষমা করবে না


১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:৫১

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যা পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় ৩৬ জুলাই হিসেবে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার রক্তে লেখা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশের ক্যালেন্ডারে এমন রক্তাক্ত তারিখ নেই। ৩৬ জুলাই একান্তই আমাদের অর্জন। এ অর্জনের নেপথ্যে আছে দীর্ঘ দেড় দশকের এক সংগ্রামের ইতিহাস। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, তার দোসর ১৪ দল এবং জাতীয় পার্টির ক্ষমতার লিপ্সায় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের নির্মম বর্বরতা থেকে ২০০৭-এর ১/১১-তে ভর করে ২০০৮ সালে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে শুরু হয়েছিল নব্য এক আইয়্যামে জাহিলিয়াতের যুগ।
হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী দেশটাকে বাপের তালুক আর জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করেছিলে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রতিবেশী ভারতের কাছে বিকিয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব। গুম, খুন, লুটপাট, ধর্ষণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। গণতন্ত্র হত্যা, অর্থ পাচার, জুডিশিয়াল কিলিং; এককথায় দেশের সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা- সাম্য (ইনসাফপূর্ণ সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি), মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কবর রচনা গড়ে তুলেছিলো বৈষম্যের পাহাড়। আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা ছাড়া সবাই পরিণত হয়েছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। মানবিক মর্যাদা বলে কিছু ছিলো না। ন্যায়বিচার পাওয়া দূরের কথা, থানা কিংবা কোর্টে সাধারণ নাগরিকদের মামলা পর্যন্ত নেয়া হতো না। বিচারের নামে নাটক সাজিয়ে বিরোধীদলের শীর্ষনেতাদের হত্যা করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে, রাজনৈতিক কারণে তাকে রাখা হয়েছিলো নিঃসঙ্গ কারাগারে। নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ও বিরোধীদলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে।
ভিন্নমত দলন ও দমনে নিবর্তনমূলক নতুন নতুন আইন করে বন্ধ করেছে ভিন্নমতের টেলিভিশন চ্যানেল। পত্রিকা অফিসের প্রেসে তালা ঝুলিয়ে প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও দলীয় মাস্তানরা পত্রিকা অফিসে এসে প্রবীণ সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নিয়ে হেনস্তা করেছে, আদালতে হাজিরা দিতে গেলে পুলিশের উপস্থিতিতে খুনের উদ্দেশ্যে হামলার ঘটনা ছিল ফ্যাসিস্টদের ভীতির রাষ্ট্র কায়েমের অপকৌশল। দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতাদের হত্যা এবং কেন্দ্রীয়সহ সব কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে সত্য ও ন্যায়ের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা করেছে মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। কথায় কথায় জেল-জুলুম-রিমান্ডে গোটা দেশ একটি বড় কারাগারে পরিণত হয়েছিল।
তবে এত অত্যাচার-নির্যাতনের পরও এদেশের মানুষ দমে যায়নি। তারা ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের শিকল ভাঙার প্রত্যয়ে ‘মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী’, ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগানে স্লোগানে দেশের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বুলেট-বোমার সামনে বুক পেতে দিয়ে দেশটাকে ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই তৃতীয়বারের মতো স্বাধীন করেছে।
পুরনো বন্দোবস্ত ভেঙে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, বৈষম্যমুক্ত একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার সেই প্রত্যয় বাস্তবায়ন কি শুধু সরকার বদলের মাধ্যমেই সম্ভব। এ কথা দেশের মানুষ বিশ্বাস করে না। তাই তারা চায় বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকারনামা। জুলাই সনদ নামের এ অঙ্গীকারনামা জনগণের ভোটে পাস করলেই সম্ভব এদেশের মাটিতে চিরতরে ফ্যাসিজমের কবর রচনা করা। তা না হলে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হবে। ইতিহাস এ ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না। এ প্রজন্মের যারা জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম করে শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করেছেন এবং সুস্থতা থেকে প্রত্যাশার আলোকে দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন, তারাও মাঠ থেকে প্রস্থান করবে না। এ সংগ্রাম চলবেই। তাই ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই চেতনার বিপক্ষে যারা আছেন, এখনো সময় আছে ভিন্ন দেশের দালালি ছেড়ে আসুন। জুলাই চেতনার আলোকে দেশ গড়ার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করুন।