পাখির জন্য মমতা


৬ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৩৬

গাজী আবদুস সালাম : উপজেলায় নতুন ইউএনও এসেছেন। ভদ্রলোক বেশ হাসি-খুশি ও মিশুক স্বভাবের। ইউএনও অফিসে সবসময় লোকজনের যাতায়াত থাকেই। নানা ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য মানুষ সেখানে ছুটে আসে। ইতোমধ্যে লোকমুখে ইউএনওর সদয় ব্যবহারের সুনাম ছড়িয়েছে। অফিস সময়ের পরও তিনি মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে যেকোনো মানুষ তাঁর কাছে সহজেই যেতে পারে। কোনো ঝক্কি-ঝামেলা হয় না। কখনো এমন হয়নি যে তিনি কারো কথা শুনতে বিরক্তিবোধ করছেন।
নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ইউএনওকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। আজ খাস খাল দখলের সুরাহা তো কাল বাল্যবিবাহ নিরোধের পদক্ষেপ ইত্যাদি। সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিভিন্নজনের কাছ থেকে উড়ো হুমকি-ধামকি ও আসে। কেউ কেউ নানা প্রলোভনও দেখায়। কিন্তু ভদ্রলোক সৎ ও সাহসী স্বভাবের হওয়ায় ওসবে কান দেন না একটুও, বরং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন।
উপজেলার আশপাশে নদনদী ও খাল-বিলের দেখা মেলে। এসব এলাকায় বিভিন্ন ধরনের পাখি দেখতে পাওয়া যায়। পাখি শিকারির সংখ্যাও নেহাত কম নয় ওই এলাকায়। তবে ফাঁদ দিয়ে তারা যা শিকার করে, সেগুলো রান্না করেই খেয়ে ফেলে। এজন্য আইনের আওতায় ওদের আনাটা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
একটা লোক সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ ইউএনওর বাসার দরজার সামনে গিয়ে হাজির। দরজায় আলতো ঠকঠক করতেই একজন ভদ্র মহিলা দরজা খুলে দিলেন।
– কাকে চাই?
লোকটি আমতা আমতা স্বরে বলল, ‘জি, স্যার কি বাসায় আছেন?’
Ñ ঠিক আছে একটু অপেক্ষা করুন, আমি ডেকে দিচ্ছি। ভদ্র মহিলা জবাব দিলেন।
ইউএনও সোফায় বসে বই পড়ছিলেন। তাঁর জন্য কেউ অপেক্ষা করছে শুনে তিনি দরজার বাইরে এলেন। তাকে দেখে লোকটির মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটল। কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায়। লোকটির হাতে অনেকগুলো বিলের পাখি ঝোলানো ছিল। এটি দেখে ইউএনওর ভ্রু কুঁচকে উঠল।
Ñ আপনার হাতে এগুলো কী? কোথা থেকে নিয়ে এলেন? আর কেনই-বা নিয়ে এলেন, বলুন তো? একটু রাগত স্বরে বললেন তিনি।
Ñ এগুলো বিলের পাখি, স্যার। পাশের বিল থেকে ধরে নিয়ে এসেছি। খেতে খুব মজা, স্যার। আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।
Ñ এটা আপনি মোটেও ঠিক করেননি। আপনি ভাবলেন কীভাবে আমি একটি বেআইনি কাজ করব? দেখুন, এই পাখিগুলোর বাসায় তো বাচ্চা থাকতে পারে। কত দূরদূরান্ত থেকে এসেছে এরা খাবারের সন্ধানে। এদের বাচ্চাগুলো মা-বাবার জন্য তো অপেক্ষায় থাকতে পারে, তাই না?
তাছাড়া পরিবেশ রক্ষায় এসব পাখি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আপনি যা করেছেন তা আইনগত ও মানবিক উভয়ভাবেই অন্যায়। এখনই ছেড়ে দেন এগুলো আমার সামনেই। মোটেও দেরি করবেন না।
লোকটি ভীষণ লজ্জিত হলো। ইউএনওর কাছে দুঃখ প্রকাশ করল। তখনই পাখিগুলো খোলা আকাশে মুক্ত করে দেওয়া হলো।
ইউএনও তাকে ঘরে বসালেন। বললেন, ‘আপনার কোনো সমস্যা থাকলে আমাকে বললেই পারতেন। তার জন্য কোনো তদবির বা উপঢৌকনের প্রয়োজন ছিল না। আমি তো আপনাদেরই সেবক, তাই না? দেখুন, পশু-পাখিদের প্রতি আমাদের সদয় হওয়া উচিত। মানুষ যেমন প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনি পাখিরাও।
আপনার কি মনে নেই? সেই ছোটবেলার আমাদের প্রিয় নবীজি সা. ও একটি মা পাখির গল্প? তিনি কতই না দয়ালু ছিলেন পশু-পাখির প্রতি। আমরাও তাঁর থেকে শিক্ষা নিতে পারি।’
ইউএনওর কথা শুনে লোকটির হৃদয় খুলে গেল। সে একটি নতুন মানবিক পথের সন্ধান পেল।
লোকটিকে চা-নাশতা করানো হলো। শেষে সে ইউএনওকে বলল যে, এমন ভুল আর কখনো করবে না। এখন থেকে সে পাখিদের প্রতি অবশ্যই মমতা দেখাবে। একটা সালাম দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল সে। ইউএনওর মুখে তখন হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। তাঁর হৃদয়ে এক অন্যরকম শীতলতা বইতে শুরু করল।
মসজিদ থেকে এশার আজানের সুমধুর সুর ভাসতে লাগল। ইউএনওঅজু করে ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে রওনা হলেন।