দেশজুড়ে ডেঙ্গু ঢেউ


২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:২৯

আক্রান্ত ষাট সহস্রাধিক, মৃত্যু আড়াইশ’
স্টাফ রিপোর্টার : দিন যাচ্ছে আর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে শত শত মানুষ। প্রাণ হারাচ্ছে প্রতিদিনই। গত ২০ অক্টোবর সোমবারও চারজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৯৪২ জন মানুষ। অর্থাৎ ডেঙ্গুর ঢেউ চলছে রাজধানীসহ সারা দেশে। এটি থামানোর কার্যকরী কোনো প্রচেষ্টা নেই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দায়িত্ব হচ্ছে এডিস মশা নিধন করা। কেননা এডিস মশার কামড়েই মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে কোনো সিরিয়াস হচ্ছে না। ঢাকার অধিকাংশ এলাকায়ই মশা মারার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। ফলে মশা বাড়ছে, আর মশার কামড়ে বাড়ছে ডেঙ্গু, এতে বাড়ছে আক্রান্ত ও ঘটছে প্রাণহানিও। গত ২০ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২৪৯ জনের এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬০ হাজার ৭৯১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, চলতি অক্টোবরে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৪৯ রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছেন ৫১ জন। ২০ অক্টোবরের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার ৮৪০ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। যার মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ১৯ জন, বাকি ১ হাজার ৮২১ জন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, এ বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন, মার্চে ৩৩৬ জন, এপ্রিলে ৭০১ জন, মে’তে ১ হাজার ৭৭৩ জন, জুনে ৫ হাজার ৯৫১ জন, জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪ জন, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার ৮৬৬ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, এপ্রিলে ৭ জন, মে’তে ৩ জন, জুনে ১৯ জন, জুলাইয়ে ৪১ জন, আগস্টে ৩৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৭৬ জন মারা গেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন মৌসুমি রোগের সীমা পেরিয়ে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ঢাকায় যেমন রোগীর চাপ বাড়ছে, তেমনি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। আগের বছরগুলোর তুলনায় রোগী বেড়েছে কয়েকগুণ। ড. কবিরুল বাশার একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ডেঙ্গু এখন জাতীয় এক গভীর সংকটের নাম। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি মৌসুমের সীমা ভেঙে বছরব্যাপী আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়, কারণ তখনই এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যায়। আমাদের গবেষণা বলছে, এ বছর লার্ভাযুক্ত পানির পাত্রের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। ফুলের টব, ড্রাম, কলস, নির্মাণাধীন ভবনের পানি কিংবা প্লাস্টিক বোতলের মতো জায়গায় বিপুল পরিমাণ লার্ভা জন্ম নিচ্ছে। আর প্রতি কনটেইনারে লার্ভার সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অর্থাৎ একেকটি উৎস থেকেই এখন অনেক বেশি মশার উৎপাদন হচ্ছে। চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু দুটিই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়, তাই এ প্রজনন বৃদ্ধিই রোগ দুটির বিস্তারকে একসঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য সবার আগে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করতে হবে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। তবে চলতি অক্টোবরে এখন পর্যন্ত মৃত্যু ও সংক্রমণ আগের যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি। এ মাসে শুরু থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। সপ্তাহখানেক বৃষ্টি কমেছে। সাগরে নিম্নচাপ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হলে ডেঙ্গু বিস্তারকারী এডিসের বিস্তার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।