রাসূল মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই


৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:০১

॥ হাফিজা তাহিরা হ্যাপি ॥
আমাদের প্রিয়নবী ও রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা. ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে আরবের মরুপ্রান্তরে মক্কা নগরে যখন জন্মগ্রহণ করেন, তার আগে বিশ্ব ছিল অশান্ত। কারণ মানবজাতির সামনে কোনো আদর্শ ছিলো না। হজরত মুহাম্মদ সা. পৃথিবীতে আগমনের ৫০০ বছর আগে আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ.-কে তিনি আসমানে তুলে নিয়েছেন। তার শিক্ষা ভুলে গিয়ে বিশ্বমানবতা এক চরম আদর্শ সংকটে পথহারা হয়ে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ডুবে ছিলো। সেই অন্ধকার দূর করে বিশ্বকে শান্তি আর সত্যের আলোয় ভরিয়ে দিতে এই মাটির ধরায় আসেন আদর্শ মানব হজরত মুহাম্মদ সা.।
নবী ও রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা. আদর্শ মানব। আদর্শ শব্দের অর্থ কারো অজানা নয়। আদর্শ হলো যাকে অনুসরণ করা যায়। ইংরেজি প্রতিশব্দ মডেল। এখন প্রশ্ন হলো- মুহাম্মদ সা.কে কেন অনুসরণ করবে- এর এককথায় উত্তর, আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজেকে গঠন করতে তাঁকে অনুসরণ করতেই হবে। প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তাঁকে অনুসরণ করতে হবে। প্রকৃত মুসলিম হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলে দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির জন্য তাঁকে অনুসরণ করার বিকল্প নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানা’। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এ কথা বলেছেন কুরআনের সূরা আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে এ কথা, আমরা সবাই জানি ।
তিনি শুধু এ কথা জানিয়েই শেষ করেননি যে রাসূল উত্তম আদর্শ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রাসূল সা.কে অনুসরণ করার নির্দেশও দিয়েছেন।
সূরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তাদের, যারা তোমাদের দায়িত্বশীল”। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে (ব্যক্তি) রাসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল; আর যে মুখ ফিরিয়ে নিল, আমি তাদের জন্য আপনাকে প্রহরীরূপে প্রেরণ করিনি।’ (সূরা নিসা : ৮০)।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ঈমানদার হতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তাদের পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি ও সব মানুষ থেকে অধিক প্রিয়তম না হবো।’ (বুখারি)।
আমরা যারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর জীবনকে আদর্শরূপে গ্রহণ করব, তারা অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার রহমত লাভ করব। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘রাসূল মুহাম্মদ সা. রাহমাতুল্লিল আলামিন।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় বান্দা ও বন্ধু রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা.কে রাহমাতুল্লিল আলামিন মর্যাদা দিয়েছেন।
সূরা আল-আম্বিয়ার ১০৭নং আয়াত হলো: ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন।
তিনি জগৎসমূহের জন্য রহমত। তার কাছে এমন অমূল্য জিনিস আল্লাহ জগদ্বাসীর জন্য দিয়েছেন। যার কারণে আল্লাহ তাঁকে এমন মর্যাদা দান করেছেন?
তিনি পৃথিবীবাসীর কাছে কী নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, সে সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সূরা আস সফের ৯নং আয়াতে বলেছেন, তিনি সেই মহান সত্তা, যিনি রাসূল পাঠিয়েছেন সত্য দীন (জীবনব্যবস্থা) দিয়ে যেন সকল জীবনব্যবস্থার ওপর তা বিজয়ী করেন, এতে মুশরকিরা যত অসন্তুষ্টই হোক না কেন?’
আল্লাহর দীন বা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই রাব্বুল আলামিনের সকল আলম বা জগৎ রহমতে পূর্ণ হয়। আল্লাহর বিধান এবং রাসূল সা.-এর প্রকৃত আদর্শের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
কিন্তু এ বিধান বাস্তবায়ন সহজ নয়। আল্লাহর সাথে শিরককারী মুশরিকরা এতে অসন্তুষ্ট হবে, কাফেররা যুদ্ধ ঘোষণা করবে। এমন সকল বাধা মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যেতে। তবে আল্লাহ তায়ালা তাও জানিয়ে দিয়ে এ সূরা সফের ১০-১৩নং আয়াতে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার কথা বলব, যা তোমাদেরকে পীড়াদায়ক আযাব হতে রক্ষা করবে? তোমরা ঈমান আন আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ এবং জীবন দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম; যদি তোমরা বুঝ। তিনি তোমাদের গুনাহ-খাতা মাপ করে দিবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত এবং বসবাসের জন্য অতীব উত্তম বাসস্থান দান করবেন চিরস্থায়ী জান্নাতে, এটাই বিরাট সাফল্য এবং আরো একটি অনুগ্রহ দেবেন, যা তোমরা পছন্দ কর; আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং নিকটবর্তী বিজয়। (হে রাসূল) মুমিনদের এর সুসংবাদ জানিয়ে দিন।’
আর এ কাজ তাদের দ্বারাই সম্ভব, যারা জান্নাতের বিনিময়ে জান ও মাল আল্লাহর কাছে বিক্রি করেছেন। সূরা আত-তাওবার ১১১ ও ১১২ নং আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন, ‘যেখানে তিনি তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন এবং জান্নাত প্রতিদান হিসেবে দেবেন। মুমিনদের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত করেছেন।’ ১১২নং আয়াতে মুমিনদের কিছু গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যেমন আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান, তাঁর পথে জিহাদ এবং আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ উৎসর্গ করা।’
আমরা যারা রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা.কে জীবনের আদর্শ হিসেবে কবুল করেছি। তারা জানি, ঈমান, মৌলিক ইবাদত ও নিজের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির পথই তাঁর আদর্শ। তাই আসুন, পবিত্র কুরআন এবং রাসূল সা.-এর সিরাত ও হাদীসের যথাযথ অনুসরণ করি। দীন কায়েমের পথে অবিচল ও অটল থেকে নিজেকে রাসূল সা.-এর যোগ্য উম্মত ও আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বান্দাদের কাফেলা, আজীবন শামিল থেকে দুনিয়া ও আখিরাতকে আলোকিত করি। ওয়া মা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ। আমীন।
লেখক : বাংলা বিভাগের সাবেক প্রভাষক, তানজিমুল উম্মাহ ক্যাডেট মাদরাসা, উত্তরা ঢাকা।