ইসলামী দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য চাই
৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৬
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে মতের ভিন্নতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘এক বাক্সে ভোট আনার’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কওমি মাদরাসাভিত্তিক বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনী জোট করার তৎপরতা চালাচ্ছে। অবশ্য বড় ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরপরই শুধু ইসলামী দল নয়, সব ইসলামী শক্তির ঐক্যের ডাক দিয়েছে। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও সব ইসলামী দলের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ঐক্য প্রক্রিয়া অগ্রসর করতে সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক ইসলামী দল ও সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। খেলাফত মজলিসসহ আরও বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলে সব ইসলামী দলের একটি ভোট বাক্স করার পক্ষে জনমত তৈরি করছে। শুধু ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, দেশের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলাররাও ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী দলগুলো নানা হিসাব-নিকাশ করছে। ইসলামি দলগুলোর শীর্ষনেতারা মনে করছেন, গত ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। পুরোনো কিছু অমৌলিক ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও তা ভুলে সবাই এখন অনেকটাই কাছাকাছি। আগামী নির্বাচনে ইসলামী শক্তির পক্ষে বিশেষ জনমত গড়ে তুলতে চান তারা। ভোট যাতে এক বাক্সে যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে অধিকাংশ দল। ইতোমধ্যে বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে দলগুলোর মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।
ইসলামী দলগুলোর ঐক্য এখনই জরুরি বলে মনে করেন আল্লামা শায়েখ আহমাদুল্লাহ। তিনি এক ইসলামী আলোচনায় বলেছেন, এখন ইসলামী দলগুলোর আর বিচ্ছিন্ন থাকা যাবে না। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আহলে হাদীসের ভাইয়েরা আছেন। এছাড়া হেফাজতে ইসলামসহ অন্য ইসলামী সংগঠনগুলোকে এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে কাঁধে কাঁধ মেলাবার, বুকে বুক মেলাবার। তিনি প্রশ্ন করেন, আর কতকাল শক্তি ক্ষয় করবেন নিজেদের মধ্যে? তিনি বলেন, এবার শক্তি ক্ষয় করুন ইসলামের কমন শত্রুর বিরুদ্ধে।
মুফতি কাজী ইব্রাহিম মনে করেন, সব ইসলামী শক্তির ঐক্যের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ঐক্য বিনিষ্টকারীদের জন্য পরকালে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কপি রাইট বলে একটি আইন আছে। অর্থাৎ ওই আইন বলছে, প্রথম যে নাম নেবে ওনারশিপ বা মালিকানা তারই। ১৯৪৭ সালে এ ভূখণ্ডের ওনারশিপ নিয়েছে যারা, তারাই এই দেশ পরিচালনা করবে। তখন মালিকানা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নেওয়া হয়নি। মানুষ যাতে নিরাপদে তার রবের সিজদা করতে পারে, সেজন্য তখন দেশ ভাগ হয়েছিল। তিনি বলেন, আসছে নির্বাচন সামনে রেখে সব ইসলামী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলেন, এখনো যারা বিদেশি গোলামির রাজনীতি চর্চা করছেন তারা ভুল করছেন। তিনি বলেন, নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে অন্য কারো গোলামির চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। ইসলামী দল ও সংগঠনগুলোকে মতপার্থক্য ভুলে আগামী নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এই বিশিষ্ট আলেমেদীন।
বাংলাদেশে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মুখপাত্র, ইসলামী পণ্ডিত ও মুুফাস্সির মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী মনে করেন, জাতি আজ মহাসংকট ও পিচ্ছিল পথ অতিক্রম করছেন। এ অবস্থান থেকে জাতিকে উত্তরণে বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। এই ঐক্য হবে দেশ রক্ষা ও ঈমান রক্ষার ঐক্য। দেশ রক্ষা করতে হবে মদিনা সনদের ভিত্তিতে, যেখানে একটি দেশে শুধু মুসলিম নয়, সব ধর্মের অনুসারীদের সমান নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল। আর ঈমান রক্ষার জন্য দরকার ইসলামী ঐক্য। তিনি বলেন, কোনো দলের নেতৃস্থানীয় লোক যদি বলেন, ‘আমরা শরিয়াহ আইনে বিশ্বাসী নই’, তাহলে তার আকিদা যে সহি নয়, তা সুস্পষ্ট। ফলে তাদের সঙ্গে কোনো ইসলামী ঐক্য হতে পারে না। তিনি বলেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষই সহি ইসলামী শাসন চায়। এটি সম্ভব হচ্ছে না শুধু ইসলামের জন্য একটি দল বা একটি ভোট বাক্স না থাকার কারণে। মানুষের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হলে আমাদের ঐক্যের বিকল্প নেই।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, আমরা সবসময়ই ঐক্যের কথা বলে এসেছি। ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য খুবই জরুরি। ইসলামী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আছে, থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি আমাদের ঘরের বিষয়। আমরা ঘরের কথা বাইরে কেন বলতে যাবো। আমরা কখনোই কোনো ইসলামী দলের বিপক্ষে কথা বলি না, অন্যদেরও বলা উচিত না। তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে চাই। এতে সাধারণ মানুষ বুঝবে যে ইসলামপন্থিরা এক হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলমীর সঙ্গে কথা বলেছি, তারাও ঐক্যের বিষয়ে একমত। আসছে নির্বাচনে ইসলামী দলগুলো এক হয়ে একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে মাঠে কাজ করতে পারলে ভালো ফল আসবে, ইনশাআল্লাহ এবং এতে দেশবাসীও উপকৃত হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম এ প্রতিবেদককে বলেন, দেশ, ইসলাম, মানবতা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। গত ৫৪ বছর মানুষ বিভিন্ন দলের শাসনে দেখেছেন, তারা এখন পুরনো বন্দোবস্তের পরিবর্তন চান। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে গত ৫৪ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা মানুষের আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেমিক ও ইসলামী দল এবং ইসলামী শক্তিগুলোর বিজয়ের জন্য ঐক্য অপরিহার্য। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম (পীরসাহেব চরমোনাই) জনগণের আকাক্সক্ষাকে উপলব্ধি করে ইসলাম ও দেশপ্রেমিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করা যায়, ইসলামপন্থি দলগুলো এবং অন্য দেশপ্রেমিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে আগামী সংসদ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংসদ হবে এবং দেশকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
তাছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সবসময় ঐক্যের পক্ষে এবং ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সে আকাক্সক্ষাটি হচ্ছে ইসলামী দলগুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া। মানুষের এ আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের বিকল্প নেই। ইসলামী আন্দোলন সেই ঐক্য প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে।
খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় ওলামাবিষয়ক সম্পাদক বিশিষ্ট আলেমেদীন মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, যারা এখন জামায়াতের প্রসঙ্গ টেনে ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, আমরা জানি তাদের দলীয় সভাপতিও ২০১৮ সালে জামায়াতের অফিসে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। এর আগে তারা জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করেছে। যদিও শুধু জামায়াতের সঙ্গে নয়, তখন বিএনপি-জামায়াত মিলেমিশে একাকার ছিল, তখন তারাও ছিল। আর এখন তো আমরা জোট নিয়ে কোনো কথা বলছি না। আমরা বলছি, আসন সমঝোতার কথা। অর্থাৎ একই আসনে ইসলামী দলগুলোর একক প্রার্থী থাকবে- এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনের আগেই একটি সমঝোতা তৈরি হবে। এতে কারো আকিদার দায় কারো ওপর বর্তায় না। জামায়াতে ইসলামী সঙ্গে আমাদেরও মতপার্থক্য ছিল, এখনো আছে- এটা জামায়াতও স্বীকার করবে, আমরাও স্বীকার করবো। তাদের দৃষ্টিতে তাদের অবস্থান সঠিক আবার আমাদের দৃষ্টিতে আমাদের অবস্থান সঠিক। এ ঐক্য বা সমঝোতায় এক দলের লোকেরা দলে দলে অন্য দলে যোগ দেবে না। আমরা ইসলামী দলগুলো বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচন করলে যে ক’টি আসন পাবো, অন্যদিকে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে অনেক ভালো ফল আসবে। সাধারণ মানুষও আমাদের (ইসলামী দলগুলো) ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে।