পরিশ্রমী কচ্ছপ ও হিংসুটে খরগোশ
২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২০
॥ বিচিত্র কুমার ॥
জঙ্গলের পাশে এক শান্ত পুকুরে বাস করত এক পরিশ্রমী কচ্ছপ। তার নাম ছিল ধীরেশ্বর। ধীরেশ্বর ছিলো ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী এবং খুবই বুদ্ধিমান। প্রতিদিন সকালে সে পুকুরের আশপাশে ফল-মূল, ছোট মাছ আর শাকসবজি সংগ্রহ করত। তার জীবনে অলসতার কোনো জায়গা ছিল না।
কিন্তু পুকুরের ওপারে ছিল খরগোশদের একটা দল। তারা ছিল চঞ্চল, লোভী আর বেশিরভাগ সময় অলসতায় মগ্ন। নিজেদের খাবার জোগাড়ে তারা খুব বেশি মনোযোগী ছিল না। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধূর্ত খরগোশের নাম ছিল ঝটপটু।
একদিন ঝটপটু খরগোশ দেখল, ধীরেশ্বর প্রতিদিন কত কিছু জোগাড় করে জমিয়ে রাখছে। খরগোশদের জিভে জল এসে গেল। ঝটপটু বলল, ‘ধীরেশ্বর প্রতিদিন কত মজার খাবার খায়, আর আমরা খালি পাতা চিবোই! আমরা যদি একটু বুদ্ধি খাটাই, তাহলে ওর খাবার নিজেরাই নিয়ে নিতে পারি।’
সব খরগোশ উত্তেজিত হয়ে উঠল। ঝটপটু বলল, ‘আমরা সবাই মিলে বনের বিচারকের কাছে অভিযোগ তুলব যে ধীরেশ্বর পুকুরের মাছ আর গাছের ফল একাই দখল করে নিচ্ছে। তাহলে সবাই ওকে দোষী ভাববে আর আমরা সুবিধা পেয়ে যাবো।’
পরদিন থেকেই খরগোশেরা নানা পশুর কাছে গুজব ছড়াতে লাগল। তারা বলল, ‘ধীরেশ্বর কচ্ছপ নাকি পুকুরের সব খাবার একাই নিয়ে নিচ্ছে। অন্যদের জন্য কিছুই রাখে না। সে বনের নিয়ম মানে না।’
শুনে জঙ্গলের কিছু পশু অবাক হয়ে গেল। তারা ভাবল, ‘যদি ধীরেশ্বর সত্যি এত লোভী হয়, তবে তো সবাইকে কষ্ট পেতে হবে।’
অবশেষে জঙ্গলের বিচারসভা বসানো হলো। ধীরেশ্বরকে ডেকে পাঠানো হলো।
ধীরেশ্বর ধীরে ধীরে বিচারসভায় এলো। সে শান্ত গলায় বলল, ‘আমি শুনেছি, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, আমি পুকুরের সব খাবার একাই নিয়ে নিচ্ছি। তোমরা যারা আমাকে প্রতিদিন দেখো, তারা বলো তো, আমি কি কখনো অন্য কারো জন্য খাবার রাখতে ভুল করেছি?’
সব পশুরা বলল, ‘না ধীরেশ্বর, তুমি তো বরং আমাদেরও ডাক দাও খাবার খেতে। তুমি কখনো কারও সাথে অন্যায় করোনি।’
ধীরেশ্বর বলল, ‘তাহলে তোমরা সবাই আমার সাথে চলো। আমি দেখাবো, কীভাবে আমি খাবার সংগ্রহ করি।’
সবার সাথে ধীরেশ্বর পুকুরের ধারে গেল। সে দেখাল, কীভাবে সে পরিশ্রম করে সকাল সকাল মাছ ধরে, ফল কুড়িয়ে রাখে এবং কারো ক্ষতি না করেই নিজের প্রয়োজন মেটায়।
তখন জঙ্গলের বুড়ো হাতি বিচারক বললেন, ‘ঝটপটু খরগোশ এবং তোমার দল, তোমরা শুধু লোভের বশে মিথ্যা অভিযোগ করেছো। মনে রেখো, অন্যের পরিশ্রমে ভাগ বসানোর চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত লজ্জাই জোটে।’
ঝটপটু খরগোশ লজ্জায় মাথা নিচু করল। কিন্তু ধীরেশ্বর রাগ করল না। সে বলল, ‘ভুল করলে শোধরানোর সুযোগ থাকা উচিত। খরগোশেরা যদি চায়, আমি তাদের দেখাবো কীভাবে পরিশ্রম করে খাবার জোগাড় করতে হয়।’
এরপর থেকে খরগোশের দলও ধীরেশ্বরের সাথে থেকে শিখে নিলো, কীভাবে পরিশ্রম করে খাবার সংগ্রহ করতে হয়। তারা বুঝতে পারল, হিংসা ও ফাঁকিবাজি করে কখনো সম্মান অর্জন করা যায় না।
জঙ্গল আবার শান্ত হলো। সবাই জানল- পরিশ্রম ও সততার ফলই সবচেয়ে মিষ্টি।