হারিয়ে যাওয়া ছানারা


২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২০

॥ আব্দুস সালাম ॥
একটা উঁচু পাহাড়ে ছিল এক সুন্দর বড় গাছ। সেই গাছের মজবুত ডালে ছিল এক মা-পাখির বাসা। সেখানে থাকত মা আর তার দুই ছোট ছানা- টুটুল আর মুটুল। টুটুল বড়, শান্ত ও ভদ্র। আর মুটুল ছোট, দুষ্টু আর খুব কৌতূহলী।
প্রতিদিন সকালে মা-পাখি খাবারের খোঁজে উড়ে যেত, আর ছানাদের বলে যেত-
‘বাবারা, আমি যখন বাইরে থাকব, তোমরা একদম বাসার বাইরে যাবে না। এখনকার সময় খুব বিপজ্জনক। শিকারি বাজ, বৃষ্টির ঝড়, আর এ পাহাড়ে গাছের ভিড়ে পথ হারিয়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি খুব ইচ্ছে করে তবে শুধু পাশের ডালে খেলা কোরো। ঠিক আছে?’
ছানারা হ্যাঁ বলত, আর মা নিশ্চিন্তে উড়ে যেত।
একদিন সকালে মা একই কথা বলল, আর বলল-
‘আজ আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। তোমরা সাবধানে থেকো।’
মা উড়ে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ ঠিকঠাক থাকলেও, একটু বেলা বাড়তেই মুটুল মুখ ভার করে বলল, ‘ভাইয়া, চল না বাইরে যাই। সারাক্ষণ এই বাসায় বসে থাকলে আর ভালো লাগে না। বাইরে তো কত সুন্দর রোদ উঠেছে! পাখিরা ডাকে, ফুলে ফুলে সুগন্ধ, বাতাসে ঠাণ্ডা ঘ্রাণ।’ টুটুল বলল, ‘না না, মা নিষেধ করেছে। ওসব ভালো না। বাইরে গেলে হারিয়ে যাব।’
কিন্তু মুটুল একগুয়ে। সে বলল, ‘আমি একটু ঘুরে আসি। পাশের নারিকেল গাছটা দেখেই তো বাসা চিনতে পারব!’
এ কথা বলে মুটুল একা উড়ে গেল।
টুটুল ভাবল, ‘ও হারিয়ে গেলে কী হবে? আমি না গেলে কে ওকে দেখবে?’ এই ভেবে সেও ওর পেছনে উড়ে গেল। দুজনে মিলে উড়তে লাগল, খেলতে লাগল, ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে উড়ল, কখনো পাহাড়ের ওপরে, কখনো ঝর্ণার পাশে। একটা প্রজাপতি দেখে মুটুল চিৎকার করে বলল, ‘ওই দেখো! লাল রঙের প্রজাপতি! ভাইয়া, ধরতে পারো?’ তারা ওর পেছনে দৌড় লাগাল- না, ও উড়ে পালাল। তারা খিলখিল করে হেসে উঠল।
এভাবে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কখন যে বিকেল হয়ে গেছে, তারা বুঝতেই পারল না। হঠাৎ টুটুল বলল, ‘আচ্ছা মুটুল, এখন ফিরি চল। মা তো খুব চিন্তা করছে নিশ্চয়!’ মুটুল মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘হুম ভাইয়া, চল।’ কিন্তু তারা এবার চিন্তায় পড়ে গেল- কোথায় বাসা? নারিকেল গাছ? ওমা! চারদিকে তো সব জায়গায় নারিকেল গাছ! কোনটা তাদের বাসার পাশে ছিল? তারা এক এক করে অনেক গাছ চিনতে লাগল, কিন্তু কোনো গাছ তাদের বাসার গাছ না।
তাদের মন খারাপ হয়ে গেল। তখনই কালো মেঘ, গর্জন, বিদ্যুৎ শুরু হলো। একটা গাছের ডালে বসে তারা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘ভাইয়া, মা ঠিকই বলেছিল। আমরা ভুল করেছি। ওই কথা শুনলে এখন এমন বিপদে পড়তে হতো না।’
এদিকে মা-পাখি দুপুরে বাসায় ফিরে দেখে- বাসা খালি! ‘টুটুল! মুটুল!’ ডাকতে ডাকতে সে চারদিকে ছুটে চলল। সব পাখিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার ছানাদের দেখেছো?’ কেউ কিছু জানে না। মা আতঙ্কে কেঁদে ফেলল। ঝড় শুরু হলো। গাছের ডালপালা কেঁপে কেঁপে ভেঙে পড়ছে। মুটুল আর টুটুল বড় একটা গাছের ডালে কাঁপতে কাঁপতে বসে আছে। তখনই এক দমকা বাতাসে তারা দুজন নিচে পড়ে গেল। কোথায় পড়ল, তা কেউ জানে না।
পরদিন ভোরবেলা সূর্য উঠতেই মা আবার বের হয়। সে এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে উড়ে ছানাদের খুঁজতে থাকে।
‘টুটুল! মুটুল! মা এসেছি! একবার শুধু আওয়াজ দাও!’
মা বড় গাছের নিচে দেখে, ঝোপে দেখে, ঝর্ণার পাশে উঁকি দেয়, কিন্তু কোথাও তার ছোট্ট ছানাদের খুঁজে পায় না।
কখনো একটু থেমে মা বলে-
‘ওরা যদি পড়ে গিয়ে কোথাও কাঁদে? কেউ যদি একটু আদর করে তাদের আশ্রয় দেয়?’
মা জানে না, ছানারা কোথায় আছে। কিন্তু একটা কথা সে খুব ভালো করে জানে-
‘আমি ওদের খুব ভালোবাসি। যতদূরই যাক, আমি খুঁজে খুঁজে ঠিক খুঁজে বের করব।’
আবার ডানা মেলে উড়ে যায় পাহাড়ের ওপারে, তার আদরের ছানাদের খোঁজে।
লেখক : সহকারী সচিব, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়