মাওলানা রূমীর একটি মজার গল্প


২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:১৫

॥ মনসুর আহমদ ॥
ছোট্ট বন্ধুরা, আমরা সবাই গল্প শুনতে ভালোবাসি, তাই না? আমরা অদ্ভুত দেও পরীর গল্প শুনে ভয় পাই, পশুপাখির গল্প শুনে আনন্দ পাই। শেয়াল কুমিরের গল্প, নেকড়ে বাঘ ও বকের গল্প ইত্যাদি পড়ে যেমন আনন্দ পাই, তেমনি অনেক কিছুই শিখি। আমাদের বাংলা ভাষার যেসব গল্প ছড়িয়ে রয়েছে, তার অধিকাংশ সংস্কৃত সাহিত্যের ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘হিতোপদেশ’ ও ‘ঈশপের গল্প’ থেকে নেয়া হয়েছে। এছাড়া আরবী সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ‘কালিলা ওয়া দিমনা’।
‘মসনবী’তে অনেক মজার মজার গল্প রয়েছে। তবে মানুষকে সুন্দর মানুষ, ভালো মানুষ তৈরি করতে ফারসী ভাষায় অনেক গল্প রচিত হয়েছে, যা বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। নীতিকথা সংবলিত কেচ্ছা কাহিনী ভরা এমন একটি কিতাব ‘মসনবী’, যা মাওলানা রূমী রচনা করেছেন।
সুফী জগতের অন্যতম হোতা ও তাপস-শ্রেষ্ঠ মাওলানা জালাল উদ্দীন রূমী ১২০৭ খৃষ্টাব্দে বলখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রচনা করেছেন ‘মসনবী’, যাকে পাহলভী ভাষার কুরআন বলা হয়ে থাকে। এ বিখ্যাত ‘মসনবী’ গ্রন্থ ছয় খণ্ডে সমাপ্ত, এতে রয়েছে ছাব্বিশ হাজার কাব্যছত্র এবং প্রচুর নীতিকথায় পূর্ণ গল্প কাহিনী। তার থেকে একটি ছোট্ট গল্প তোমাদেরকে শোনাব।
গল্পটি এক বেদুঊনকে নিয়ে। এক বেদুঈন বাগদাদের গ্রামে বাস করতো। সে কখনো কোনো নদী বা সাগর দেখেনি। সে দেখেছে তার বাড়ির পাশের কূপটিকে। সে মনে করত এ কূপের পানি শুকিয়ে গেলে দুনিয়ার কোথাও পানি মিলবে না। কারণ সে জানত না এ জগতে ঐ কূপটি ছাড়াও নদী-সাগর আছে। একবার বাগদাদে দুর্ভিক্ষ লাগল এবং অনাবৃষ্টির কারণে পানির অভাব শুরু হলো। সরলমনা বেদুঈন ভাবল, যদি এ কূপ শুকিয়ে যায়, তাহলে বাগদাদের সব মারা যাবে, খলিফাও মারা যাবে। খলিফাকে ভালোবেসে বেদুঈন কূপ থেকে এক কলসি পানি নিয়ে রওনা করল খলিফার দরবারে। বহুপথ পাড়ি দিয়ে পানিভরা কলসিটি নিয়ে সে পৌঁছাল খলিফার দরবারে। দ্বার রক্ষীরা তাকে হাজির করল খলিফার সামনে। খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এত কষ্ট করে কী নিয়ে এসেছ? কেন নিয়ে এসেছ? বেদুঈন অত্যন্ত সরল মনে উত্তর দিল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! এই দারুণ দুর্ভিক্ষের দিনে আমি আপনার জন্য বেহেশতের এক কলসি মিঠা পানি নিয়ে হাজির হয়েছি।’
সরলমনা বেদুঈনের জওয়াব শুনে খলিফা খুব খুশি হলেন। খলিফা বেদুঈনের কাছ থেকে গভীর মমতা নিয়ে পানির কলসিটি গ্রহণ করলেন। খলিফা খাজাঞ্চিকে আদেশ দিলেন, ‘এই কলসিটি স্বর্ণ-মুদ্রায় ভর্তি করে এ লোকটিকে উপহার দাও। একে দজলা নদীর ধার দিয়ে তার বাড়ি ফেরবার পথ দেখিয়ে দাও।’
বেদুঈন দজলা নদীর ধার দিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছে। বিশাল নদী, নদীর জল তরঙ্গ দেখে বেদুঈন বুঝতে পারছে তার ছোট্ট কূপের চেয়ে মিঠা পানিভরা বিরাট নদী রয়েছে খলিফার রাজ্যে।
খলিফার এমন ব্যবহার দরবারের সবাইকে কিছু অবাক করল। তারা বুঝতে পারল না বেদুঈনকে এমন পুরস্কার প্রদানের রহস্য। খলিফা দরবারের সবাইকে বললেন, ‘আমি বেদুঈনকে যা কিছু দান করেছি, তা কেবল আমার প্রতি তার মহব্বতের পুরস্কার।’
ছোট্ট বন্ধুরা, এ গল্পটি থেকে আমাদেরকে কী শিক্ষা দিলেন মাওলানা রূমী? শিক্ষা হলো এই যে, আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের সামান্য ভালো কাজের বদলায় অনেক অনেক নেয়ামত পুরস্কার পাব। এ বিরাট পুরস্কার আমাদের ইবাদতের বিনিময় নয়, বরং এ সীমাহীন পুরস্কার আল্লাহকে আমরা ভালোবাসি তার জন্য। বেদুঈনের এক কলসি স্বর্ণ-মুদ্রা পুরস্কার লাভ যেমন এক কলসি পানির মূল্য নয়, তেমনি বেহেশত লাভও আমাদের ইবাদতের বিনিময় নয়, ঐ নেয়ামত লাভ আল্লাহকে ভালোবাসার পুরস্কার।
বন্ধুরা, বড় হয়ে তোমরা রূমীর ‘মসনবী’ পড়ে নিও। তখন তোমরা বুঝতে পারবে- তিনি কত বড় কবি ছিলেন, কত বড় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন।