রক্ষীবাহিনী গঠন ও হেলিকপ্টার বোম্বিংয়ের মাজেজা!
২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৫২
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
১৯৭২-৭৫-এর সময়কালে বাংলাদেশে কায়েম ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও বাকশালশাসিত সরকার। আর ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছিল মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন (বাকশালেরই আরেক রূপ) মহাজোট সরকার। উভয় আমলই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের নৃশংসতম ইতিবৃত্তে ঠাসা। বিরোধীদল ও মত দমনে দুই সময়েই প্রায় অভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশলের মিল পাওয়া যায়। শেখ মুজিবের ছিল বিখ্যাত হুঙ্কারধ্বনিÑ ‘প্রয়োজনে লাল ঘোড়া দাবড়ায়া দেবো।’ তিনি সত্যি সত্যি লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে ছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তার বিদায়ের পূর্ব সময়ে ‘হেলিকপ্টার দিয়ে বোম্বিং করে’ বিক্ষোভকারীদের সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন প্রক্রিয়া।
লাল ঘোড়া দাবড়ানোর কাল
প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের লাল ঘোড়া ছিল দুই প্রকার। একটি সরকারি বাহিনী, যা জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। দ্বিতীয়টি ছিল দলীয় ক্যাডার বাহিনী। সে সময়ের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর বর্বর নির্যাতন শুরু হয়। এ নির্যাতনে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের বিভিন্ন বাহিনীই অংশগ্রহণ করেনি, তাতে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বিভিন্ন লাঠিয়াল ও বেআইনি সশস্ত্র পেটোয়া বাহিনী। রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয় বিরোধী ভিন্নমতাবলম্বী দমনের জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় সরকার সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে রক্ষীবাহিনী নামে একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের নামে ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ জারি করা হয়। জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ-১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের ২১নং আদেশ) জারি করা হয় এবং ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ আদেশ কার্যকর হয়। সে সময় ঝটিকা বাহিনীর মতো রক্ষীবাহিনী প্রায়ই একেকটি গ্রামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো এবং অস্ত্র ও দুষ্কৃতকারীদের খুঁজতো। তাদের যথেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণ বা তাদের কার্যকলাপের জবাবদিহির আইনগত কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য গ্রেফতারকৃত লোকদের প্রতি অত্যাচারের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও ছিল। তাদের কার্যকলাপের সমালোচনা যখন তুঙ্গে ওঠে এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে, তখন ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর সরকার জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৭৩ জারি করে রক্ষীবাহিনীর সকল কার্যকলাপ ‘আইনসঙ্গত’ বলে ঘোষণা করে। রক্ষীবাহিনীর কোনো সদস্য ‘সরল বিশ্বাসে’ কোনো কাজ করলে অথবা সৎ উদ্দেশ্যে উক্ত কাজ করে থাকলে অনুরূপ কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে বিচারের জন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাবে না বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। যাকে বলে, ‘ইনডেমনিটি’ দেয়া হয়। জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ’ সংশোধন করে তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। গ্রামে গ্রামে চলে রক্ষীবাহিনীর বর্বর নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক অভিযান। ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চলতে থাকে অকথ্য অত্যাচার। এ সময় কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই দলীয় ও ব্যক্তিগত শত্রুতার ভিত্তিতে যাকে তাকে; বিশেষ করে পাইকারিহারে দেশের শত্রু গণ্য করে বিনা বিচারে হাজার হাজার লোককে হত্যা, তাদের ধন-সম্পত্তি দখল এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা ছিল এদের কাজ। এর সঙ্গে যোগ হয় ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানো’, রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের নামে নির্যাতনের স্টিমরোলার।
দেশের প্রতিটি অঞ্চল ও গ্রামের সরকারবিরোধী মানুষকে তখন রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কেউ গুম হয়েছেন আর ফিরে আসেননি। কাউকে প্রকাশ্যে মারা হয়েছে। রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা এসব কিছুর আইনগত বৈধতার স্বীকৃতি এবং ইনডেমনিটি পায় ১৯৭৪ সালের জাতীয় রক্ষীবাহিনী সংশোধনী আইনের মাধ্যমে। এ আইনের কারণে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারের শিকার কেউ আজও আইনের আশ্রয় নিতে পারেনি।
রক্ষীবাহিনী গঠন আইন অনুযায়ী, এ বাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল না। আইনটি তৈরির সময় এ বাহিনীকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। পরে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে একদলীয় বাকশাল গঠিত হলে এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি চালু হলে রক্ষীবাহিনীকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়। রক্ষীবাহিনী সবসময় সরকারপ্রধানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করেছে। বিরোধীপক্ষের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে গর্বের সাথে শেখ মুজিব বলতেন, ‘রাষ্ট্রবিরোধী দুষ্কৃতকারীদের হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, প্রয়োজনে আমি লাল ঘোড়া দাবড়াইয়া দেবো।’
লাল বাহিনী গঠন
সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি বেসরকারি বাহিনীও গঠন করা হয় সেসময়। দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত এ বাহিনীগুলো ছিল অনেকটা জেলা-মহকুমার নেতাদের নেতৃত্বে। মহকুমা পর্যায়ের নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধন করা হতো। প্রতিটি ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যদের বাঁশের লাঠির মাধ্যমে জঙ্গি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো। এরপর ট্রেনিং শুরু। একটি তথ্যে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের একজন শ্রমিক নেতা আব্দুল মান্নান এক লাখ লোকের এক সমাবেশের আয়োজন করেন ১৯৭২ সালের ১ মে এবং ঐ সমাবেশে তিনি ঘোষণা দেন, ‘আগামী ৯ জুন থেকে তার অনুসারীরা জাতীয় শত্রুদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবে।’ তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, যাতে করে তার বাহিনীর সদস্যদের অ্যারেস্ট, সার্চ, ইন্টারোগেশন এবং শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়। এভাবে মুজিবভক্তরা সবাই আইনকে নিজেদের হাতে নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এক সভায় স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান অতি দম্ভের সাথে তার সমালোচকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আমার লাল ঘোড়া দাবড়াইয়া দেবো।’ এই দ্বিবিধ লাল ঘোড়া দাবড়ানোর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। বিখ্যাত বিদেশি পত্রিকার একজন প্রতিনিধির সাথে এক গোপন সাক্ষাৎকারে দেশের জনৈক প্রবীণ নেতা দাবি করেন যে, পঁচিশ হাজারের অধিক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মীকে সেই স্বৈরাচারী শাসনামলে নিধন করা হয়েছে।
হাসিনাকালের কথা
পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে কন্যা শেখ হাসিনা তার বিরোধীদের দমনে পিতার মতোই নির্যাতন-পীড়নের চরম পথ অবলম্বন করেছিলেন। দেড় দশকের হাসিনার আমলনামায় জমা হয়েছে নির্যাতনের অসংখ্য পন্থা-পদ্ধতি। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে রীতিমতো যুদ্ধাবস্থা জারি করা হয়। একাধারে ড্রোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয় করা, হেলিকপ্টার থেকে বোম্বিং, ছত্রীসেনা নামানো, গুলিবর্ষণ ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ ট্যাগ দিয়ে ফাঁসি দেয়া, ইন্টারনেটসেবা বন্ধ করা, বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন লাগানো এবং আন্দোলনকারীদের জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে গত বছর জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলার সময় শেখ হাসিনা এবং তিনজনের মধ্যে আলাদা চারটি ফোনকল রেকর্ডে এসব নির্দেশনার কথা শোনা গেছে। শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণের সময় এসব ফোনকল রেকর্ড বাজানো হয়। একজন প্রসিকিউটর এ মামলায় বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এ কাজের ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোনালাপের ৬৯টি অডিওক্লিপ এবং তিনটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর জব্দ করেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন সাক্ষী। ট্রাইব্যুনালকে তিনি বলেন, অডিওক্লিপগুলোর (ফোনকল রেকর্ড) পর্যালোচনা এবং ফরেনসিক পরীক্ষার পর প্রমাণ পান ফোনকল রেকর্ডগুলো শেখ হাসিনা ও তিনজন ব্যক্তির মধ্যে হয়েছে। চারটি ফোনকল রেকর্ডের একটি শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের, আরেকটি শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এস এম মাকসুদ কামালের। বাকি দুটি ফোনকল রেকর্ড শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মধ্যে হয়েছে। এ চারটি ফোনকল রেকর্ডের মধ্যে শেখ হাসিনা ও মাকসুদ কামালের ফোনালাপটি গত বছর ১৪ জুলাইয়ের। বাকি তিনটি ফোনালাপের তারিখ উল্লেখ নেই।
প্রসিকিউটর সাক্ষ্যে বলেন, “এই ফোনালাপগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, গত বছর জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনা লেঠাল উয়েপন (মারণাস্ত্র) ব্যবহার করে সরাসরি গুলির নির্দেশ দিয়েছেন এবং ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয় করে হেলিকপ্টার থেকে বোম্বিং করা, ইন্টারনেটসেবা বন্ধ করাসহ আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ফাঁসি দেয়ার কথা বলেছেন। তাঁরা ওই ফোনালাপে ইংল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের দমন করতে বলেছেন।” প্রসিকিউটর এরপর চারটি ফোনকল রেকর্ডের অডিও ট্রাইব্যুনালে দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল এক এক করে চারটি রেকর্ডই (প্লে করেন) বাজিয়ে শোনেন।
জাতিসংঘের রিপোর্ট
এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি সরেজমিন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তার প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দেয়। এতে প্রচুর ফ্যাক্টস-ফাইন্ডিং উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, তারা ১৯-২১ জুলাইয়ের মধ্যে বাড্ডা, বসুন্ধরা, গাজীপুর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মহাখালী, মোহাম্মদপুর এবং রামপুরাসহ বিভিন্ন জায়গায় হেলিকপ্টারে করে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাইফেল বা শটগানভর্তি প্রাণঘাতী গোলাবারুদ ছুড়তে দেখেছেন। ৫ আগস্ট যমুনা পার্ক এলাকায় একজন ব্যক্তি বর্ম-ভেদকারী বুলেটের টুকরোয় আঘাত পান, যা ওএইচসিএইচআর দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন যে, তাকে জলপাই-সবুজ রঙের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছিল। এতে আরো বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের ওপর হেলিকপ্টার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিক্ষেপ করা স্বভাবতই নির্বিচার এবং মানবাধিকারের মান লঙ্ঘন। এক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন যে, অস্ত্রগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ করে ব্যবহার করা যাবে না, যদি না তারা বিশেষভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের সাক্ষাৎ হুমকি তৈরি করে। কিন্তু সেটি করা হয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক এবং র্যাবের মহাপরিচালক উভয়েই স্বীকার করেছেন যে, র্যাবের হেলিকপ্টারগুলো বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনী র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছোড়ে কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেনি। র্যাব ওএইচসিএইচআরকে জানিয়েছে যে, তারা হেলিকপ্টার থেকে ৭৩৮টি কাঁদানে গ্যাসের শেল, ১৯০টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ৫৫৭টি স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে।
ওএইচসিএইচআর বেশকিছু ভিডিও সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে র্যাব ও পুলিশের হেলিকপ্টারে থাকা কর্মীদের লঞ্চার থেকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। এ লঞ্চারগুলো দূর থেকে রাইফেল বা শটগানের মতো দেখতে হতে পারে, কিন্তু লঞ্চার থেকে গুলি চালানো হলে কাঁদানে গ্যাস গ্রেনেড থেকে একটি স্বতন্ত্র সাদা ধোঁয়ার চিহ্ন বেরিয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হলে শাসকের উচিত ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া। তাদের ওপর জোর করে চেপে বসার পরিণতি কারো জন্যই উপাদেয় হয়নি- সেটি শেখ মুজিবই হোন অথবা তার মেয়ে শেখ হাসিনা। উভয়েই জনতাকে ‘দাবড়িয়ে’ দিয়ে ক্ষমতায় থাকার খায়েশ পূরণ করতে সক্ষম হননি। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা।
নিউইয়র্ক এপিসোড
তবে স্বৈরাচাররা যে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তার নমুনা পাওয়া যাচ্ছে পলাতক আওয়ামী লীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার আচরণে। তাদের অপকর্মের ফিরিস্তি প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হয়ে চলেছে। তাতে তাদের কোনো অনুশোচনা-অনুতাপ প্রকাশ করা তো দূরে থাক, উল্টো বাংলাদেশের মানুষকে কীভাবে ‘শিক্ষা’ দেয়া যায়, তার প্রচেষ্টা নানাভাবে অব্যাহত রেখে চলেছে তারা। সর্বশেষ বিদেশের মাটিতে লীগের গুণ্ডা উসকে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, হাঙ্গামাকারীকে ফোন ও ভিডিওকলে অভিনন্দন জানিয়ে হাসিনা ফের প্রমাণ করলেন যে, তারা মানসিকভাবেই ফ্যাসিবাদী।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর এলাকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের লাঞ্ছিত করার প্রয়াস চালিয়ে এটাও প্রমাণ করলো যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন কোন পর্যায়ের দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে। বিদেশে হাঙ্গামা করে বাংলাদেশিদের সামনে যেমন হাসিনার বদচরিত্র আরো প্রকাশিত হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে বিদেশি সরকারের সামনেও। এ দেশগুলোর প্রশাসন তাদের মাটিতে আ’লীগের গুণ্ডামি দেখে লীগ সম্পর্কে তাদের কঠোর মনোভাব আরো শক্ত হবে।
মাঝখানে বিপদে পড়বে প্রবাসে বসবাসকারী লীগের গুণ্ডাগুলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়বে। সাজা তো আছেই, পরিস্থিতি গুরুতর হলে ডিপোর্টও (স্বদেশ ফেরত) হতে পারে। হাসিনার অবশ্য তাতে কিছু যায়-আসে না। লীগের গণ্ডমূর্খ কর্মীগুলো হাসিনার বিবেচনায় খরচের খাতায়। আহাম্মকগুলোর পরিণতি কী হবে, তাতে হাসিনার কিচ্ছু যায়-আসে না।